Ajker Patrika

সহজ সমাধান তবু উপেক্ষিতই থাকবে

আগের সরকারগুলোর মতোই বর্তমান সরকারও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের নানা পরিকল্পনা হাজির করছে বটে। তবে সেই পরিকল্পনা আগের মতোই বৃহৎ উৎপাদন প্রকল্পকেন্দ্রিক। অনেক সাধারণ মানুষেরও বুঝতে কষ্ট হয় না যে এ দেশে যত বড় প্রকল্প, তত বড় কমিশন। সে কারণেই নীতিনির্ধারক ও আমলা-প্রকৌশলীদের মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে বড় প্রকল্পের প্রতি।

আজাদুর রহমান চন্দন
সহজ সমাধান তবু উপেক্ষিতই থাকবে
সোলার প্যানেলের মাধ্যমে সহজেই বিদ্যুৎ-সংকট কাটানো যায়। ছবি: আজকের পত্রিকা আর্কাইভ

সাধারণত জাতীয় সংসদে বাজেট উত্থাপন সামনে রেখে প্রতিবছরই জিনিসপত্রের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দেয় সাধারণ মানুষের মনে। তবে এবার একটি আশঙ্কা আগেই বাস্তব হয়ে চেপে বসেছে মানুষের ঘাড়ে। ৩ জুন বিদ্যুতের নতুন দর ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তাতে লাইফলাইন গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা এবং ০-৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, প্রস্তাব যাচাই না করেই বিইআরসি বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দাম বাড়ানোর বিষয়ে শুনানির আগেই প্রথম দুই ধাপের (শূন্য থেকে ৫০ এবং শূন্য থেকে ৭৫) গ্রাহকের দাম না বাড়াতে একটি সম্পূরক প্রস্তাবও জমা দিয়েছিল। কিন্তু বিইআরসি ওই আবেদন আমলে না নিয়ে আবাসিক সব গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেয়। লাইফলাইন গ্রাহক হিসেবে বিবেচিত স্বল্প আয়ের মানুষের বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরদিন পিডিবি আবার একই প্রস্তাব নিয়ে কমিশনে যায়। নিজেদের ভুল আড়াল করতে তড়িঘড়ি করে সেদিন বিকেলেই বর্ধিত দাম প্রত্যাহার করার আদেশ দেয় বিইআরসি।

বিদ্যুৎ বিতরণের ক্ষেত্রে আবাসিক শ্রেণিতে ছয়টি স্ল্যাব বা ধাপ অনুযায়ী গ্রাহকেরা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে থাকেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের চিন্তা থেকে বিভিন্ন সরকার শূন্য থেকে ৫০ ইউনিটের ধাপে বিদ্যুৎ বিতরণ করে আসছে। সাধারণত এ ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ চিন্তা থাকে। আগেও বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই ধাপে দামের খুব বেশি হেরফের হয়নি। তিনটি বাতি ও দুটি পাখা চালালে মাসে একজন গ্রাহক ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে থাকেন। গ্রামের সাধারণ মানুষের ঘরে স্বল্পমূল্যে আলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকার লাইফলাইন গ্রাহককে আলাদা দৃষ্টিতে দেখে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, একজন মানুষ যদি কেরোসিনের তুলনায় কম দামে বিদ্যুৎ পায়, তাহলেই সে বিদ্যুৎ-সংযোগ নেবে। কারও ঘরে বিদ্যুৎ-সংযোগ থাকলে সেই ঘরের শিশুরা একটু বেশি সময় রাতে পড়তে পারবে। এতে তার জীবন বদলে যেতে পারে। সারা দেশে এ ধরনের গ্রাহক আছেন ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজার। এই শ্রেণির মানুষের জীবনমান উন্নত হলে তাঁদের আর্থিক সংগতি বাড়তে পারে এবং তাতে তিনি বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরবর্তী ধাপে যেতে পারেন। ঠিক এর পরের ধাপটি শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিটের। এ ধাপের সুবিধা অন্য গ্রাহক পেলেও লাইফলাইন থেকে উঠে আসা গ্রাহক এ ধাপে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হন। এই দুটি ধাপ রাখাই হয়েছে একেবারে স্বল্প আয়ের মানুষকে স্বস্তি দিতে।

এবার পিডিবি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার পর একটি সম্পূরক প্রস্তাব দিয়ে এ দুই ধাপের দাম না বাড়ানোর আবেদন করে। গত ২০ এবং ২১ মে গণশুনানি হয়। এরপর প্রস্তাবটি জমা দেয় পিডিবি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দামের বিষয়ে গণশুনানির পর ৯০ দিনের মধ্যে আদেশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। এবার গণশুনানি শেষ হওয়ার পর ঈদের সাত দিন ছুটি বাদ দিয়ে সব মিলিয়ে সময় ছিল মাত্র পাঁচ কার্যদিবস। কয়েক লাখ কোটি টাকার হিসাব করার জন্য এই সময়টা কি মোটেই যথেষ্ট? তাই বলা যায়, প্রস্তাব যাচাই না করেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। অথচ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ বিভাগের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। বরং সিস্টেম লস বা চুরি কমিয়ে বিদ্যুতের লোকসান কমানো হবে। মাত্র তিন মাসের মাথায় এসে সেই সিদ্ধান্তের বরখেলাপ করায় স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি নিয়ে মাঠ গরম করার চেষ্টা করছে ‘মিল-মিশ’ সংসদের বড় বিরোধী দল। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গত শনিবার সাফাই গেয়ে বলেছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও আগামী বাজেটে এই খাতে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির বিষয়টি জেনেই তো বিদ্যুৎমন্ত্রী দুই বছর দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি দিয়েছিলেন! মন্ত্রী তো ওই বৈঠক শেষে সুনির্দিষ্ট হিসাব দিয়েই বলেছিলেন, এখন বিদ্যুতের সিস্টেম লস হচ্ছে ৭ শতাংশের বেশি। এটি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারলে সরকারের সাশ্রয় হবে ১০ হাজার কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি, চুরি আর ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লুটপাট বন্ধ করার উদ্যোগ না নিয়ে সরকার কেন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পথটি বেছে নিল? আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ ছিল—নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে বিরোধী দলকে ভোটের বাইরে রাখতে একরকম বাধ্য করা, কিছু লোককে ঋণের নামে ব্যাংকের লাখো কোটি টাকা হাতিয়ে বিদেশে পাচার করার সুযোগ দেওয়া এবং বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের ব্যবস্থা করে দেওয়া। লুটপাটের বোঝা চাপানো হয়েছে জনগণের কাঁধে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে এমন একটি স্বতন্ত্র আইন করা হয়েছিল, যাতে বিইআরসির বদলে সরকার নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারত। তখন অজুহাত দেখানো হয়েছিল, বিইআরসি দাম বাড়াতে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে থাকে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সেই আইন বাতিল করে দাম বাড়ানোর ক্ষমতা আবার বিইআরসির কাছে ফেরত দেয়। তারপরও সরকারের কথা না শুনলে আবার ক্ষমতা চলে যায় কি না, সে ভয় কি এখনো তাড়া করে বিইআরসি কর্মকর্তাদের?

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে যেসব সমস্যা বিদ্যমান, তার সবই ছিল পাকিস্তানেও। বাংলাদেশের মতোই বড় ধরনের বিদ্যুতের সংকট কাটাতে অপরিকল্পিতভাবে বেসরকারি খাতে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু করে পাকিস্তান। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশটির জন্য বোঝা হয়ে উঠেছিল। কারণ, চাহিদার বেশি সক্ষমতার কেন্দ্র স্থাপনের পর এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে বছরে হাজার হাজার কোটি রুপি ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হতো। পরবর্তী সময়ে আইএমএফের কাছে ঋণ সহায়তা চাইলে ভর্তুকি কমানোর শর্ত দেয় সংস্থাটি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সংস্কার শুরু করে। বেসরকারি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি বাতিল ও সংস্কারের মাধ্যমে কমানো হয় উৎপাদন ব্যয়। ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রোডিউসার (আইপিপি) তথা উৎপাদক কোম্পানিগুলোকে ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর শর্ত দেওয়া হয়। একপ্রকার হুমকি দিয়ে পাকিস্তান সরকার সব কোম্পানিকে তাতে রাজি করায়। এভাবে ১৪টি বড় আইপিপির চুক্তি সংস্কার করা হয়। ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর পাশাপাশি চুক্তি সংস্কার করে ‘টেক অ্যান্ড পে’ তথা শুধু বিদ্যুৎ কিনলেই ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের শর্ত দেওয়া হয়। এভাবে মাত্র দুই বছরে পাকিস্তান বিদ্যুৎ খাতের সমস্যার অর্ধেকের বেশি সমাধান করে ফেলে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বড় বড় বুলি আওড়ালেও বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

পাকিস্তানের বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থাও ছিল বাংলাদেশের মতোই দুর্বল। তাই ২০২১ সালে সৌরবিদ্যুতে বিপ্লব ঘটানোর পদক্ষেপ নেয় পাকিস্তান। ব্যাপকভাবে রুফটপ সোলার স্থাপনের মাধ্যমে ২০২৫ সালে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে মোট চাহিদার ২৫ শতাংশ। চার বছর আগে এটি ছিল ৪ শতাংশ। সৌরবিদ্যুতের প্রসারে দেশটিতে জ্বালানির চাহিদা অনেক কমে যাওয়ায় পাকিস্তানে বছরে ১২ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি আমদানির ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে গ্রাহকপর্যায়ে কয়েক দফা কমানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম।

বাংলাদেশেও আগের সরকারগুলোর মতোই বর্তমান সরকারও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের নানা পরিকল্পনা হাজির করছে বটে। তবে সেই পরিকল্পনা আগের মতোই বৃহৎ উৎপাদন প্রকল্পকেন্দ্রিক। অনেক সাধারণ মানুষেরও বুঝতে কষ্ট হয় না যে এ দেশে যত বড় প্রকল্প, তত বড় কমিশন। সে কারণেই নীতিনির্ধারক ও আমলা-প্রকৌশলীদের মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে বড় প্রকল্পের প্রতি। অথচ বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল লাগিয়ে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রেডের সঙ্গে যুক্ত করে সহজেই যে সংকট কাটানো যায়, সেদিকে কারোরই মনোযোগ নেই।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত