Ajker Patrika

ডেভিড ব্রুকস ও স্বৈরশাসন নিয়ে কিছু কথা

জাহীদ রেজা নূর
ডেভিড ব্রুকস ও স্বৈরশাসন নিয়ে কিছু কথা
জালিয়াতির কারণে পৃথিবীর বহু দেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করছে না। ছবি: সংগৃহীত

জালিয়াতিতে বাংলাদেশ পৃথিবী চ্যাম্পিয়ন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, সব জিনিস জাল। বহু দেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না। ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল, একটা জালিয়াতকারীর কারখানা বানিয়েছি আমরা। আমাদের বুদ্ধি আছে, কিন্তু সেটা খারাপ কাজে লাগাচ্ছি।

আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ থেকে উদ্ধৃত এই অংশটুকু। কিছুক্ষণ শব্দগুলোর দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকতে হলো। বাংলাদেশ জালিয়াতিতে পৃথিবী চ্যাম্পিয়ন বলার পর আরও অনেক কথাই তিনি বলেছেন। তাতে একটা জালিয়াতকারীর কারখানার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। ধনধান্য পুষ্পভরা বসুন্ধরায় যে দেশটিকে সকল দেশের সেরা হিসেবে দেখেছিলেন একদা এক স্বপ্নদ্রষ্টা কবি, তিনি নিশ্চয় প্রধান উপদেষ্টার কথা শুনে হকচকিয়ে যাবেন। দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ভাগ্য আমাদের বহুবার বরণ করে নিতে হয়েছে। তারপরও মানুষ আশায় বুক বেঁধেছে, হয়তো কোনো না কোনো সময় আমাদের দেশের মানুষ দুর্নীতিমুক্ত হবে, কোনো এক জাদুকর এসে দেশকে এক অসাধারণ স্বপ্ন-রাষ্ট্রে পরিণত করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যে কেবল স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে, সে কথা এখন কে অস্বীকার করবে?

বিগত ১৫ মাসে জনগণ এত বেশি নতুন নতুন নাটক দেখেছে, যা তাদের সহ্যক্ষমতাকে অবশ করে দিয়েছে। আদতে সবকিছু মিলে কী ঘটতে যাচ্ছে, সেটাই তো পরিষ্কার হচ্ছে না। কেন পৃথিবীর বহু দেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করছে না, তার উত্তর আসলে কে দেবে? কার দেওয়ার কথা? বাঙালি জালিয়াতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে থাকলে কি বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস তাতে ম্লান হয়ে যাবে? একটি খারাপ কি একটি বড় ভালোকে ঢেকে দেবে? যে সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙালি তার আত্মপরিচয় খুঁজেছিল এবং তারই প্রবল স্রোতে একটি স্বাধীন দেশ গড়ে তুলেছিল, তার মধ্যেও কি জালিয়াতি খোঁজা হবে? ভিসা, পাসপোর্ট জাল করছে যারা, যারা জালিয়াতকারীর কারখানা বানিয়েছে দেশটাকে, তাদের শায়েস্তা করার দায়িত্ব আসলে কার? কোথায় কখন কোন সংস্কার এসে আমূল পাল্টে দিয়েছে মানুষের ভাবনার জগৎ, মানুষের বাস্তব জীবন—এই প্রশ্নের উত্তর কি আছে কারও কাছে?

২. ডেভিড ব্রুকসের লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ২৩ জানুয়ারির নিউইয়র্ক টাইমসে। লেখাটির মধ্যে অনেক ভাবনার খোরাক আছে। মূলত লেখাটির সিংহভাগজুড়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনকাল নিয়ে শঙ্কার কথা। কানাডিয়ান বংশোদ্ভূত মার্কিন কলামিস্ট ডেভিড ব্রুকস নিজেকে মধ্যপন্থী রিপাবলিকান বলে পরিচয় দেন ঠিকই, কিন্তু যখন তিনি নিউইয়র্ক টাইমসে তাঁর কলাম লেখেন, তখন ঘটনাবলির চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। আমার আজকের লেখার সিংহভাগ জুড়ে থাকবে ডেভিড ব্রুকসের লেখারই প্রতিধ্বনি। কিন্তু চেষ্টা করব মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ছাপিয়ে তাঁর লেখার নির্যাস যেন আমাদের দেশেও এসে পৌঁছায়। আমরা আমাদের রাজনীতির সমুদ্রে সেই প্রশ্নগুলো ছেড়ে দিয়ে পাঠককে বলি, আপনিই বিচার করে দেখুন, আসলে চারপাশে কী ঘটে চলেছে।

৩. ডেভিড ব্রুকস যুক্তরাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে চার ধরনের ভাঙন দেখতে পাচ্ছেন, সেগুলোর মধ্যে আছে যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভাঙন। ঘরোয়া শান্তি-শৃঙ্খলার ভাঙন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে সাজানো মামলার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আরও ভাঙন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মানসিক অবস্থার ভাঙন। প্রথম এবং শেষের ভাঙন দুটিকে আলাদা করলে আর যে দুটি থাকে, সে দুটি আমাদের দেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় কি না, ভেবে দেখুন। উদাহরণ দেওয়ার দরকার নেই। যার বোঝার, সে ঠিকই বুঝে নিতে পারবে।

ডেভিড ব্রুকস লিখছেন, ‘আমি যে প্রত্যেক প্রেসিডেন্টকে কভার করেছি, তাঁরা সবাই ক্ষমতায় যত বেশি সময় থেকেছেন, ততই নিজেদের নিয়ে আরও আত্মমুগ্ধ হয়েছেন।’ একটু ভেবে দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যাবে, আমাদের দেশেও যাঁরা যত দিন ক্ষমতায় থেকেছেন, তাঁরাও ততটা স্বৈরাচার হয়ে উঠেছেন। স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা থেকে সত্যিকারের গণতন্ত্রে উত্তরণের স্লোগানগুলো এখন বড্ড সেকেলে শোনায়। যাদের কণ্ঠে এই স্লোগানগুলো শোনা যায়, তাদের অনেকের সঙ্গে সেগুলো আর মানানসই হয় না। স্বৈরাচারের প্রতিবাদ যদি স্বৈরাচারী ভাষায় করা হয়, নিজের পথে না চললেই যে কাউকে যদি কারও ‘দোসর’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়, গালাগালিকে যদি গণতন্ত্রের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করার অবাধ সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, তাহলে আসলে চারপাশে ঘটছেটা কী, সেসব নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে।

স্বৈরাচারের কথা যখন উঠলই, তখন আমরা দেখি, কথাটাকে ডেভিড কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘স্বৈরাচারের বক্ররেখা অবক্ষয়ের দিকেই বাঁকে। সাধারণত স্বৈরশাসকেরা নিজেদের ক্ষমতায় মাতাল হয়ে পড়ে; এতে ধীরে ধীরে সংযম কমে যায়, অধিকারবোধ ও আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ে, ঝুঁকি নেওয়া এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়, আর একই সঙ্গে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, দুর্নীতি এবং প্রতিরক্ষামূলক সন্দেহপ্রবণতাও তীব্র হয়।’

এ নিয়ে কি মন্তব্য করার কিছু আছে? আমরা আমাদের দিকে তাকালে এর প্রতিটি শব্দকেই কি চিনে নিতে পারি না? নতুন বন্দোবস্তের নাম করে পুরোনো বন্দোবস্তের কতটা বাইরে আসতে পারলাম আমরা? সেই তো থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়ের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা!

৪. ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও জনসমাজের শৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। প্রথমটির অবক্ষয় ঘটলে দ্বিতীয়টির পতন অনিবার্য। ব্যক্তিগত নৈতিকতা নিয়ে কত ধরনের ‘গল্প’ আজ ভেসে বেড়ায়! সেই গল্পগুলোর মধ্যে সত্যতা খোঁজার চেষ্টা কতটা হয়েছে বা হচ্ছে?

এবার আসবে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড গিবনের কথা। ১৭৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ডেক্লাইন অ্যান্ড ফল অব দ্য রোমান এম্পায়ার’-এ এডওয়ার্ড গিবন লিখেছিলেন, ‘আমাদের সব আবেগ ও কামনার মধ্যে ক্ষমতার প্রতি ভালোবাসাই সবচেয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ এবং অসামাজিক প্রকৃতির; কারণ, একজন মানুষের অহংকারের তৃপ্তির জন্য বহু মানুষের আত্মসমর্পণ দরকার হয়।’

আহা! কী অসাধারণ কথাই না বলেছেন তিনি। এবং কথাগুলোকে পাকাপোক্ত করতে আরও লিখেছেন, ‘গৃহকলহের বিশৃঙ্খলায় সমাজের আইনগুলো কার্যকারিতা হারায়, এবং মানবতার আইন খুব কমই তাদের স্থান নিতে পারে। সংঘাতের উন্মাদনা, বিজয়ের অহংকার, সাফল্যের হতাশা, অতীতের আঘাতের স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ বিপদের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে মনকে উত্তপ্ত করে তোলে এবং করুণার কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেয়। এসব প্রেরণা থেকেই ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি পাতা গৃহযুদ্ধের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে।’

আর কি কিছু বুঝতে বাকি থাকে? বিজয়ী পক্ষ যখন প্রতিপক্ষকে আঘাত করার মতো জিঘাংসা নিয়ে এগিয়ে যায়, বিজয়ী পক্ষের ভেতর যদি ঐক্য বা মিলনের সুর বেজে না ওঠে, তাহলে বিভক্ত জাতি কি আর এগিয়ে যেতে পারে?

৫. একজন স্বৈরশাসকের প্রভাব মানুষজনের ওপর কীভাবে পড়ে? যখন স্বৈরশাসক প্রথম ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন ‘দাসত্বের দিকে ঢল’ নামে—একদল চাটুকারের জোয়ার বড় মানুষটির দিকে ধাবিত হয়। প্রশংসা সব সময় বাড়তে থাকে এবং চাটুকারেরা আরও বেশি দাসত্ব হয়ে ওঠে। ...স্বৈরশাসনের রোগ যত বাড়ে, নাগরিকেরা ধীরে ধীরে ততটাই গণতন্ত্রের অভ্যাস হারাতে থাকে—মানুষের মনোবল ও উদ্দীপনা পুনরুদ্ধার করার চেয়ে তাদের ভেঙে দেওয়া সহজ। কথাগুলো প্রাচীন রোমের স্টয়িক ঘরানার দার্শনিক টাসিতাসের।

নির্বাচনী প্রচারণার দিকে খেয়াল রাখুন, আর বোঝার চেষ্টা করুন, সেই চাটুকারিতার প্রতিধ্বনি কোথাও পাচ্ছেন কি না। গণতন্ত্রের অভ্যাস যখন হারাতে থাকে মানুষ, তখনই কিন্তু স্বৈরাচার উঠে আসে। আর সে পথে ঘাপটি মেরে বসে থাকা উগ্রপন্থী শক্তি নিজেদের লুকিয়ে রাখা নখর বের করে। কেউ কি খেয়াল করে দেখেছেন, এমন ঘটনা আমাদেরই দেশের কোথাও কোনোভাবে ঘটছে কি না?

আচ্ছা, ইতিহাসে কি এমন কোনো উদাহরণ আছে, যেখানে আমরা দেখতে পাব ক্ষমতার নেশায় ধাবিত কোনো স্বৈরশাসক হঠাৎ নিজের ভুল বুঝতে পেরে মধ্যপন্থী হয়ে দেশকে গণতন্ত্রের দিকে পরিচালনা করেছেন? বরং বিপরীতটাই আমরা দেখেছি। স্বৈরাচার রোগের সাধারণ গতি হলো, ক্রমেই দ্রুততর অবক্ষয় ও অধঃপতনের দিকে যাওয়া।

৬. জাতিকে যিনি নেতৃত্ব দেন, তিনি মানুষের মনে স্বপ্নেরও জন্ম দেন। মানুষকে ভয় দেখান না এবং অবজ্ঞা করেন না। পুঁজিপতিদের জন্য বিশ্ব গড়ে তোলা আর সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক কথা নয়। একটি জাতিকে তখনই নৈতিক বলে বলীয়ান করে তোলা সম্ভব, যখন সে জাতির গৌরবের জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে তার জয়গান করা হয়। কিন্তু তা লোকদেখানো জয়গান হয়ে গেলে জনগণ তাতে বিরক্ত হয়। গৌরবের কথা এমনভাবে বলা দরকার, যেন কখনো মনে না হয় বানিয়ে বা বাড়িয়ে কিছু বলা হচ্ছে। সেই ভাষার অভাব রয়েছে আমাদের। জাতিকে নিয়ে গর্ব করার মতো উদার মনের অধিকারী হতে হয়। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্রে রাখা না হলে তা অর্জন করা যায় না। যে জনযুদ্ধে গৌরবের অধিকারী হয়েছিল এই ভূখণ্ডের মানুষ, সেই ভূখণ্ডকে জালিয়াতের দেশ বলে মেনে নিতে মন সায় দেয় না।

কেউ কি আছেন, যিনি জালিয়াতকারী চক্রকে প্রতিহত করে সত্যিকারের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সমাজ উপহার দিতে পারবেন?

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত