Ajker Patrika

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের কারণ এবং তার প্রভাব

আব্দুর রহমান 
আপডেট : ০৭ মে ২০২৬, ০৭: ৪৪
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের কারণ এবং তার প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা দলের জয়ে বিজয় উদ্‌যাপন করছেন। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বড় জয় পেয়েছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভার ২৯৩ আসনের ফল ঘোষিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০৭ আসনে জিতে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে দলটি। আগের বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের আসন নেমে এসেছে ৮০টিতে।

বিজেপির এই বিশাল জয় একক কোনো কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। তৃণমূলকে মোকাবিলা করতে হয়েছে অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি বা শাসনবিরোধী মনোভাব, নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, নারীদের নিরাপত্তাসহ নানা ইস্যু। অন্যদিকে বিজেপির ছিল শক্তিশালী সংগঠন ও প্রচারযন্ত্র। এই বিচ্ছিন্ন উপাদানগুলোকে আদর্শিক সংহতি দিয়েছে ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’। এটি অসন্তোষকে রূপ দিয়েছে একধরনের সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত চিন্তাধারায়।

বিজেপি বাংলাদেশকে ব্যবহার করেছে একটি রাজনৈতিক আয়না হিসেবে, যেখানে ভোটারদের সামনে পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন তুলে ধরা হয়েছে—হিন্দু বনাম মুসলিম, শরণার্থী বনাম অনুপ্রবেশকারী হিসেবে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার খবর এই বয়ানকে আরও শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাভীতির অনুভূতি তৈরি করেছে।

এই বয়ানকে বিজেপি তিনভাবে কাজে লাগিয়েছে—সিএএর মাধ্যমে শরণার্থীদের নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, অবৈধ অভিবাসন ইস্যুতে তৃণমূলকে অভিযুক্ত করে এবং সীমান্ত ও নাগরিকত্ব প্রশ্ন সমাধানে নিজেদের একমাত্র কার্যকর শক্তি হিসেবে তুলে ধরে।

মতুয়া সম্প্রদায় এই রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল। তৃণমূল কল্যাণমূলক সুবিধা দিয়ে তাদের পাশে রাখতে চাইলেও বিজেপি নাগরিকত্বকে ‘ঐতিহাসিক ন্যায়ের’ প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে তাদের আকৃষ্ট করেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনও এই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তোলে। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির এই বয়ানকে সাম্প্রদায়িক বলে সমালোচনা করলেও, তাঁর প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ভয় কাটাতে পারেনি।

সব মিলিয়ে, ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’ বিজেপিকে স্থানীয় সমস্যা থেকে বড় জাতীয় নিরাপত্তা সংকটের বয়ান তৈরি করতে সাহায্য করেছে। ফলে হিন্দু ভোটারদের একত্রীকরণ হয়েছে এবং তৃণমূল একটি দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে।

এ ছাড়া এবারের নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে পশ্চিমবঙ্গের নারীরাও তাঁদের ‘দিদি’ মমতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন খানিকটা। তৃণমূল দীর্ঘদিন ধরে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’ ও ‘রূপশ্রী’র মতো প্রকল্পের মাধ্যমে নারী ভোটব্যাংক ধরে রেখেছিল এবং ২০২১ সালেও নারী ভোটের বড় অংশ পেয়েছিল। নির্বাচনের আগে তারা ‘লক্ষ্মীর ভান্ডারে’র ভাতা বাড়ালেও এবার সেই সমীকরণ ভেঙে যায়। এই প্রকল্পের আওতায় সাধারণ শ্রেণির নারীরা মাসে ১ হাজার টাকা এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের নারীরা মাসে ১ হাজার ২০০ টাকা করে পান।

কিন্তু মমতার এসব প্যাকেজের বিপরীতে বিজেপি পাল্টা আরও আকর্ষণীয়, চটকদার প্যাকেজের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে। তারা ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’ প্রকল্পে মাসে ৩ হাজার রুপি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, সঙ্গে নারীদের জন্য নিরাপত্তা, চাকরিতে ৩৩ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ, বাসে ফ্রি যাতায়াতসহ নানা সুবিধা ঘোষণা করে। এ ছাড়া সন্দেশখালী সহিংসতা ও আরজি কর ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডকে সামনে এনে তারা তৃণমূলকে চাপে ফেলে।

