Ajker Patrika

যুদ্ধ বন্ধ করতে ইউরোপ কি এগিয়ে আসবে

জাহীদ রেজা নূর  
যুদ্ধ বন্ধ করতে ইউরোপ কি এগিয়ে আসবে
রাশিয়া ভেবেছিল, তাদের সশস্ত্র আক্রমণ ইউক্রেনকে দ্রুতই কুপোকাত করবে। ছবি: এএফপি

সেই যে ২০২২ সালে শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তার আর অবসান হচ্ছে না। রাশিয়া একসময় ভেবেছিল, তাদের সশস্ত্র আক্রমণ ইউক্রেনকে কুপোকাত করবে খুব দ্রুত। কিন্তু সে রকম ঘটনা ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে সামরিক সাহায্য থেকে শুরু করে নানা ধরনের সহযোগিতা করে এসেছে। ফলে, রাশিয়ার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইউক্রেনের যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেনের বিরোধ এখন যে অবস্থায় পৌঁছেছে, তাতে এই দুই দেশের সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে নেই।

স্বস্তিতে নেই ইউরোপের দেশগুলোও। দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স রাশিয়ার সঙ্গে সংলাপে বসানোর জন্য ইউরোপকে ঠেলে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানকে নিয়ে যে ফাঁপরে পড়েছে, তাতে বোঝা যায়, ইউক্রেন সংঘাত এখন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক আলোচনায় খুব একটা জায়গা পাচ্ছে না।

এরই মধ্যে দেখা গেল, সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বেলারুশ নেতা আলেক্সান্দর লুকাশেঙ্কো। লুকাশেঙ্কো বেলারুশের ক্ষমতায় বসেছিলেন ১৯৯৪ সালে। সেই থেকে ৩২ বছর ধরে তিনিই দেশটির প্রেসিডেন্ট রয়েছেন। তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘পুতিনকে ফোন করতে হবে। রাশিয়ায় যেতে হবে, বসতে হবে, কথা বলতে হবে।’ লুকাশেঙ্কোর কথা শুনে মনে হয়, তিনি বুঝি ক্রেমলিনের দূতের ভূমিকা পালন করছেন। তবে যাঁর কাছে আহ্বান রেখেছেন, সেই মাখোঁও যে মোটামুটি একই মত পোষণ করেন, তা-ও বোঝা যাচ্ছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যতটা সক্রিয় ছিল, সেটা নিয়েও মাখোঁর রয়েছে অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সক্রিয়তার কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো হয় নিষ্ক্রিয় ছিল, নয়তো উপেক্ষিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরান নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাদের একচেটিয়া কর্তৃত্বের হাত থেকে বের হওয়ার সময় হয়েছে বলে মাখোঁ মনে করেন।

রাশিয়াও কিন্তু সংলাপের জন্য প্রস্তুত আছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ইউরোপের কোনো দেশের কাছ থেকে কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে মস্কো কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পায়নি।

সেই সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় থেকে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে সন্দেহের দৃষ্টিতেই দেখে আসছে। পুতিনকে ইউরোপের অনেক দেশই সাম্রাজ্যবাদী মনোভঙ্গির মানুষ মনে করে থাকেন। তারপরও ফ্রান্স এখন ভাবছে, যেকোনোভাবেই হোক, মস্কোর সঙ্গে সংলাপে বসতে হবে। আন্তোনিও কস্টার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, রাশিয়ার ব্যাপারে ইউরোপীয় অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্টার ঘনিষ্ঠ সূত্র যদি এই কথা বলে থাকে, তাহলে সত্যিই রাশিয়া-ইউক্রেন শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে পারে। তবে ইউরোপীয় নেতাদের অনেকে ভাবছেন, মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগের পথ পুনরায় চালু করা দরকার।

ব্যাপারটা এমন নয় যে ইউরোপের এই ভাবনায় ইউক্রেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে; বরং ইউক্রেনও দীর্ঘস্থায়ী ও ক্লান্তিকর এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে।

এই তো সেদিন, ৩১ মে মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল সিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ‘শীত আসার আগেই আমাদের কূটনৈতিক পথ খুঁজে বের করতে হবে, বসতে হবে এবং কথা বলতে হবে।’

তবে এ কথা বলার সময় জেলেনস্কি মনে করিয়ে দেন, পুতিন ও তাঁর দেশের ওপর চাপ বাড়ানোর মাধ্যমে ভালো কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যাবে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়াতে হবে। কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলো কোন পথে সংলাপে যাবে, কে বা কারা সেই উদ্যোগ নেবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

২. যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরান নিয়ে দিশেহারা। ২২ মে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সুইডেনে ন্যাটো বৈঠকে বলেছিলেন, ‘রুশ এবং ইউক্রেনীয়—উভয় পক্ষ শুধু আমাদের সঙ্গেই কথা বলতে রাজি ছিল। তাই আমরা আলোচনায় নেমেছিলাম। তবে দুর্ভাগ্যবশত কিছুই হয়নি। অন্য কেউ যদি এটা করতে চায়, করুক।’

