Ajker Patrika

নতুন নীতি প্রণয়নের চেয়ে দরকার নীতির সঠিক বাস্তবায়ন

আব্দুর রাজ্জাক 
নতুন নীতি প্রণয়নের চেয়ে দরকার নীতির সঠিক বাস্তবায়ন

আজকের লেখায় বলতে চাইছি আর্থিক খাতের নীতি নিয়ে। আমাদের দেশে প্রতিবছর অনেক নীতি প্রণয়ন হয়। প্রায় ক্ষেত্রেই কিছুদিনের মধ্যে এই নীতি সবাই ভুলে যায়। এত নতুন নতুন নীতি প্রণয়ন হয়, যেটা সবার পক্ষে মনে রাখা বা নীতি মেনে কাজ করা দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবছর বাজেটে জাতীয় রাজস্ব আহরণ, অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস, উন্নয়ন বাজেট ও ব্যয় বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনেক নীতি প্রণয়ন হয়। এত পরিবর্তন হয় যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারাও এগুলো খুব একটা তদারকি করতে পারেন না।

ব্যক্তিগতভাবে আমার এক কাছের বন্ধু বেশ কয়েক বছর আগে এনবিআরের নীতি প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঊর্ধ্বতন সেই কর্মকর্তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে কাজ করার সময় মোট ছয়টি বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভদ্রলোক বলছিলেন, ‘আমরা এ বছর যে নীতি প্রণয়ন করি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে, পরের বছর সেটা পাল্টে দিই, তার পরের বছর আবার পুনরায় আগেরটা প্রণয়ন করি। মনে করুন, একটি শার্ট—এ বছর সেটাকে সেলাই করলাম, পরের বছর ওই শার্টটাকে আবার সেলাই খুলে ফেলি, পরের বছর আবার ওই শার্টটি আগের মতো সেলাই করি।’ এটা হলো নীতি প্রণয়ন পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আক্ষেপ। তিনি বলেছিলেন, এত ভালো ভালো আইন আছে আমাদের রাজস্ব উন্নয়নের ক্ষেত্রে, যদি সেগুলোর সঠিক প্রয়োগ হয়, তাহলে রাজস্ব আহরণ তো বাড়বেই, সঙ্গে রাজস্ব ফাঁকিসহ, বিদেশে টাকা পাচারও বন্ধ হবে; যদি আমরা আইনগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করি। কিন্তু প্রতিবছর একই আইন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বদলানো হয়। একসঙ্গে বসে পর্যালোচনা করা হয় না বিদ্যমান আইনটির যথাযথ প্রয়োগ হয়েছে কি না, আর প্রয়োগ হলেও এর অপব্যবহার বা যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কি না।

আমদানি শুল্কের ক্ষেত্রে রাজস্ব ফাঁকি হয় প্রধানত ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে। ওভার ইনভয়েস কী করে বন্ধ করা যায়, সেই ব্যাপারে অনেক নীতিমালা আছে। এর প্রয়োগ সঠিক হয়েছে কি না সেদিকে লক্ষ না রেখে নতুন করে পরের বছর একটি আইন হয়। মানি লন্ডারিং হয় এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। যেসব পণ্যে ওভার ইনভয়েস হয়, সেসব পণ্যের আমদানি শুল্ক সর্বনিম্ন হারে দেওয়া আছে। অথবা যেসব পণ্য বন্ডের মাধ্যমে বিনা শুল্কে খালাস হয়, অর্থাৎ আমদানির শুল্ক শূন্য হার, সেসব পণ্যে ওভার ইনভয়েস হয়। এগুলোই প্রচলিত নিয়ম, এদিকে লক্ষ রেখে যদি সবাই কাজ করে তাহলে নতুন নীতির তেমন একটা দরকার হয় না। প্রতিটি পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস অর্থাৎ এইচএস কোড অনুসারে শুল্কহার নির্ধারণ করা আছে। এটার বাস্তবায়ন করলেও কেউ শুল্ক ফাঁকি দিতে পারে না।

এখন আন্ডার ইনভয়েস কীভাবে বন্ধ হবে, সে ব্যাপারে কিছু কথা বলা যাক। যেসব পণ্যের আন্ডার ইনভয়েস হয়, সেগুলো কোন দেশ থেকে আসে, কোন আমদানিকারক আমদানি করে, তাদের ডেটাবেইস তৈরি করে যেসব দেশ থেকে পণ্যটি আমদানি হয়, সেসব দেশের রপ্তানি ডেটা পর্যালোচনা করা অর্থাৎ ওই পণ্য ওই দেশ থেকে বাংলাদেশ ব্যতীত অন্য দেশে কী দামে রপ্তানি হয়, এই তথ্য সংগ্রহ করা দরকার। এগুলো তদারকি করা খুব একটা কষ্টসাধ্য কাজ নয়। এটা বন্ধ করতে পারলেই মানি লন্ডারিংসহ আন্ডার ইনভয়েসিং বন্ধ হবে। ওভার ইনভয়েসের ক্ষেত্রে শূন্য শুল্কহারসহ যেসব পণ্যের শুল্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ের, সেসব পণ্য যখন আমদানি হবে তখন দেখতে হবে এর আমদানিকারক কারা, ব্যাংক থেকে কত লোন নিয়েছে। সাধারণত ব্যাংকের টাকা পাচার করার জন্যই ওভার ইনভয়েস করা হয়। এগুলোর জন্য দরকার সঠিক তদারকি। যদি ভ্যালুয়েশনের ডেটাবেইস তৈরি করে বন্ডের মাধ্যমে যেসব পণ্য শুল্ক শূন্যহারে খালাস করা হয়, সেসব পণ্য কমার্শিয়াল আমদানিকারক আমদানি করে, তাহলে আমদানি মূল্য একই হওয়ার কথা। দেখা যায়, প্রায় ক্ষেত্রেই এসব পণ্যের আমদানি পর্যায়ে অর্থাৎ বাণিজ্যিক আমদানিকারকেরা কম মূল্য প্রদর্শন করে। বন্ডের মাধ্যমে আমদানি করা পণ্য ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মূল্য সম্পর্কে ডেটাবেইস থাকলে অতি সহজেই রাজস্ব ফাঁকি উদ্‌ঘাটন করা যায়।

অনেক সময়ই বন্ডের মাধ্যমে যেসব পণ্য আমদানি হয়, সেই আমদানি পণ্য দিয়ে ফিনিশ প্রোডাক্ট তৈরি করে রপ্তানি করা হয়। এই রপ্তানির টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ঠিকমতো বাংলাদেশ ব্যাংকে অথবা বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকে এসেছে কি না, তার যথাযথ তদারকি করা দরকার। তাহলে কিন্তু ব্যাংকের টাকা পাচার, মানি লন্ডারিং অনেক অংশেই বন্ধ হয়ে যাবে।

নির্দিষ্ট এলাকার কাস্টমস কর্মকর্তার প্রতিটা এলসি ধরে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে তদারকি করে কত টাকার পণ্য আমদানি করা হয় এবং কত টাকার পণ্য রপ্তানি করা হয়, সেই টাকাটা ডলারে বিদেশ থেকে এসেছে কি না, তা তদারকি করতে হবে। এটি করার জন্য শুধু দরকার সদিচ্ছার, নতুন নীতি প্রণয়নের কোনোই দরকার নেই। আমরা শুধু নিজের কাজটি নিজে করতে চাই না। যার কারণে নীতির দোহাই দিয়ে আমরা নিজের দায়িত্ব অবহেলা করি, একেবারে সুবিধাবাদী চরিত্রের মানুষ আমরা! শুধু নিজের অন্যায় ধামাচাপা দেওয়ার জন্য, নিজের কর্তব্য যে আমরা অবহেলা করেছি, সেটা বহাল থাকার জন্যই নতুন নতুন নীতি প্রণয়ন করি।

মানি লন্ডারিংসহ আন্ডার ইনভয়েস, ওভার ইনভয়েস বন্ধ করার জন্য এত কঠিন আইন মনে হয় পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। তবু আমাদের দেশে এই কাজগুলো অহরহ হচ্ছে, প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে হচ্ছে। সবাই আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। তবু আমরা নীতি প্রয়োগের ব্যাপারে কঠোর হই না, এটাই আমাদের ব্যর্থতা।

নতুন সরকার এসেছে। এপ্রিল মাস থেকেই বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু হবে। আশা করি বর্তমান প্রশাসন নীতি প্রণয়নের চেয়ে নীতি বাস্তবায়নের ওপর বেশি জোর দেবে। যদি প্রয়োজন হয় নীতির পরিবর্তন বা নতুন নীতি করা যেতে পারে, তার আগে গবেষণা করে আগের নীতির বাস্তবায়ন হয়েছিল কি না, বাস্তবায়ন না হয়ে থাকলে কারা কারা দোষী, সেদিকে খেয়াল রেখে, যারা নীতি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে একটু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেই সামনের দিকে অগ্রসর হবে আর্থিক খাত।

সর্বোপরি কথা হলো, সবার জবাবদিহি না থাকলে আমাদের সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়বে। নতুন পে স্কেল ঘোষণা করে গেছে বিগত সরকার। যদি তা বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে ১ লাখ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখতে হবে সরকারের ব্যয়ের খাতে। আমাদের অর্থনীতির যে প্রবৃদ্ধি, তাতে এই ১ লাখ কোটি টাকা নতুন করে জোগান দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। নতুন বাজেট বাস্তবায়ন হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ পেনশনভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন ভাতা দিতে বার্ষিক রাজস্ব আয় খরচ হয়ে যাবে এসব মেটাতে। উন্নয়ন বাজেট কোত্থেকে আসবে, কেমন করে আসবে, তার কোনো হিসাব কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়বে টাকার অভাবে।

যে রকম চতুর্দিকে যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে, বৈদেশিক সাহায্য-সহযোগিতা আগের মতো পাওয়া যাবে না। দাতা সংস্থাগুলো থেকে ঋণপ্রবাহ আসবে বলে মনে হয় না। তেলের দাম বেড়ে যাবে, প্রোডাকশন কস্ট অতিমাত্রায় বেড়ে যাবে। রপ্তানি কমে যাবে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে, আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। এই ক্রান্তিকালে জাতিকে বাঁচানোর জন্য নীতির প্রয়োগ যথাযথভাবে করা বাঞ্ছনীয়।

আশা করি, নীতির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন সরকার সবকিছু ভেবেচিন্তে সামনের দিকে অগ্রসর হবে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে না এলে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। এখন থেকেই সাবধান হতে হবে, আগামী জুনে জাতীয় বাজেট সামনে রেখে।

লেখক: প্রকৌশলী

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত