
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। বিশ্বজুড়ে চোখ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর। প্রশ্ন একটাই, এখন কী হবে? যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের লক্ষ্যবস্তু ইরানের ইসলামি শাসকগোষ্ঠীর পতন হবে কি? হলে কী হবে সেই ইরানের চেহারা! মুহুর্মুহু হামলার মুখে কতক্ষণ বা কত দিন টিকবে ইরানের প্রতিরোধ? তেহরানের পক্ষেইবা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর আর কতটা ক্ষতি করা সম্ভব হবে। তবে প্রশ্নগুলো করা যেমন সহজ, উত্তর ততটাই কঠিন।
ইরান এরই মধ্যে ঘোষণা করেছে, প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং অভিভাবক পরিষদের একজন আইনজ্ঞ নিয়ে গঠিত কর্তৃপক্ষ খামেনির মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তীকালীন দেশ পরিচালনা করবে। ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাকে নিয়ে গঠিত সংস্থা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট’ এখন খামেনির উত্তরসূরি নিয়োগ করবে। সংবিধান অনুসারে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটি করতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুগপৎ হামলার মুখে দ্রুত এ পরিষদের সবাইকে একত্র করা কঠিন হতে পারে নিরাপত্তা সংকটের কারণে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর দিন খামেনি নিজেও এভাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
ইরানের প্রভাবশালী বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, তারা মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলে আরও আক্রমণ করবে। ‘দখল করা অঞ্চল এবং মার্কিন সন্ত্রাসী ঘাঁটির’ বিরুদ্ধে শিগগিরই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ‘ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী’ আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু হবে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল আনুষ্ঠানিকভাবে খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে দেওয়া বিবৃতিতে বলেছে, খামেনির ‘শাহাদাত’ হবে ‘নিপীড়কদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি বিদ্রোহের সূচনা’।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচির শর্ত মেনে নিতে চাপ দিয়ে আসছিল। এই সপ্তাহে সর্বশেষ দফার আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছিলেন। তবে হামলার আগের দিনও তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। এটা ট্রাম্পের সুপরিচিত ‘অস্থিরমতির’ আরেক নমুনা না নিছক কৌশল, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন তিনি নিজে এবং তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারাই।
ট্রাম্প ইরানি ধর্মীয় নেতার মৃত্যুর খবর জানানোর সময় এ-ও বলেন, ইরানের দায়িত্ব নেওয়ার মতো ‘ভালো প্রার্থীর’ নামও তাঁর মাথায় রয়েছে।
খামেনির মৃত্যুর কথা জানিয়ে ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট থেকে ধারণা হয়, তিনি ইতিমধ্যেই একে বড় জয় হিসেবে দেখছেন। আর চলতি অভিযান তুলনামূলকভাবে দ্রুত শেষ হবে।
ট্রাম্প দীর্ঘ অভিযানের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখলেও ‘সপ্তাহজুড়ে’ হামলার কথা উল্লেখ করেছেন। তাই মনে করা হচ্ছে এবারের হামলার মেয়াদ গত বছর ইরানে ইসরায়েলি বিমান হামলার (১২ দিন) চেয়ে কম হবে। ১৯৯১ সালে ইরাকে বা ১৯৯৯ সালে কসোভোতে চালানো মার্কিন বিমান হামলার চেয়ে অনেক কম হবে তো বটেই।
মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযান এবং ইরানের পাল্টা অভিযান উভয়কে ঘিরে রয়েছে বিশাল অনিশ্চয়তা। বিশ্লেষকদের সামনে এখনো অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, যার সোজাসাপ্টা জবাব নেই। ট্রাম্প বারবার বলছেন, এটিকে তিনি ইরানি জনগণের জন্য দেশ ‘আবার দখলে নেওয়ার’ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এটা স্পষ্ট করে বলেননি, ইরানের বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হলে ঠিক কে বা কারা দেশ পরিচালনা করবে। নির্বাসিত যুবরাজ রেজা শাহ পাহলভির পেছনে দেশের জনগণ ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের যথেষ্ট সমর্থন আছে কি না, অতীতে ট্রাম্প তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা ইরানের শেষ শাহর (রাজা) ছেলে রেজা পাহলভি ইতিমধ্যে খামেনির মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়েছেন।
বিদেশে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচন করেছেন ট্রাম্প। তাই ইরাকে হামলার কায়দার ঝামেলায় জড়ালে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনমতের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
আইন অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে না। ট্রাম্পের এ সামরিক অভিযান নিয়ে আইনপ্রণেতারা বিভক্ত। তাঁদের এ বিভক্তি মূলত দলীয় লাইনে। অর্থাৎ মূলত রিপাবলিকান দলের আইনপ্রণেতারাই এর পক্ষে।
ইরান এখন মরিয়া পরিস্থিতিতে। বিশেষ করে খামেনির হত্যাকাণ্ড তার সামনে আর বিশেষ বিকল্প রাখেনি। গত বছর থেকে অব্যাহত ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় দেশটির সামরিক সক্ষমতা অনেক কমেছে। কিন্তু এ কারণেই ধারণা করা হচ্ছে, তারা হয়তো অবশিষ্ট শক্তি দিয়েই আগের চেয়ে আরও প্রবল জোরে হামলা করবে। অন্য কিছুর পাশাপাশি নিশ্চয়ই এই আশঙ্কাও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সোমবারের ইসরায়েল সফর বাতিলের কারণ।
ইরানে হামলা করে সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক বিশাল বাজি ধরেছেন। বাজিটা বড় এ জন্য যে, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটলে সামনে কী হবে, সে সম্পর্কে ওয়াশিংটনের কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। পেন্টাগনের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের চলমান সামরিক হামলা যদি ব্যর্থ হয়, অথবা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সূত্রপাত করে, তাহলে ট্রাম্পের নামে একটা ব্যর্থতার দাগ যেমন পড়বে, তেমনি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শনিবার ভোরে ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ঝুঁকিটা কত বড়। ‘আমেরিকান বীরদের হারাতে হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা বপনকারী এই শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটানোর জন্য কিছু মূল্য চোকাতে হবে’, বলেছিলেন ট্রাম্প।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, পরিস্থিতি ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। নেভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুলের অধ্যাপক মোহাম্মদ হাফেজ বলেছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে এখনই সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে। সমস্যা হলো, স্থলসেনা না পাঠালে আপনি এটি করতে পারবেন না।
অঞ্চলজুড়ে মার্কিন মিত্রদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা ইঙ্গিত দেয়, ইরান গত বছরের তুলনায় এবার আরও আক্রমণাত্মকভাবে মোকাবিলা করার পরিকল্পনা করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ হাফেজ বলেছেন, ইরানি শাসকগোষ্ঠীর কৌশল হলো এমন একটি আঞ্চলিক সংঘাত সৃষ্টি করা, যা বিশ্ব অর্থনীতি এবং মার্কিন অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে। এটি ট্রাম্পের জন্য ভালো হবে না।
আটলান্টিক কাউন্সিল থিংক ট্যাংকের উপদেষ্টা হারলান উলমানও বলেছেন, তাঁর ধারণা যুক্তরাষ্ট্র খামেনিকে হত্যা করে বড় ভুল করেছে। ‘তিনি এখন একজন শহীদ’। আলী লারিজানি যদি এখনো বেঁচে থাকেন তবে তিনি একজন অত্যন্ত যোগ্য ব্যক্তি। তিনি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। লারিজানি এক ভয়ংকর শত্রু হবেন, মূল্যায়ন করেছেন উলমান।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন—পারমাণবিক বিষয়ে চুক্তি নিশ্চিত করার জন্য সামরিক চাপ নয়। আক্রমণের সময় থেকেও এটা স্পষ্ট, ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব কয়েক সপ্তাহ আগেই এর পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলেছিল।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়েই স্পষ্টতই ‘বিজয়’ ঘোষণার অপেক্ষায়। কিন্তু তাঁরা আসলে তা অর্জন করতে পারবেন কি না, তা মোটেই স্পষ্ট নয়। গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ ছিল ধীর এবং তুলনায় মাপা। এবার ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিশোধ নিয়েছে। ইরানের পদক্ষেপের এই গতি ইঙ্গিত দেয়, তাদের প্রতিশোধমূলক পরিকল্পনা আগে থেকে প্রস্তুত করা ছিল।
ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা এবং সামরিক কমান্ডাররা এ রকম পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আসলে। এ ধরনের ভাবনার সূচনা গত বছরের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় থেকেই। এর আগেও খবর পাওয়া গিয়েছিল, খামেনি যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বিশেষজ্ঞ পরিষদকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, খামেনি ‘তিনজন জ্যেষ্ঠ ধর্মগুরু’কে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। খামেনির ছেলে মোজতবাসহ তাঁর জায়গা কে নিতে পারেন, তা নিয়ে তো বহু বছর ধরেই জল্পনা চলছে।
ইরানের পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল। সংঘাতের পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত এবং বিপজ্জনকভাবে মোড় নিতে পারে। খামেনির পতনে ক্ষমতায় যে-ই আবির্ভূত হোক না কেন, তাঁদের প্রধান লক্ষ্য একই থাকবে—এমন একটি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা, যা ধর্মীয় নেতাদের এবং এর শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনীকে ক্ষমতায় রাখবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি হলো, বিশ্বের কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান তাদের আনুগত্য না মানলে সেখানে যেকোনো উপায়ে তাঁকে উৎখাত করা। যুক্তরাষ্ট্রের অতীত ইতিহাস তা-ই বলে। সেই
২ ঘণ্টা আগে
দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকারের মধ্যে দুটি ধারা দেখা যাচ্ছে। প্রথমটি—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত কিছু কর্মকাণ্ড, আচার-আচরণ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বিএনপি ও তার নেতাদের গতানুগতিক কাজকর্ম। এই দুই ধারার মধ্যে মিলের চেয়ে যেন অমিলই বেশি। ফলে সাধারণ মানুষ বুঝে উঠতে পারছেন না, আগামী দিনগুলোতে ঠিক...
২ ঘণ্টা আগে
আলতাফ পারভেজ লেখক ও গবেষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর। ডাকসুর নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী: ইতিহাসের পুনঃপাঠ’, ‘বার্মা: জাতিগত সংঘাতের সাত দশক’, ‘শ্রীলঙ্কার তামিল ইলম’, ‘গ্রামসি ও তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা’ প্রভৃতি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বই।
১ দিন আগে
নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে তার বাবার সামনে থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিশোরীটি ১৫ দিন আগে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্যের কাছে বিচার চাইতে গেলে সেই ইউপি সদস্য মীমাংসা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা বলেন।
১ দিন আগে