এর অর্থ হলো, ইউরোপের কোনো দেশ আলোচনায় নেতৃত্ব দিলে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথা থাকবে না। কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলো কাকে বিশেষ প্রতিনিধি বানিয়ে এই উদ্যোগ নেবে, তা এখনো ধোঁয়াশায় পরিপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোকে রাশিয়া আগাগোড়াই সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের কোনো আমলা এসে রাশিয়া-ইউক্রেন সমস্যার সমাধান করে দেবেন, এ রকম ভাবনা রাশিয়ার মাথায় নেই। সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকে এই দায়িত্ব দেওয়ার কথা আলোচনায় এসেছিল, কিন্তু তিনি এই ভূমিকা গ্রহণ করতে চাননি। তিনি মনে করেন, রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চালানোর কাজটি বর্তমান সরকারপ্রধানদের কেউ করলে ভালো হবে।

এখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বর্তমান অবস্থার দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। পোল্যান্ড চাইছে, এই আলোচনায় তাদের মতামতও গুরুত্ব পাক। আর ইতালি তো এ ব্যাপারে তাদের আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে বলে বহু আগে থেকে অসন্তুষ্ট। ই-থ্রি বা ফ্রান্স, ব্রিটেন আর জার্মানি মিলে যে সংস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, সেই ই-থ্রি আবার সক্রিয় হয়ে উঠবে কি না, তা নিয়েও কূটনৈতিক মহলে জল্পনাকল্পনা চলছে। অনেকের নিশ্চয় মনে পড়ে যাবে, এই ই-থ্রি ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া সংকটের সময় সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু সংশয়ের জায়গাটা হলো, ব্রিটেনে কিয়ার স্টারমার আর জার্মানিতে ফ্রেডরিখ মার্জ—দুজনেরই অবস্থান নড়বড়ে হয়ে গেছে। তাঁরা কত দিন রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকবেন, সেটা কেউ বলতে পারে না। নিজের দেশ সামলাতেই তাঁদের ব্যস্ত থাকতে হবে। বৈশ্বিক সমস্যার দিকে নজর দেওয়া এ সময় সম্ভব নয়। তাহলে বাকি থাকলেন কে? বাকি থাকলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক গ্রেগোয়ার রোসে মনে করেন, মেয়াদের শেষ ১১ মাস মাখোঁ যুদ্ধবিরতির পরিবেশ তৈরিতে মনোনিবেশ করবেন। একমাত্র মাখোঁর পক্ষেই সহজে এই আলোচনা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব।

৩. ব্রিটিশ কৌশলগত নীতি-বিশ্লেষক নাইজেল গুল্ড-ডেভিসের মতে, ইউরোপের উচিত রাশিয়ার সঙ্গে কথা বলা। কিন্তু কথাগুলো এমনভাবে বলা ঠিক হবে না যে তারা যেন মরিয়া হয়ে মস্কোর দিকে ছুটে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, তালেরাঁর বিখ্যাত উপদেশ এখনো প্রাসঙ্গিক—‘অতিরিক্ত উৎসাহ দেখিয়ো না।’

তালেরাঁ ছিলেন ফ্রান্সের ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত কূটনীতিক। তিনি রাজা পঞ্চদশ লুই, ফরাসি বিপ্লব, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এবং নেপোলিয়নের পতনের পর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্রের অধীনে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। নেপোলিয়নের পরাজয়ের পর ফ্রান্সকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল হয়ে পড়া থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে অসাধারণ কূটনৈতিক দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। তিনি যে ‘অতিরিক্ত উৎসাহ দেখিয়ো না’ কথাটা বলেছিলেন, তা যেকোনো কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনাতেই ভেবে দেখতে হয়। অতিরিক্ত উৎসাহ দেখালে প্রতিপক্ষ সেটাকে দুর্বলতা মনে করে।

ফলে, কাঙ্ক্ষিত পথে আলোচনা এগিয়ে যেতে পারে না।

কথা হলো, এই যুদ্ধে কোন পক্ষ ঠিক, কোন পক্ষ নয়, সে কথা দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলা সম্ভব নয়। রাশিয়ার পাশে থাকা ইউক্রেন কি ইউরোপীয় ইউনিয়নে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঠিক করেছিল? এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর রাশিয়ার কি উচিত হয়েছে ইউক্রেনে আক্রমণ করা? ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্র কি ইউক্রেনকে অস্ত্রসহ নানা ধরনের সহযোগিতা করে ঠিক করেছে? কেউ কি ঠিকভাবে এই যুদ্ধে মধ্যস্থতা করেছে? প্রশ্নগুলোর উত্তর একদেশদর্শী নয়। প্রতিটি বিষয়েই অনেক তর্ক-বিতর্কের অবকাশ আছে।

অস্থির হয়ে আছে পৃথিবী। কট্টর পন্থাই যেন এই সময়ের নিয়ামক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। এ রকম এক পরিস্থিতিতে শান্তিকামী মানুষ চায় সব ধরনের যুদ্ধাবস্থার অবসান। কিন্তু বিবদমান রাষ্ট্রগুলো পরস্পরকে হিংসার চোখে দেখলে, পরস্পরকে শত্রু মনে করলে সেই শান্তি কোথা থেকে আসবে?

দেখা যাক, রাশিয়া ও ইউক্রেন আবার বন্ধুর মতো বসবাস করতে পারে কি না। যুদ্ধ আসলে কাউকে জয়ী করে না। মানবতাকে ধ্বংস করে। চলমান ইতিহাস বারবার সেই সত্যকেই প্রমাণ করে চলেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত