শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

গত বছরের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাজশাহী থেকে লালমনিরহাটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। এ ভ্রমণটা আমার জীবনে আর দশটা সাধারণ ভ্রমণের মতো ছিল না; বরং উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের গভীরতা ও সহজ সৌন্দর্যকে কাছ থেকে অনুভব করার এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছিল। রুয়েটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বাল্যবন্ধু ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের আমন্ত্রণে তাঁর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে টানা তিন দিন পুরো লালমনিরহাট জেলা ঘুরে বেড়ানোর সৌভাগ্য হয়।
শহরের ভিড় থেকে গ্রামের নির্জনতা, বাজারের হাঁকডাক থেকে নদীর তীরে শীতের পাখিদের কোলাহল—সবকিছুতেই একটি সতেজতা অনুভূত করি। এ যেন ইটপাথরের জঞ্জাল থেকে সাময়িক মুক্তি। কিন্তু এই তিন দিনের যাত্রায় মোগলহাট স্থলবন্দরের ধ্বংসাবশেষ মনে এমন দাগ কেটে দিয়েছে যে, রাজশাহী ফিরে এসেও সেই ছবি মুছে যায়নি। বাস্তবতা হলো, এই বন্দরটি শুধু একটি পরিত্যক্ত স্থাপনা নয়, বরং লালমনিরহাটের অর্থনীতির অপূর্ণ সম্ভাবনার প্রতীক। ধ্বংসস্তূপে পরিণত এই স্থানটি চালু করার প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্টভাবে অনুভব করছি, কারণ এটি হাজারো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। সেই তাগিদ থেকেই লেখাটির জন্ম।
প্রথম দিন স্থানীয় বাজারে ঘুরে বেড়াই, যেখানে কথায় কথায় মোগলহাটের গল্প উঠে আসে। এক বয়স্ক মুরব্বিগোছের ব্যবসায়ী ধীর কণ্ঠে স্মৃতিচারণা করেন ১৯৮৮ সালের সেই ভয়াবহ বন্যার কথা, যখন ধরলা নদীর ওপর রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। আসলে এ ঘটনা যেন একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণশক্তিকে থামিয়ে দিয়েছে। স্থানীয়দের কথায়, একসময় গম, ভুট্টা, পাথর ও কয়লার মতো পণ্য আমদানি-রপ্তানি হতো এই বন্দর দিয়ে, যা স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল। উল্লেখযোগ্য হলো, ১১৭ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত এ বন্দরটি এখন ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে, যা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে। গ্রামের টংঘরে চা খেতে খেতে শুনলাম, ২০২৫ সালে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে; কিন্তু এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।
দ্বিতীয় দিন সকালে লালমনিরহাটের বিভিন্ন গ্রাম এবং নদীতীরে ঘুরে বেড়াই, যেখানে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে আলাপে জানা গেল, মোগলহাট বন্দর চালু থাকলে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য ভারতে রপ্তানি করা সহজ হতো। এই প্রেক্ষাপটে, বন্দরটি চালু হলে ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে, যা লালমনিরহাটের অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলবে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ বন্দরটি আবার চালু হলে পণ্য আমদানিতে খরচ কমবে এবং ব্যবসায়ীদের লাভ বাড়বে। স্থানীয় কুলি এবং দিনমজুরদের কথায়, একসময় এখানে যে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করত, এখন তাঁরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এত সম্ভাবনা ও জনদাবি থাকা সত্ত্বেও কেন মোগলহাট স্থলবন্দর আজও অবহেলিত—এ প্রশ্ন আমার মনকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। বাস্তবতা হলো, এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে আটকে থাকা একটি প্রকল্প। সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকারে উত্তরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে। উপরন্তু, একই জেলায় অবস্থিত বুড়িমারী স্থলবন্দরকে কার্যকর বিকল্প ধরে নিয়ে মোগলহাটকে অপ্রয়োজনীয় মনে করার একটি প্রশাসনিক মনোভাব কাজ করছে। অন্যদিকে, ভারতের পক্ষ থেকেও গিতালদহ রুটে অবকাঠামো উন্নয়নে দৃশ্যমান আগ্রহ সীমিত, যা দ্বিপক্ষীয় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা, চোরাচালান ও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্বেগ। ফলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মোগলহাটের সমস্যা টাকা বা সম্ভাবনার অভাব নয়। সমস্যার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সংকট, কূটনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যকর লবির দুর্বলতা। এ সবকিছুর যোগফলেই মোগলহাট আজ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক অনীহার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
যেহেতু বন্দরটি বন্ধ হয়েছে ১৯৮৮ সালের বন্যায়, সেহেতু এর পেছনে কারণ হলো ধরলা নদীর ওপরের সেতুর ক্ষয়ক্ষতি, যা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ইটের রাস্তায় ভ্যানে করে গ্রামের মেঠোপথে যেতে যেতে স্থানীয়দের কথায় জানতে পারি একসময় এখানে ট্রেন চলত এবং পাসপোর্টধারী যাত্রীরা সহজে ভারতে যাতায়াত করতেন। এর পেছনে কারণ হলো, বন্দরটি চালু থাকলে ভারতের কোচবিহার জেলার গিতালদহের সঙ্গে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরত্বের সুবিধা কাজে লাগানো যেত। মোটাদাগে বলতে গেলে, এ বন্দরটি আবার চালু হলে ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই রুট চালু হলে পণ্য আমদানিতে খরচ কমবে এবং অর্থনীতি চাঙা হবে।
এ প্রেক্ষাপটে, দ্বিতীয় দিন বিকেলে মোগলহাট সাইটে পৌঁছে চোখে পড়ে জরাজীর্ণ অফিস ঘরগুলো, যা ভূতুড়ে বাড়ির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয় ভ্যানচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্দর চালু হলে গরিব মানুষের জীবন বদলে যাবে। উল্লেখযোগ্য হলো, স্থানীয় সংগঠনগুলোর দাবিতে আন্দোলন চলছে, যা ২০১৭ সাল থেকে মানববন্ধন এবং গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে অব্যাহত।
তৃতীয় দিন সকালে লালমনিরহাটের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়াই, যেখানে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্দর চালু হলে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য ভারতে রপ্তানি সহজ হবে। এর পেছনে কারণ হলো, বুড়িমারী স্থলবন্দরের দূরত্ব এবং অসুবিধা। বিভিন্ন মূল্যায়নে দেখা গেছে, এই বন্দর চালু হলে ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। স্থানীয়দের মতে, এই রুট চালু হলে পণ্য আমদানিতে খরচ কমবে।
মোগলহাট সাইটে ফিরে গিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে জানতে পারি বন্দর চালু হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে।
ভ্রমণের তৃতীয় দিনে স্থানীয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, ২০২৫ সালে স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
যদিও বন্দরটি চালুর দাবি দীর্ঘদিনের, তবু সত্য হলো, আগামী রাজনৈতিক সরকার এটি চালু করে শুভসূচনা করতে পারে। অন্যদিকে, স্থানীয়দের অভিযোগ, আন্দোলন এবং আলোচনা সত্ত্বেও বন্দরটি অবহেলিত। তবে মনে রাখা দরকার, ২০১৬ সালে বিবিআইএন সভায় এই রুট চালুর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছিল। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই রুট চালু হলে ভারতের কলকাতায় যাতায়াত সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে, আগামী সরকার এটি চালু করে কীভাবে অর্থনৈতিক সূচনা করতে পারে।
আশার কথা, স্থানীয় সংগঠনগুলো এই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে সন্দেহ করার সুযোগ নেই, এই বন্দর চালু হলে অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে।
লালমনিরহাট এমনিতেই একটি অনুন্নত জেলা। এখানে দারিদ্র্যের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্ব। এই বাস্তব চিত্রে দাঁড়িয়ে বিষয়টি স্পষ্ট, মোগলহাট স্থলবন্দরটি অর্থনীতির পালস হতে পারে।
মোগলহাট আজও দাঁড়িয়ে আছে; ধ্বংসের চাদরে ঢাকা হলেও সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। প্রয়োজন কেবল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস। সেই সাহস দেখাতে পারলেই তিন দশক ধরে থমকে থাকা এই অর্থনৈতিক অধ্যায় নতুন করে পথচলা শুরু করতে পারে।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

গত বছরের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাজশাহী থেকে লালমনিরহাটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। এ ভ্রমণটা আমার জীবনে আর দশটা সাধারণ ভ্রমণের মতো ছিল না; বরং উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের গভীরতা ও সহজ সৌন্দর্যকে কাছ থেকে অনুভব করার এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছিল। রুয়েটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বাল্যবন্ধু ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের আমন্ত্রণে তাঁর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে টানা তিন দিন পুরো লালমনিরহাট জেলা ঘুরে বেড়ানোর সৌভাগ্য হয়।
শহরের ভিড় থেকে গ্রামের নির্জনতা, বাজারের হাঁকডাক থেকে নদীর তীরে শীতের পাখিদের কোলাহল—সবকিছুতেই একটি সতেজতা অনুভূত করি। এ যেন ইটপাথরের জঞ্জাল থেকে সাময়িক মুক্তি। কিন্তু এই তিন দিনের যাত্রায় মোগলহাট স্থলবন্দরের ধ্বংসাবশেষ মনে এমন দাগ কেটে দিয়েছে যে, রাজশাহী ফিরে এসেও সেই ছবি মুছে যায়নি। বাস্তবতা হলো, এই বন্দরটি শুধু একটি পরিত্যক্ত স্থাপনা নয়, বরং লালমনিরহাটের অর্থনীতির অপূর্ণ সম্ভাবনার প্রতীক। ধ্বংসস্তূপে পরিণত এই স্থানটি চালু করার প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্টভাবে অনুভব করছি, কারণ এটি হাজারো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। সেই তাগিদ থেকেই লেখাটির জন্ম।
প্রথম দিন স্থানীয় বাজারে ঘুরে বেড়াই, যেখানে কথায় কথায় মোগলহাটের গল্প উঠে আসে। এক বয়স্ক মুরব্বিগোছের ব্যবসায়ী ধীর কণ্ঠে স্মৃতিচারণা করেন ১৯৮৮ সালের সেই ভয়াবহ বন্যার কথা, যখন ধরলা নদীর ওপর রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। আসলে এ ঘটনা যেন একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণশক্তিকে থামিয়ে দিয়েছে। স্থানীয়দের কথায়, একসময় গম, ভুট্টা, পাথর ও কয়লার মতো পণ্য আমদানি-রপ্তানি হতো এই বন্দর দিয়ে, যা স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল। উল্লেখযোগ্য হলো, ১১৭ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত এ বন্দরটি এখন ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে, যা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে। গ্রামের টংঘরে চা খেতে খেতে শুনলাম, ২০২৫ সালে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে; কিন্তু এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।
দ্বিতীয় দিন সকালে লালমনিরহাটের বিভিন্ন গ্রাম এবং নদীতীরে ঘুরে বেড়াই, যেখানে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে আলাপে জানা গেল, মোগলহাট বন্দর চালু থাকলে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য ভারতে রপ্তানি করা সহজ হতো। এই প্রেক্ষাপটে, বন্দরটি চালু হলে ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে, যা লালমনিরহাটের অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলবে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ বন্দরটি আবার চালু হলে পণ্য আমদানিতে খরচ কমবে এবং ব্যবসায়ীদের লাভ বাড়বে। স্থানীয় কুলি এবং দিনমজুরদের কথায়, একসময় এখানে যে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করত, এখন তাঁরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এত সম্ভাবনা ও জনদাবি থাকা সত্ত্বেও কেন মোগলহাট স্থলবন্দর আজও অবহেলিত—এ প্রশ্ন আমার মনকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। বাস্তবতা হলো, এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে আটকে থাকা একটি প্রকল্প। সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকারে উত্তরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে। উপরন্তু, একই জেলায় অবস্থিত বুড়িমারী স্থলবন্দরকে কার্যকর বিকল্প ধরে নিয়ে মোগলহাটকে অপ্রয়োজনীয় মনে করার একটি প্রশাসনিক মনোভাব কাজ করছে। অন্যদিকে, ভারতের পক্ষ থেকেও গিতালদহ রুটে অবকাঠামো উন্নয়নে দৃশ্যমান আগ্রহ সীমিত, যা দ্বিপক্ষীয় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা, চোরাচালান ও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্বেগ। ফলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মোগলহাটের সমস্যা টাকা বা সম্ভাবনার অভাব নয়। সমস্যার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সংকট, কূটনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যকর লবির দুর্বলতা। এ সবকিছুর যোগফলেই মোগলহাট আজ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক অনীহার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
যেহেতু বন্দরটি বন্ধ হয়েছে ১৯৮৮ সালের বন্যায়, সেহেতু এর পেছনে কারণ হলো ধরলা নদীর ওপরের সেতুর ক্ষয়ক্ষতি, যা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ইটের রাস্তায় ভ্যানে করে গ্রামের মেঠোপথে যেতে যেতে স্থানীয়দের কথায় জানতে পারি একসময় এখানে ট্রেন চলত এবং পাসপোর্টধারী যাত্রীরা সহজে ভারতে যাতায়াত করতেন। এর পেছনে কারণ হলো, বন্দরটি চালু থাকলে ভারতের কোচবিহার জেলার গিতালদহের সঙ্গে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরত্বের সুবিধা কাজে লাগানো যেত। মোটাদাগে বলতে গেলে, এ বন্দরটি আবার চালু হলে ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই রুট চালু হলে পণ্য আমদানিতে খরচ কমবে এবং অর্থনীতি চাঙা হবে।
এ প্রেক্ষাপটে, দ্বিতীয় দিন বিকেলে মোগলহাট সাইটে পৌঁছে চোখে পড়ে জরাজীর্ণ অফিস ঘরগুলো, যা ভূতুড়ে বাড়ির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয় ভ্যানচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্দর চালু হলে গরিব মানুষের জীবন বদলে যাবে। উল্লেখযোগ্য হলো, স্থানীয় সংগঠনগুলোর দাবিতে আন্দোলন চলছে, যা ২০১৭ সাল থেকে মানববন্ধন এবং গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে অব্যাহত।
তৃতীয় দিন সকালে লালমনিরহাটের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়াই, যেখানে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্দর চালু হলে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য ভারতে রপ্তানি সহজ হবে। এর পেছনে কারণ হলো, বুড়িমারী স্থলবন্দরের দূরত্ব এবং অসুবিধা। বিভিন্ন মূল্যায়নে দেখা গেছে, এই বন্দর চালু হলে ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। স্থানীয়দের মতে, এই রুট চালু হলে পণ্য আমদানিতে খরচ কমবে।
মোগলহাট সাইটে ফিরে গিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে জানতে পারি বন্দর চালু হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে।
ভ্রমণের তৃতীয় দিনে স্থানীয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, ২০২৫ সালে স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
যদিও বন্দরটি চালুর দাবি দীর্ঘদিনের, তবু সত্য হলো, আগামী রাজনৈতিক সরকার এটি চালু করে শুভসূচনা করতে পারে। অন্যদিকে, স্থানীয়দের অভিযোগ, আন্দোলন এবং আলোচনা সত্ত্বেও বন্দরটি অবহেলিত। তবে মনে রাখা দরকার, ২০১৬ সালে বিবিআইএন সভায় এই রুট চালুর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছিল। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই রুট চালু হলে ভারতের কলকাতায় যাতায়াত সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে, আগামী সরকার এটি চালু করে কীভাবে অর্থনৈতিক সূচনা করতে পারে।
আশার কথা, স্থানীয় সংগঠনগুলো এই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে সন্দেহ করার সুযোগ নেই, এই বন্দর চালু হলে অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে।
লালমনিরহাট এমনিতেই একটি অনুন্নত জেলা। এখানে দারিদ্র্যের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্ব। এই বাস্তব চিত্রে দাঁড়িয়ে বিষয়টি স্পষ্ট, মোগলহাট স্থলবন্দরটি অর্থনীতির পালস হতে পারে।
মোগলহাট আজও দাঁড়িয়ে আছে; ধ্বংসের চাদরে ঢাকা হলেও সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। প্রয়োজন কেবল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস। সেই সাহস দেখাতে পারলেই তিন দশক ধরে থমকে থাকা এই অর্থনৈতিক অধ্যায় নতুন করে পথচলা শুরু করতে পারে।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

কয়েক মাসের নিপুণ পরিকল্পনা অনুযায়ী মার্কিন সামরিক বাহিনী ২ জানুয়ারি রাতের আঁধারে হামলা চালায় ভেনেজুয়েলায়। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। এর কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন...
২ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আমূল সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, যা দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
২ ঘণ্টা আগে
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক। বর্তমানে তিনি ‘অলটারনেটিভস’ সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক।
১ দিন আগে
উত্তর আমেরিকার শীতকালটা বেশ অদ্ভুত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ১০ তারিখে পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গে এসে দেখলাম, সব ঝকঝকে পরিষ্কার, রোদ ঝলমল দিন, রাস্তার কোলে সরু ফিতার মতো স্বল্প কিছু তুষার স্তূপ জড়ো হয়ে রয়েছে, ছোট ছোট সাদা সাদা তুষারের পাতলা টুকরো রয়েছে পাহাড়ের উপত্যকাজুড়ে, নিষ্পত্র বৃক্ষময় বনের ভেতর।
১ দিন আগে