
একটা চিরন্তন কুইজ দিয়ে শুরু করি। বাংলাদেশে এমন কী সমস্যা আছে, যা বারবার বলার পরও, জনগণের হাজার কষ্ট প্রতিদিন দেখার পরেও শাসকগোষ্ঠী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বোঝার পরও তার সমাধান হয় না, বরং সমস্যাটা দিন দিন বাড়তে থাকে। সেটি কী? সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের পথঘাটের অবর্ণনীয় সমস্যা। প্রবল যানজট দিনের কর্মঘণ্টার একটা বিরাট সময় রাস্তায় কেটে যায়, আবার ছয় লেন, আট লেনের মহাসড়কগুলোতেও দুর্ভোগের শেষ নেই। ঈদের সময় দুর্ঘটনায় শত শত মানুষের প্রাণ যায়। শহরগুলোতে এখন নতুন উৎপাত সৃষ্টিকারী তিন চাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নাম জনগণ ব্যঙ্গ করে দিয়েছে ‘টেসলা’। তিন চাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ভরে গেছে সারা দেশ। যেহেতু এসব যানবাহনে অর্থলগ্নি কম, লাখ টাকার মধ্যেই হয়ে যায় এবং চালকদের কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না, তাই হাজারে হাজারে টেসলা চলছে, প্রতিদিন রাস্তায় নামছে এবং রাস্তাগুলো টেসলাময় হয়ে উঠছে। আমাদের দেশের মানুষ ঐতিহাসিকভাবে অলস, হাঁটতে চায় না। তাই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোতে তাদের চলাচল খুবই সহজ, স্বল্প দূরত্বের পথটিও তাদের হেঁটে যেতে কষ্ট। তাই গণপরিবহনের ব্যবস্থা না করে শাসকগোষ্ঠী এই টেসলার সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ছোট্ট শহরগুলোতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে এই টেসলার ব্যবহার লক্ষণীয়। যাতে করে সরু রাস্তাগুলো সব সময়ই যানজটে স্তব্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের পথঘাটে পরিবহনের ব্যবস্থা দেখলে এ দেশে যে কোনো আইনশৃঙ্খলা দেখার কর্তৃত্ব কারও আছে, তা ভাবাই যায় না। উত্তরা, মিরপুর, মতিঝিলে যে মেট্রোরেলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, আত্মঘাতী বাঙালি তাতেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এ দেশে মেট্রোরেল এবং পাতাল রেল বহু আগেই হওয়া উচিত ছিল এবং এখনো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এসব পরিবহনের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, কলকাতার যানজট আমরা দেখেছি, দেখেছি ব্যাংককের যানজট। কিন্তু দুটি শহরই খুব দ্রুতই পাতাল রেল, উড়াল রেল এবং এক্সপ্রেসওয়ের ব্যবস্থা করে যানজট নিয়ন্ত্রণ করেছে।
আবারও একটি কুইজ দিতে ইচ্ছা করে। পৃথিবীতে এমন দেশ কি আছে, যেখানে রাজধানী শহরে কোনো ট্রাফিক সিগন্যল নেই, ট্রাফিক সিগন্যাল থাকলেও লাল বাতিতে গাড়ি চলে, সবুজ বাতিতে গাড়ি থেমে থাকে! আমরা ঐতিহাসিকভাবে পুলিশের কাছে আমাদের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছেড়ে দিয়েছি। উন্নত দেশগুলোতে এই ব্যবস্থাটি থাকে সিটি করপোরেশনের হাতে, যেখানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণ থাকে করপোরেশনের হাতেই। পরিবহনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ বাহিনীকে নিয়োগ করা হয়ে থাকে। এখানে সেই ধরনের দক্ষ জনশক্তি নেই বললেই চলে। একটি রাজপথে অন্তত ২০টি হাসপাতাল, শপিং মল, দোকানপাট থাকলেও রাস্তাটি স্বাভাবিকভাবেই পরিবহনের চাপ নিতে অক্ষম। গণপরিবহনের নিয়ন্ত্রণটি যখন সিটি করপোরেশনের হাতে থাকে, তখন পুলিশ কমিশনাররা মেয়রের অধীন থাকেন, তাই নির্বাচিত মেয়রের জবাবদিহি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মেয়রকে অবশ্যই নাগরিকদের ইচ্ছানুসারে চলতে হয়। যদিও আমরা সিটি করপোরেশন এবং মিউনিসিপ্যালিটিগুলোকে আবার সেই রকম ক্ষমতা প্রদান করিনি, কখনো কখনো এসব ক্ষমতা গ্রহণ করতেও তারা অপারগ, তাই সমস্যা বেড়েই চলছে।
অদূর ভবিষ্যতে এই শহরে একমাত্র ওপরের রাস্তাগুলো চলবে, কিন্তু বাকি রাস্তাগুলো অচল হয়ে পড়বে। এই বাস্তবতা জেনেও শাসকগোষ্ঠী তেমন কোনো গুরুতর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আমাদের দেশের শাসকেরা অবশ্য গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি, উত্তরায় থাকেন, কোটি টাকা দামের গাড়ি চালান। তাঁদের সামনে যখন এই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অবাধে চলতে থাকে এবং রাজধানী শহরের যে চিত্র ভেসে ওঠে, তা তাঁদের আত্মমর্যাদায় লাগে না।
বলা হয়ে থাকে একটি দেশ কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ, তা বোঝা যায় রাজপথে যানবাহনের আচরণ দেখে। এই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোর যাঁরা চালক, তাঁদের কোনো ধরনের লাইসেন্স বা কাগজের প্রয়োজন পড়ে না। রাজপথে দায়িত্বহীন ও অদক্ষ চালকেরা যদি কোনো যানবাহন চালানোর অধিকার এমনিতেই পেয়ে যান, তাহলে তাঁকে রুখবার ক্ষমতা ভবিষ্যতে কারও থাকবে না। সম্প্রতি এই অটোচালকদের দ্বারা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কিছু কর্মকর্তাও নিগৃহীত হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা সংখ্যায় এত বেশি যে পুলিশও ভয়ে তাঁদের কিছু বলে না। এ কথা ঠিক যে, দেশে বেকারত্বের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এই চালকেরা তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে। তাঁদের যদি বিকল্প আয়ের উৎস না থাকে, তাহলে তাঁরা কীভাবে জীবনধারণ করবেন?
তাঁদের বেকারত্বের বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের উচিত, প্রতিটি নাগরিকের জীবিকার সংস্থান করা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো ধরনের বালাই ছিল না। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের কথা তারা কখনো ভাবেনি। কিন্তু একের পর এক অসম চুক্তি স্বাক্ষর করে দেশকে সমস্যার অতলে নিয়ে যায় এবং সেই সরকার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার ফন্দিফিকির খুঁজেছে, যার প্রমাণ এখন সর্বত্র শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান তাঁর নিজস্ব স্বার্থ হাসিল করার উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। এখনো একবারের জন্য হলেও সংসদে সেসব চুক্তি নিয়ে কোনো কথা হচ্ছে না। নাগরিকদের জীবনধারণের জন্য অসংখ্য বেকারের কর্মসংস্থানের কোনো চিন্তা, কোনো উদ্ভাবন এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। অতীতে বহুবার রিকশা নিয়ন্ত্রণের জন্য নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো বিপুলসংখ্যক রিকশাচালকের চাপে রক্ষা করা যায়নি।
কয়েক বছর আগে স্কুল-কলেজের শিশু-কিশোরেরা শহরের যানবাহন নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু তা-ও একপর্যায়ে কৌশল খাটিয়ে সমস্যার সমাধান না করে ভেঙে দেওয়া হয়। বাসমালিকদের ভাড়া বৃদ্ধি করা থেকে যথেচ্ছাচার সরকার বারবার মেনে নিয়েছে। কারণ, বাসমালিকেরা সব সময়ই সরকারের অংশ হয়ে থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক আনুকূল্য না পেয়ে একটা পর্যায়ে হতাশ হয়ে যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাস্তায় কর্মরত ক্ষমতাপ্রাপ্ত পুলিশকে চালকেরা ভীষণভাবে ভয় পান। কারণ, তাঁরা জানেন অন্যায়ভাবে কোনো চালক কোনো অপরাধ করলে তাঁর রেহাই নেই। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এ কথাও সত্যি, আমাদের পুলিশ নানাভাবে অসদুপায় অবলম্বন করে থাকে। দেখা যায়, গাড়ির শরীরে অসংখ্য আইন ভঙ্গের চিহ্ন থাকা সত্ত্বেও সেগুলো রুট পারমিট পেয়ে যায়। মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো পরিবহন নিয়ন্ত্রণের ওপর তাদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিয়ে চলে অবারিত। অতীতে এমনও দেখা গেছে, কোনো এক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতা বিআরটিএর কাছে বিনা পরীক্ষায় ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছেন। এসব অন্যায় আবদার সরকার অনেক সময়ই মেনে নিয়েছে।
এই যে আইন লঙ্ঘন করে দুরন্ত গতিতে গাড়ি চালিয়ে শত শত মানুষের জীবনহানি করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে কোনো সুষ্পষ্ট নির্দেশনা বা ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। অবশ্য সার্বিকভাবে রাষ্ট্রের নাগরিকদের দায়িত্বহীনতার কথাও এখানে ভাবা উচিত। হাইওয়েতে রাস্তা ফাঁকা থাকলে উল্টো পথে কিছু চালক গাড়ি চালিয়ে থাকেন। ট্রাফিকব্যবস্থা না মানাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতাবানদের একটা প্রবণতাও দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রাস্তা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশের লোকদেরও পরিবহনের ব্যবসা রয়েছে, সেগুলোর আইন ভঙ্গ করার নজিরও তৈরি হয়েছে। সব ধরনের চালকদের রাস্তায় নামবার আগে তাঁর শারীরিক, মানসিক এবং রাষ্ট্রের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধতার প্রশিক্ষণ থাকা উচিত।
এ কথাও জানি, এই খবরের কাগজটি কোনো চালক, বাসমালিক পড়বেন না। গণমাধ্যমের কোনো নির্দেশনাও তাঁরা দেখবেন না। তাই একধরনের নৈরাজ্য আমাদের পথঘাটে চলতেই থাকবে। সমস্যাটি শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনার ওপর ছেড়ে না দিয়ে নাগরিকদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু কোনো সরকারই কোনো বিষয়ে নাগরিকদের সহযোগিতা চায় না। শুধু তা-ই নয়, নাগরিকদের কোনো রকম প্রস্তাবকেও তারা গ্রাহ্য করে না। একমাত্র সুষ্ঠু ভোট হলে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। এই যে রাজপথের নৈরাজ্য, এটাকে বন্ধ করতে গেলে অবিলম্বে সরকারের উচিত হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমিক শক্তি এবং সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে নিয়ে এই ব্যবস্থাটিকে একটা নতুন পরিকল্পনার মধ্য নিয়ে আসা। সেই সঙ্গে স্মরণ করতে চাই শিশু-কিশোরদের হাতে যে কদিন এর কর্তৃত্ব ছিল, তখন তারা একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছিল। নতুন কোনো ব্যবস্থাপনার জন্য স্কুল-কলেজের ছাত্রদেরও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সর্বোপরি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিবেচনা করা খুবই জরুরি।

ইতিহাসই একদিন ইতিহাস হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কোন রাজনৈতিক দল কোন পক্ষ নিয়েছিল, সেটা ইতিহাসের পাতা ওলটালেই দেখা যাবে। এটি কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী দলের কোনো কোনো সংসদ সদস্য তাঁদের নিজ পরিবারকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার বলার যে মরিয়া চেষ্টা করছেন, তার পেছনের উদ্দেশ্য খোঁজা দরকার।
৮ ঘণ্টা আগে
বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় জ্ঞান সৃষ্টি, মুক্তচিন্তা ও জাতীয় উন্নয়নের প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার বর্তমান চিত্র দেখলে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি শুধু ডিগ্রি প্রদানের কারখানায় পরিণত করেছি?...
৯ ঘণ্টা আগে
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করাতেই হবে। বর্তমান সরকার দুদক আইন সংশোধনের যে নতুন খসড়া তৈরি করেছে, তাতে সংস্কার কমিশনের যুগান্তকারী প্রস্তাবগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে দুদক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে...
১ দিন আগে
একের পর এক মন খারাপ করা খবরের তালিকায় যোগ হলো আরেকটি। গত মঙ্গলবার দেশের সব বড় দৈনিকেই খবরটি ছাপা হয়েছে গুরুত্ব দিয়ে। লালমনিরহাটে সাত বছরের এক শিশুর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। কয়েক দিন নিখোঁজ থাকার পর ভুট্টাখেতে পুঁতে রাখা অবস্থায় পাওয়া যায় অবোধ শিশুটির নিথর দেহ।
১ দিন আগে