নারী ভোটারদের বার্তা দিতে বিজেপি আরজি কর ঘটনায় নিহতের মা রত্না দেবনাথ ও সন্দেশখালীর মুখ রেখা পাত্রকে প্রার্থী করে এবং দুজনই জয় পান। সব মিলিয়ে, নারী ভোটে বড় ধস, নিরাপত্তা ইস্যু ও অপশাসনের অভিযোগ—এই তিনের সমন্বয়ে বিজেপি যে প্রচার চালিয়েছে, তাতে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি ভেঙে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পথ তৈরি হয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোটার মেরুকরণ। এই নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের পছন্দের দল বাছাইয়ে ‘শহর-গ্রামের মধ্যে বড় ধরনের বিভাজন’ শনাক্ত করা গেছে। ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতির কারণে পশ্চিমবঙ্গে জয়ের কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও এই স্পষ্ট মেরুকরণ তাদের জয়ে সহায়তা করেছে। রাজ্যের এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ মুসলিম। কিন্তু বিজেপি নিজেকে কেবল হিন্দু ভোটারদের দল হিসেবে তুলে ধরতে কোনো দ্বিধা করেনি। রাজ্য বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, এই নির্বাচনে ‘হিন্দু ভোটের একটি সংহতি তৈরি হয়েছে।’ একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, অনেক মুসলিমও আগের মতো তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দেননি, বরং বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন। তবে এই দাবি যাচাই করা সম্ভব নয়।

এ ছাড়া ভোটের আগে রাজ্যে ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথাকথিত বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) মাধ্যমে ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণও প্রভাব ফেলেছে। এই প্রক্রিয়ায় বিতর্কিতভাবে প্রায় ৯১ লাখ মানুষ, যা প্রায় ১২ শতাংশকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, ফলে তাঁরা ভোটাধিকার হারান।

তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখকে অনুপস্থিত বা মৃত ঘোষণা করা হয়, বাকি ৩০ লাখ সময়স্বল্পতার কারণে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নিজেদের মামলা উপস্থাপন করতে না পারায় ভোট দিতে পারেননি। মমতার দল অসংগতি তুলে ধরে অভিযোগ করেছে, নির্বাচন কমিশন বিজেপির পক্ষ নিচ্ছে। রাজনৈতিক অধিকারকর্মী ও পর্যবেক্ষকেরাও মনে করেন, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিমরা অসমভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু উচ্চ আদালত ক্ষতিগ্রস্ত লাখো মানুষের ভোটাধিকার পুনর্বহাল করেননি, বরং নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত ভোটারদের তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দেন।

ফলে লাখো মানুষের মধ্যে পরিচয়হীনতার যে শঙ্কা তৈরি হয়, তা কখনোই ভোটের রাজনীতিকে আর স্বাভাবিক রাখে না। এই সংশোধন পশ্চিমবঙ্গে যে মাত্রার মেরুকরণ তৈরি করেছে, তা বাইরে থেকে পুরোপুরি বোঝা যাবে না।

নির্বাচনের সময় বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গে ২ হাজার ৪০০ কোম্পানি আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করে। প্রাদেশিক নির্বাচনের ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, রাজনৈতিক সহিংসতা ছাড়া নির্বাচন পরিচালনার জন্যই এই ব্যবস্থা। কিন্তু তৃণমূলসহ বিরোধীদের দাবি, এই বাহিনী ভোটারদের ভয় দেখাতে বা প্রভাবিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, তৃণমূল ভোটারদের সামনে নতুন কিছু তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তীব্র সরকারবিরোধী মনোভাব মোকাবিলা করতে পারেনি। তৃণমূলের দলীয় কাঠামো এমন হয়ে উঠেছিল, যা ভিন্নমতের মানুষের জন্য প্রতিকূল ছিল। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও আকাঙ্ক্ষার ক্রমবর্ধমান চাপ তারা বুঝতে পারেনি। এ ছাড়া, এই পরাজয় মমতার জাতীয় পর্যায়ে নরেন্দ্র মোদির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনাকেও দুর্বল করে দিয়েছে।

তবে এর প্রভাব শুধু মমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিজেপির এই জয় এবং টিএমসির বড় পরাজয় মোদিবিরোধী অন্য দলগুলোর রাজনৈতিক পুঁজি কমিয়ে দেবে। মাত্র দুই বছর আগেও চিত্র ভিন্ন ছিল। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে মোদির দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, ফলে জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। কিন্তু সোমবারের এই জয়গুলো সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

এই জয় বিজেপির জন্য গভীর প্রতীকী গুরুত্বও বহন করে। ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ (বিজেপির পূর্বসূরি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গেরই সন্তান শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। শ্যামাপ্রসাদ যে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শিক রাজনীতির বীজ বপন করেছিলেন, তা পশ্চিমবঙ্গে প্রস্ফুটিত হওয়ার মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপির অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ভারত শাসনে বিজেপির প্রভাবকে আরও বিস্তৃত করবে।

লেখক: সাংবাদিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

গাজীপুরে তিন শিশুসন্তান, স্ত্রী ও শ্যালককে হত্যা: ফোনকলে স্বীকারোক্তি দিয়ে পলাতক অভিযুক্ত

মির্জা ফখরুল-ফাতেমাসহ আরও যাঁরা পাচ্ছেন খালেদা জিয়া স্মৃতি স্বর্ণপদক

গাজীপুরে গভীর রাতে একই পরিবারের ৫ সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা

গাজীপুরে ৫ হত্যা: মরদেহগুলোর ওপর ছিল লিখিত অভিযোগ, যা লেখা আছে

আনসার কর্মকর্তার চোখ থেঁতলে দিলেন হকারেরা, আহত আরও ৫

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত