Ajker Patrika

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক সংকট

মাসুদ উর রহমান, কলেজশিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক সংকট
৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙচুর, বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং প্রতীকী আক্রমণের ঘটনা ঘটে। ছবি: সংগৃহীত

জুলাইয়ের আন্দোলনের শুরুতে যে স্লোগানগুলো মানুষের হৃদয়ে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল, সেগুলো ছিল—‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’/ ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’/‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’।

এই স্লোগানগুলো কেবল একটি কোটা সংস্কার আন্দোলনের ভাষা ছিল না; বরং এগুলো ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী দাবির সংযোগ স্থাপনের প্রয়াস। এর মাধ্যমে আন্দোলনকারীরা বলতে চেয়েছিলেন, যে দেশ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত, যে রাষ্ট্রের ভিত্তি স্বাধীনতা, সাম্য ও মানুষের মর্যাদা, সেখানে কোনো ধরনের বৈষম্যের স্থান হতে পারে না।

এই বার্তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। আন্দোলনকারীরা মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে, জাতীয় সংগীত গেয়ে রাজপথে নেমেছিলেন। ফলে দেশের মানুষ এই আন্দোলনকে রাষ্ট্রবিরোধী নয়, বরং রাষ্ট্রের ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ন্যায়সংগত দাবি হিসেবে দেখতে শুরু করেছিল। বিপরীতে সরকারের কঠোর দমন-পীড়ন জনমতের বড় একটি অংশকে আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলে।

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার জন্ম দেয়। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তার ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার মধ্যে বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙচুর, বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং প্রতীকী আক্রমণের ঘটনা ঘটে। অনেকেই যুক্তি দেন, এগুলোর একটি অংশ ছিল ক্ষমতাসীন দলের প্রতি মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি ক্ষোভ থাকলেও, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, স্মারক বা স্বাধীনতার প্রতীকগুলো কেন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হবে? আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব ক্ষতিগ্রস্ত স্মারক সংরক্ষণ ও পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে জনপরিসরে সন্তোষজনক আলোচনা বা দৃশ্যমান অগ্রগতি গত দুই বছরেও দেখা যায়নি—এমন অভিযোগ সমাজের একটি অংশের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি, ‘রিসেট বাটন’ চেপে ১৯৭১ সালের ইতিহাস নতুন করে লেখার মতো বক্তব্য, মববাজি করে মুক্তিযোদ্ধাদের জনসমক্ষে লাঞ্ছিত করা, বক্তৃতা-বিবৃতি-টক শোতে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য প্রতিনিয়ত চলায় স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদিও এসব বক্তব্য বা দাবি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অভিন্ন অবস্থানকে প্রতিফলিত করে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে; তবু জনপরিসরে এগুলোর প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

ফলে একটি প্রশ্ন ক্রমেই উচ্চারিত হচ্ছে, জুলাইয়ের আন্দোলনের ঘোষিত আদর্শ এবং পরবর্তী সময়ে কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে কি একটি স্পষ্ট অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে?

যদি একটি আন্দোলনের সূচনা হয় ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ অঙ্গীকার দিয়ে, তাহলে সেই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বের কাছ থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা থাকে যে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতীয় প্রতীক এবং স্বাধীনতার স্মারকগুলোর প্রতিও একই রকম শ্রদ্ধাশীল অবস্থান নেবেন। যখন সেই প্রত্যাশা পূরণ হতে দেখা যায় না, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এই বিভ্রান্তির রাজনৈতিক প্রভাবও লক্ষণীয়। কারণ একাত্তরকে অস্বীকার করে আমরা কোনোভাবেই সামনে এগিয়ে যেতে পারব না। যদিও বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে নানা সমালোচনার মুখে জনসমর্থন হারিয়েছে। তার মধ্যে তারা মুক্তিযুদ্ধকে তাদের সরকার বা দলের একক সম্পদ হিসেবে দখল করে নিয়েছিল। তারাই আবার কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শব্দটি উচ্চারণ করত। ফলে দেশের জনগণ একপার্শ্বিক এ বয়ানকে সহজে মেনে নিতে পারেনি। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে কোনো জাতির বড় কোনো সংগ্রামের অর্জন কখনো একক নেতা বা দল দিয়ে সম্ভব হয় না।

অপরদিকে জুলাই আন্দোলনের পর থেকে যেভাবে একাত্তরকে অস্বীকার বা বিকৃত করার ঘটনা ঘটেছে, সেটাকেও দেশের আপামর জনগণ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি। এই দুই বাস্তবতায় স্পষ্ট হয়েছে, একাত্তরকে সম্মান না জানাতে পারলে এ দেশে যেমন কারও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই, তেমনি একাত্তরকে একক দখলদার সম্পত্তি করতে চাইলে, সেটা জনগণ গ্রহণও করবে না।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় হলো, মুক্তিযুদ্ধকে কোনো একক রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি হিসেবে নয়, বরং সমগ্র জাতির যৌথ উত্তরাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। একইভাবে জুলাইয়ের আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা—বৈষম্যহীন রাষ্ট্র, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি—এসবও জাতীয় ঐকমত্যের অংশ হওয়া উচিত। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, গত দুই বছরের শাসনে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহির জায়গাটি অস্পষ্টই থেকে গেছে কিংবা বলা ভালো, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জুলাইয়ের চেতনা—এ দুটোর একটিকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটিকে অস্বীকার করলে যে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশই, এই বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।

১৯৭১ ও ২০২৪—দুটি ঘটনাই বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এগুলোর মধ্যে সম্পর্ক, পার্থক্য কিংবা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু এমন কোনো রাজনৈতিক চর্চা কাম্য নয়, যা মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বা নতুন প্রজন্মকে বিভক্ত করে। ইতিহাসকে মুছে ফেলা নয়, ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে ধারণ করেই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নির্মাণ করতে হবে।

কারণ যে রাষ্ট্রের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, সেই রাষ্ট্রে বৈষম্যেরও স্থান নেই, আবার ইতিহাস অস্বীকারেরও স্থান নেই। একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধসমৃদ্ধ বাংলাদেশই হতে পারে আমাদের সবার অভিন্ন গন্তব্য।

মাসুদ উর রহমান, কলেজশিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত