
আমাদের অধিকাংশের কাছেই কবির বকুল মূলত গীতিকার। তাঁর লেখা গান বাংলাদেশের জনপ্রিয় শ্রুতি-সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে; শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার তাঁর এই পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় জীবন জন্ম দেয় অন্য একটি প্রশ্ন: গানের জন্য যে কবি-শব্দ বেছে নেন, সুর ও কণ্ঠের মাধ্যম ব্যতিরেকে, কাগজেকলমে সেই কবি কতটা নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন?
২০২৩ সালে স্বপ্ন–‘৭১ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ৬৪ পৃষ্ঠার এই কাব্যগ্রন্থের মূল আকর্ষণ এখানেই। ভাষিক কারণে অনিবার্যভাবে গান থেকে কবিতায় আশ্রায়ন শব্দের দায়িত্বকে বাড়িয়ে দেয়। গান একটি সাধারণ বাক্য কণ্ঠ, সুর, বিরতি ও সংগীতায়োজনের মাধ্যমে বাঙময় হয়ে উঠতে পারে; কবিতায় সেই অতিরিক্ত আশ্রয় নেই। ফলে দ্বিতীয় জীবন-এ বকুলের ভাষার নিজস্ব শক্তি এবং তার সীমাবদ্ধতা—দুটিই পাশাপাশি দেখা যায়।
‘দ্বিতীয় জীবন’ বকুলের পুনর্জন্ম নয়, ভালোবাসার পুনরাবৃত্তি। বইটির শিরোনাম-কবিতাটিকেই পুরো বইটির আবেগ-কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা যায়। এখানে ‘দ্বিতীয় জীবন’-এর ধারণা কোনো বিমূর্ত পরকালীন অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয় না, বরং ভালোবাসার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে। অর্থাৎ আবার জীবন পেলে আবারও একই মানুষকে ভালোবাসার ইচ্ছা। এই জায়গাটিতে বকুলের গীতিকার-সত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট: তিনি বড় কোনো দার্শনিক ধারণাকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সহজ ভাষায় নামিয়ে আনতে পারেন।
‘দ্বিতীয় জীবন’ আসলে জীবনতত্ত্বের চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে একটি প্রেমের প্রতিশ্রুতি রূপে যার শক্তি তার সরলতায়। কিন্তু একই সাথে কবিতাটির ব্যাপ্তিও প্রস্তুত হয়ে যায়। একটি কবিতা যদি শুরুতেই তার আবেগের অর্থ প্রায় সম্পূর্ণভাবে উন্মোচন করে দেয়, পাঠকের আবিষ্কারের জায়গা কমে যায়, তাহলে তাকে কবিতার সংজ্ঞাতে আবদ্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
‘আরেক জীবনেও একই মানুষকে বেছে নেব’—এই আবেগ সুন্দর, কিন্তু কবিতার শক্তি তখন নির্ভর করে এই সরল বক্তব্যকে ভাষা কতটা নতুনভাবে অনুভব করাতে পারে তার ওপর। বকুল সবসময় সেই দ্বিতীয় স্তরটি তৈরি করেন না। গ্রন্থের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পাঠ-প্রমাণগুলোর একটি হলো ‘১৪ মিনিট ১২ সেকেন্ড’। আনিসুল হক তাঁর ভূমিকাতেও এই সময়-নির্দিষ্টতার দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। সংখ্যাটি আপন গভীরতাতে গুরুত্বপূর্ণ।
‘কিছুক্ষণ’, ‘অল্প সময়’ বা ‘একটু দেখা’ বললে যে আবেগগত অস্পষ্টতা তৈরি হতো, ‘১৪ মিনিট ১২ সেকেন্ড’ সেখানে সময়কে একাধারে বস্তুগত ও পরিমাপযোগ্য করে তোলে, যে বিড়ম্বনা সেই আদিযুগের কবিদেরকে যেমন করেছে শঙ্কাক্রান্ত তেমনি সালভাদর দালির মতো আধুনিক চিত্রকরকেও করেছে উদ্বিগ্ন। কিন্তু এও সত্য যে কবিতার তাৎপর্য তৈরি হয় ঠিক বিপরীত জায়গায়: ঘড়ির সময় আর স্মৃতির সময় এক নয়। চৌদ্দ মিনিট বারো সেকেন্ড বাস্তব জীবনে খুব অল্প সময়। কিন্তু কোনো বিশেষ মানুষের সঙ্গে সেই সময়ের সাক্ষাৎ স্মৃতিতে হয়তো বহু বছর স্থায়ী হতে পারে।
ফলে একটি নির্ভুল সংখ্যাকে ভালোবাসার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করে বকুল একটি চমৎকার বৈপরীত্য তৈরি করেছেন। এখানে তার গীতিকারসুলভ শব্দ-পরিমিতি কবিতার পক্ষে কাজ করে। একটি ছোট, নির্দিষ্ট তথ্যের মধ্যেই আবেগের বড় পরিসর তৈরি হয়। এই কবিতাটিই দেখায়, বকুলের কবিতায় জটিল উপমা বা দুরূহ প্রতীকের প্রয়োজন হয় না, শুধুমাত্র একটি ঘড়ির হিসাবই আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। ব্যক্ত করার দরকার হয় না যে স্মৃতি দীর্ঘ; বরং একটি ছোট সময়কে এত নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয় যে তার গুরুত্ব নিজেই অনুভূত হয়।
‘দ্বিতীয় জীবন’-এর প্রেমের কবিতাগুলোর মধ্যে যে আবেগগুলো বারবার ফিরে আসে—অপেক্ষা, বিচ্ছেদ, অনুপস্থিতি এবং ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা—সেগুলোও বকুলের গীতিকবিতার সঙ্গে তাঁর গানের সম্পর্কটি বোঝাতে সাহায্য করে যে গুলো পাঠকের কাছে তৎক্ষণাৎ পরিচিত। বকুলকে অনুভূতির অভিধান তৈরি করতে হয় না; তিনি জানেন কোন শব্দে শ্রোতা বা পাঠক দ্রুত নিজের অভিজ্ঞতাকে চিনে নিতে পারে।
এ কারণেই তাঁর কবিতায় একটি নিভৃত আলাপচারীতার আন্তরিক আবহ তৈরি হয়। কবি যেন কোনো দূরবর্তী, দুর্বোধ্য ‘কাব্যিক’ ভাষায় কথা বলেন না; বরং খুব পরিচিত একজন মানুষের মতো নিজের অভিজ্ঞতা জানান। ‘দ্বিতীয় জীবন’ নামটি স্বাভাবিকভাবেই ডব্লিউ. বি. ইয়েটসের The Second Coming-এর কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। তবে এই তুলনাকে তার কোন প্রভাবের ছায়া হিসাবে বিবেচনা করার কারণ নেই। ইয়েটসের কবিতায় যে ‘দ্বিতীয়’ আগমন সেটি এক অস্থির, ভীতিকর ঐতিহাসিক মুহূর্তের সঙ্গে যুক্ত। বকুলের ক্ষেত্রে ‘দ্বিতীয়’ জীবন ব্যক্তিগত ভালোবাসার পুনর্নির্বাচন। অর্থাৎ ইয়েটসের কাছে পুনরাগমন উদ্বেগের; বকুলের কাছে তা আশার।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বকুলের কবিতার প্রকৃতি বোঝায়। তিনি ইতিহাসের বিপর্যয় বা সভ্যতার সংকটকে কেন্দ্র করেন না; তাঁর কবিতার জগৎ প্রধানত ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভেতরে নির্মিত। তাঁর ‘দ্বিতীয় জীবন’ তাই মহাজাগতিক পুনর্জন্ম নয়, বরং ব্যক্তিগত স্মৃতি ও ভালোবাসার পুনরাবৃত্তি। বকুলের কবিতাকে তাঁর গানের পরিচয় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে পড়াও সম্ভব নয়। বরং দ্বিতীয় জীবন নিজেই এই সম্পর্কের একটি উদাহরণ।
শিরোনাম কবিতাটি ইমরান ও পড়শীর কণ্ঠে গান হয়েছে; সুর ও সংগীতায়োজন করেছেন ইমরান মাহমুদুল। গ্রন্থের আরেকটি কবিতা পুরোনো ডায়েরি থেকে নেওয়া বলে জানা যায় এবং সেটিও বেলাল খানের সুরে নচিকেতার কণ্ঠে গান হয়েছে। এই তথ্যগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—কবিতাগুলো কি মূলত গান হওয়ার জন্যই তৈরি, নাকি তারা স্বতন্ত্র কবিতা হিসেবেও দাঁড়াতে পারে?
দ্বিতীয় জীবন-এর পাঠে উত্তরটি একেবারে একরৈখিক নয়। কিছু কবিতার ছন্দ, পুনরাবৃত্তি, সরল বাক্যগঠন ও আবেগের দ্রুত উন্মোচন গান হওয়ার জন্য স্বাভাবিকভাবে উপযোগী। ফলে গীতিকার হিসেবে বকুলের দক্ষতা এখানে স্পষ্ট। কিন্তু একই বৈশিষ্ট্য কখনো কবিতাকে অতিরিক্ত পরিচিতিও দেয়। অর্থাৎ যে ভাষা গানে সুরের সঙ্গে মিশে খুব সহজে মনে থাকে, মুদ্রিত পৃষ্ঠায় সেই ভাষাকেই আরও একটি কাজ করতে হয়: তাকে পাঠকের চিন্তায়র অন্তস্রতেও মেশাতে হয়।
বকুলের কবিতার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা সম্ভবত তাঁর সরলতার মধ্যেই নিহিত। কিন্তু সেই সরলতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কোনো অনুভূতি সরাসরি বলা আর কোনো অনুভূতিকে এমন একটি চিত্রকল্পে প্রকাশ করা, যা পাঠককে নিজে অর্থ আবিষ্কার করতে বাধ্য করে—দুটি এক নয়। দ্বিতীয় জীবন-এ অনেক সময় আমরা আবেগটি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলি। কিন্তু বুঝে ফেলার পর দ্বিতীয়বার ফিরে তাকানোর প্রয়োজন সবসময় তৈরি হয় না।
একটি শক্তিশালী কবিতা সাধারণত প্রথম পাঠের পরও কিছুটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়; পাঠককে আবার ফিরতে বাধ্য করে। সেখানে কোনো অপ্রত্যাশিত শব্দ, অসমাপ্ত ভাবনা, দ্ব্যর্থক ছবি বা নীরবতার জায়গা থাকতে পারে। এই কারণেই দ্বিতীয় জীবনকে কবীর বকুলের কবিসত্তার চূড়ান্ত মূল্যায়ন হিসেবে পড়ার চেয়ে একটি সম্ভাবনাময় পর্যায় হিসেবে পড়া বেশি ফলপ্রসূ। আমরা এতদিন কবির বকুলের শব্দ অন্যের কণ্ঠে শুনেছি।
দ্বিতীয় জীবন সেই শব্দগুলোকে কণ্ঠ, সুর ও সংগীতের বাইরে এনে আমাদের সামনে হাজির করে। এই বিচ্ছিন্নতা তাই তার জন্য শুধু পরীক্ষা নয়, সম্ভাবনাও। কারণ গানের বাইরে এসে তার কবিতা যখন নিজস্ব নীরবতা তৈরি করতে পারে, তখনই আমরা গীতিকার কবির বকুলের আড়াল থেকে আরেকজন কবির বকুলকে দেখতে শুরু করি।

টাকা কামানো আজকাল খুব সহজ হয়ে গেছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক—সবাই পারবেন, শুধু মাথাটা এদিক-সেদিক নাড়িয়ে নিতে হবে। এর আগে পৌঁছাতে হবে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার এক মুরগির খামারে, নয়তো ডেমাজানি ব্রিজের কাছে একটি গুদামে। সেখানে গিয়ে ফিটফাট হয়ে কয়েকটা ছবি তুলে বা ভিডিও করলে পাওয়া যায়...
১০ ঘণ্টা আগে
ড. তৌহিদুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ। অপরাধ, অপরাধ-অর্থনীতি, অপরাধের সমষ্টিভিত্তিক সমাধান, অপরাধের রূপান্তর প্রসঙ্গ নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করেন।
১০ ঘণ্টা আগে
আগে লোকালয়ের কাছাকাছি বা বড় কোনো গাছে বা বাঁশঝাড়ে যে ছোট বাঘটিকে দেখে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ত, সেটিই মেঘলা চিতা। মানুষ এদের আক্রমণাত্মক মনে করত। আদতে এরা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না, বরং বনেই লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে।
১০ ঘণ্টা আগে
একি খেলা বিমানবন্দরে! ইমিগ্রেশন পুলিশের মনে হয়েছে একটু দাদাগিরি করবে! বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে নেপালের পথে রওনা হয়েছিলেন তিন নারী। কিন্তু অদ্ভুত এক কারণে তাঁদের যাত্রা বাতিল করতে হয়। আর এ জন্য সম্পূর্ণ দায়ী ইমিগ্রেশন পুলিশ।
১ দিন আগে