Ajker Patrika

বাংলা, বাঙালির মনোজগৎ

অজয় দাশগুপ্ত
বাংলা, বাঙালির মনোজগৎ

বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতে কি আসলেই ঘটে গেছে ব্যাপক পরিবর্তন? মানুষ কি সত্যি ভুলে গেছে তার অতীত? আমাদের দেশের গৌরবময় ইতিহাস কি এখন আর কাজ করছে না? বর্তমান প্রজন্ম নামে পরিচিত তারুণ্য কি আসলেই ভুলে যেতে চাইছে আমাদের ইতিহাস? এই প্রশ্নগুলো এখন আগুনের মতো সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যা অস্বীকার কিংবা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

কোনো দেশ বা দেশের জনগণ মন চাইলেই স্বাধীন হতে পারে? নাকি তা সম্ভব? মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে কোনো কথা হবে না—এটিই সত্য হওয়া উচিত ছিল; কিন্তু তা হয়নি। আমরা বস্তাপচা রাজনীতির কাছে না গিয়ে বরং বিশ্বের দিকে তাকাই। দেখব বহু ধরনের বাধার দেয়াল সরে গেছে। একেবারে হাতের মুঠোয় এসে গেছে পৃথিবী। কিন্তু এখানেই আমাদের সমস্যার শুরু। ইনফরমেশন বা তথ্য পাওয়া ভালো; কিন্তু কোন তথ্য ঠিক, আর কোনটা অসত্য, সে ব্যবধান এখন নির্ণয় করা কঠিন। আমার ধারণা, এই ফাঁদে পড়েছে নতুন প্রজন্ম।

তাদের মনোজগৎ বোঝার পরিবর্তে বিরোধিতা করা কোনো কাজের কাজ হতে পারে না। কিন্তু দুই দশক ধরে সেটিই করে গেছি আমরা। একটি কথা মনে রাখা দরকার, প্রতি বাঁকেই জীবন তার রং বদলায়। তার ধারণা পরিবর্তিত হয়। সত্তর-আশির দশকে একখানা খবরের কাগজই ছিল যথেষ্ট। মানুষ মুদ্রিত প্রতিটি শব্দকে মানত। মনে করত যেন বেদবাক্য। আশির দশকের শেষে সেই জায়গা নিল সাদা-কালো টিভি—সেই বোকা বাক্স তখন তথ্যের ভান্ডার। একটা বাক্স শব্দ করে, আবার ছবি দেখা যায়, এ কি কম কথা! রেডিও গেল অস্তাচলে।

সেই প্রবাহ বেশি দিন টিকল না। এল ডিভিডি ক্যাসেট, অতঃপর এখন ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম আর ফেসবুক। মানুষ নিজেই হয়ে উঠল একেকটি মিডিয়া। আসলে কী হলো? একটি মোবাইল ফোন হাতে থাকা মানেই মানুষ মনে করল সে-ও পারে। ছবি তুলে পোস্ট দিতে লাগে কয়েক মিনিট।

ব্যস, শুরু হয়ে গেল প্রতিযোগিতা। দেশ-বিদেশে অসুন্দর, অস্বাভাবিক এই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ল যুবসমাজ।

বয়স্ক ব্যক্তিরা দায়দায়িত্ব ভুলে লেগে থাকলেন এনজয়মেন্ট নামের নীল প্রবাহে। কী দাঁড়াল?

মানুষে মানুষে সৃষ্টি হলো ভয়ানক দূরত্ব। ঘরে ঘরে মানুষ হয়ে পড়ল একা। ছেলেমেয়েরা কথা বলে না।

স্বামী-স্ত্রী দিনরাত একসঙ্গে থেকেও নেই। সবার মন, হাতের মুঠোয় বিনোদন আর অশান্তির ছোট পর্দা। এর ভালো দিকগুলো মুছতে শুরু করল। ভয়ংকর যেটা—যেকোনো ইতিহাস, ভূগোল কিংবা বিজ্ঞান জানে না, পড়ে না, সে-ও বুঝতে পারল, সবকিছু সম্ভব; গুগল হাতড়ালেই দুনিয়া

জানা যায়! এই ভ্রান্তি আমাদের তিনটা জিনিস কেড়ে নিয়েছে।

এক. মানুষের স্মৃতির ওপর বিশ্বাস কেড়ে নিয়েছে। যে কারণে এখন আর মগজের ব্যবহার নেই। হিটলারের মৃত্যুদিন বা লেনিনের জন্মদিন—কিছু জানতে হলে গুগলে গেলেই হয়।

দুই. আত্মবিশ্বাস হয়ে গেছে নড়বড়ে। আগে অগ্রজ বা বড়রা বললে ছোটরা শুনত। এখন শুনলেও কী করে? এক ফাঁকে গুগল খুলে দেখে নেয় অগ্রজ মানুষটি সত্যি বললেন, নাকি ভুল। অথচ তারা জানে না গুগল, উইকিপিডিয়া—সব মানুষের বানানো। সে বা যারা যারা পুরে দিয়েছে, সেটাই উগরে দিচ্ছে এ দুই মিডিয়াম। মাঝখান থেকে অগ্রজদের কপালে এসেছে দুর্ভোগ!

তিন. ঐক্যহীনতার জন্ম দিয়েছে এই অবাধ তথ্যপ্রবাহ। ধর্ম কিংবা বিশ্বাসভেদে ভিন্ন পোশাক, ভিন্ন খাবার, ভিন্ন সংস্কৃতির ভেতর যে ঐক্য, তা আজ প্রায় নিঃশেষ হওয়ার পথে। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টাননির্বিশেষে কে কাকে অনুসরণ করে পুরো ধার্মিক হবে, সেই প্রতিযোগিতায় তারুণ্য আজ দুর্বিপাকে। এর কুফল আমরা দেখছি আমাদের স্বদেশে।

এখানে একটা কথা বলা দরকার, যে সমাজ যত পশ্চাৎপদ, যাদের জীবনে অশিক্ষা-কুশিক্ষা বেশি, তাদের দুর্ভোগ অধিক। বাংলাদেশের মানুষের মনোজাগতিক বিকারে এর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। যে যুবসমাজ আজকে দেশে দাপট দেখাচ্ছে কিংবা দেশ পরিচালনা করার মতো জায়গায় পৌঁছে গেছে, তার কোনো রাজনৈতিক ইতিহাস নেই। নেই কোনো অভিজ্ঞতা, যা তারা করেছে কিংবা করছে, তার নাম ওই ডিজিটাল বিপ্লব। যে ডিজিটাল দুনিয়া বাস্তবে অস্তিত্বের সংকটে, তা প্রতিনিধি কীভাবে সমাজ সংহত রাখবে?

প্রশ্ন হচ্ছে, বিজ্ঞ সুশীলেরা এসব বুঝলেন না কেন? তবে আমি মনে করি, অন্ধ স্তাবকতা আর পাওয়ার গেমের কারণে অন্তঃসারশূন্য স্বদেশ আজ হাহাকার করলেও কেউ শুনছে না। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জ, নগরে আধুনিকতার ছোঁয়া নেই। আছে দর্শনীয় কিছু স্থাপনা ও যোগাযোগ। এগুলো দরকারি। কিন্তু বহিরাঙ্গিক প্রস্তুতি যদি অন্তরকে ধারণ না করে তো আমাদের মুক্তি মিলবে কীভাবে?

বাঙালি যুবসমাজে ধর্ম-অধর্ম আর সংস্কৃতিবিরোধিতা এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে, যার নিরাময় না হলে দেশ এগোবে না। তবে এখন রাজনীতি না চাইলেও এসে পড়বে। দেশপ্রেমিক সংজ্ঞাটি যে যার মতো দিতে ভালোবাসবেন, এটিই স্বাভাবিক। মুক্তিযুদ্ধের জয়ী দল যাদের দেশপ্রেমিক মনে করবে, পরাজিতরা তাদের তা মনে করবে না। তাই মীমাংসাটা সময়ের হাতে ছেড়ে না দিয়ে ইতিহাস শুদ্ধ করার প্রক্রিয়াগুলো করা উচিত ছিল। যদিও তার চেষ্টা ছিল; কিন্তু ফল মেলেনি।

এখন সময় কঠিন। এই তারুণ্য একবার যখন অমৃত অথবা বিষের পেয়ালা হাতে পেয়ে গেছে, তা হাতছাড়া করতে চাইবে না। আরও যেটা ভয়ের—বিভক্তি পৌঁছে গেছে চরম পর্যায়ে। এই বিভক্তি দেশ-বিদেশে আমাদের কাল না হয়ে দাঁড়ালেই ভালো হবে। যে কথা বলছিলাম, মনোজাগতিক পরিবর্তনে প্রেম নেই। সুন্দর নেই। বিরহ নেই। গান নেই। এমনকি বিদেশের ভালো ছবি কিংবা যৌনতাও নেই। আছে বিকৃতি আর বিদ্রোহের নামে মারদাঙ্গা। আপনি কথা, গলার স্বর আর উল্লাসেও তা খুঁজে পাবেন। তবে যেকোনো ধরনের ন্যায়সংগত বিদ্রোহে তারুণ্যই আমাদের শক্তি, যা তারা বারবার প্রমাণ করে দিয়েছে।

আমি তারুণ্যের সদর্থক গুণগত পরিবর্তন মনোজাগতিক বদলে যাওয়াকে স্বাগত জানাই। এটি জীবনের নিয়ম। মানুষ যদি না বদলায়, তাহলে পচে যায়। পচা মানুষের মন দিয়ে ভালো কিছু অর্জন করা যায় না। কিন্তু সবকিছু হতে হবে প্রকৃতি আর জীবনের নিয়মে। কলসি উল্টে ধরে পানি পান করতে হয়; কিন্তু কলসি আছড়ে ফেলে কিংবা ভেঙে ফেললে পানি পান করা সম্ভব নয়।

মনোজাগতিক শুদ্ধতা এখন জরুরি প্রয়োজন।

অজয় দাশগুপ্ত

অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত