Ajker Patrika

সম্ভাবনার পথ কি দেখাবে এবারের শিক্ষা বাজেট

ড. মো. শফিকুল ইসলাম
আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ০৯: ৪২
সম্ভাবনার পথ কি দেখাবে এবারের শিক্ষা বাজেট

বাংলাদেশ আবারও একটি নতুন বাজেট ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু এবারের বাস্তবতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং শিক্ষার রূপান্তরমুখী চাহিদা ইত্যাদি—সব মিলিয়ে শিক্ষা খাত এখন একটি সংকটময় এবং একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় পর্যায়ে দাঁড়িয়ে।

গত এক দশকের মধ্যে শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বেড়েছে, প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শিক্ষার গুণগত মান কতটুকু বেড়েছে? বাস্তবতা হলো, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, যাদের আবার যোগ্যতা ও দক্ষতার ঘাটতিও আছে। সে জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় এখনো পিছিয়ে। ফলে শিক্ষা খাতে শুধু পরিমাণগত নয়, গুণগত রূপান্তর এখন সময়ের দাবি।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৬ শতাংশ বা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। তাই এবারের বাজেটে প্রথম দাবি, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যকরভাবে ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষা খাতে বেশি বরাদ্দ সরকারের জন্য একটি যুগান্তকারী প্রতিশ্রুতি হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং বাস্তবায়নে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিক্ষা একটি দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। এই সত্যটি বহুবার উচ্চারিত হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা সব সময় সমান গুরুত্ব পায়নি। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি এবং প্রাথমিক শিক্ষায় ইউনিফর্ম ও মিড-ডে মিল চালুর উদ্যোগ সরকারের নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এই প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা খাতে বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে অবকাঠামো, শিক্ষকসংকট, শিক্ষার মান—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়ে গেছে। জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য পূরণ করা গেলে তা এই খাতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; এর সঠিক ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনা মূল্যে ইউনিফর্ম বিতরণ এবং মিড-ডে মিল চালু করার উদ্যোগ সামাজিক বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো, পুষ্টির ঘাটতি দূর করা এবং ঝরে পড়া রোধ করতে—এই উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই কর্মসূচির বাস্তবায়নের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি স্কুল ও কলেজ এবং প্রতিটি জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের উদ্যোগ দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। বর্তমান বিশ্বে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে, তাই এই খাতে বিনিয়োগ দেশের যুবসমাজকে কর্মমুখী করে তুলতে সহায়ক হবে। তবে এখানে প্রয়োজন মানসম্মত কারিকুলাম, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং শিল্প খাতের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়। ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই এবং এডু-আইডি চালুর পরিকল্পনা একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে। ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ দিলেই হবে না; এর সঙ্গে প্রয়োজন উপযুক্ত ডিভাইস, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন।

সব মিলিয়ে, ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে, নীতিগত ঘোষণা এবং বাস্তবায়নের মধ্যে একটি বড় ফাঁক রয়ে যায়। তাই এই উদ্যোগগুলোর সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা, সঠিক তদারকি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কাজের বাস্তব প্রমাণ। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। বিশেষ করে ডিজিটাল শিক্ষার অবকাঠামো এখনো অসম। শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বিভাজন শিক্ষার সমতা নষ্ট করছে। তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সুবিধা, স্মার্ট ক্লাসরুম এবং অনলাইন শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঘাটতি গবেষণায়। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে গবেষণানির্ভর জ্ঞান অর্থনীতি গড়ে তুলছে, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল ও আধুনিক ল্যাব সুবিধার অভাবে পিছিয়ে আছে। শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য প্রণোদনা, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা অনুদান এবং শিল্প-শিক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্ত না হলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। এই স্তরে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, সম্মানজনক বেতন এবং আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কমিয়ে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বর্তমান বাস্তবতায় কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব বহু গুণ বেড়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কেবল সনদনির্ভর শিক্ষা দিয়ে চলবে না; প্রয়োজন বাস্তব দক্ষতা। তাই কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ, শিল্প খাতের সঙ্গে সমন্বয় এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে বাজেট বাড়ানো সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে। বাজেট বাস্তবায়নে সুশাসন নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহি ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের শিক্ষার ওপর। তাই ২০২৬ সালের বাজেট শুধু একটি অর্থনৈতিক দলিল নয়, এটি একটি প্রজন্ম গঠনের রূপরেখা। যদি আমরা এখনই সঠিক বিনিয়োগ ও নীতি গ্রহণ করতে পারি, তবে শিক্ষা খাতই হতে পারে দেশের টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এই যুগে প্রশ্নটি আর শুধু কত বরাদ্দ নয়, বরং কোথায়, কেন এবং কীভাবে? আমাদের অর্থনীতির সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কাঠামোগত দুর্বলতা। প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু তা সমানভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, শিল্প খাত পর্যাপ্ত বৈচিত্র্য অর্জন করতে পারেনি, আর কৃষি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। এই বাস্তবতায় বাজেটকে শুধু হিসাবের খাতা না বানিয়ে, একটি রূপান্তরমূলক নীতি-দলিল হিসেবে দেখতে হবে। বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানবসম্পদ উন্নয়ন। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে, কিন্তু শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ না বাড়ালে আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা তহবিল, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

ড. মো. শফিকুল ইসলাম,

সহযোগী অধ্যাপক কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত