Ajker Patrika

ফাটা বাঁশের চিপায় ইরান

চিররঞ্জন সরকার
অভ্যন্তরীণ আন্দোলনের অজুহাতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ হলে খেসারত দিতে হবে ইরানের জনগণকেই। ছবি: এএফপি
অভ্যন্তরীণ আন্দোলনের অজুহাতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ হলে খেসারত দিতে হবে ইরানের জনগণকেই। ছবি: এএফপি

এমনিতে আমরা তুলনামূলকভাবে গরিব ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। মুসলিম সভ্যতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ইরানের প্রতিও আমাদের অবস্থান বরাবরই সহানুভূতিশীল। ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা যতই স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক হোক না কেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং সম্প্রসারণবাদী ইসরায়েলের অবিরাম হামলা ও ষড়যন্ত্রের বিপরীতে আপসহীন ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে এই রাষ্ট্রটির প্রতি সমর্থনের কখনোই খুব একটা ঘাটতি হয়নি।

ইরানে এর আগেও বহুবার আন্দোলন হয়েছে। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মাহসা আমিনি নামে এক তরুণীর মৃত্যুর পর সংঘটিত আন্দোলনের কথা। সরকারি মানদণ্ড অনুযায়ী, হিজাব না পরার অভিযোগে ইরান সরকারের ধর্মীয় নৈতিকতা পুলিশ গাইডেন্স পেট্রল মাহসা আমিনিকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁকে প্রচণ্ড মারধর করা হয় এবং পুলিশি হেফাজতেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর ঘটনায় ইরানজুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। এই প্রতিবাদ একসময় নারী স্বাধীনতার দাবি ছাড়িয়ে সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার বিরোধিতায় রূপ নেয়। রাজপথে নারীদের প্রকাশ্যে হিজাব খুলে প্রতিবাদ করা ইরানে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নকে কেন্দ্রীয় আলোচনায় এনে দেয়। যদিও রাষ্ট্র কঠোর দমনপীড়ন চালায়, এই আন্দোলন ইরানি সমাজে ভয়ের দেয়াল ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

এবারের আন্দোলনটিকে তারই ধারাবাহিকতা বলা যায়। তবে এবার যেন ইরানের সাধারণ মানুষের পা ফাটা বাঁশের চিপায় আটকে গেছে। তারা পড়েছে দ্বিমুখী এক গভীর সংকটে। একদিকে প্রায় ৪৪ বছর ধরে ঘাড়ের ওপর চেপে বসে থাকা খোমেনির উত্তরাধিকারী শাসনের সীমাহীন দুর্নীতি, নৈতিকতা পুলিশের দৌরাত্ম্য, নারীদের ওপর সামাজিক ও পোশাকগত বিধিনিষেধ, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি এবং লাগামছাড়া জিনিসপত্রের দামে জনজীবনের নাভিশ্বাস। অন্যদিকে এই শাসনব্যবস্থা উৎখাত হলে দীর্ঘ মেয়াদে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের খোপে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা—যা বহু ইরানির কাছেই সমান আতঙ্কের।

তবু এই সব দ্বিধা সত্ত্বেও ইরানের মানুষ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই আজ ইরান জ্বলছে। বিক্ষোভের আগুন রাজধানী তেহরান ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের আন্দোলনে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ইতিহাস বলছে, ইরানে শাসন বদল কখনোই সহজ হয়নি। ১৯২৫ সালে কাজার রাজবংশকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন রেজা শাহ পাহলভি। তাঁকে সরাতে ইরানিদের লেগেছিল প্রায় ৫৫ বছর। সেই পাহলভির পতনের পর যে খোমেনি শাসন কায়েম হলো, তার সূচনালগ্নে ইরানিদের দেখানো হয়েছিল এক ভিন্ন স্বপ্ন—ইসলামি মূল্যবোধে গড়া এমন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের, যেখানে মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচবে। বাস্তবতা সেই স্বপ্নকে নির্মমভাবে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। ফলে চার দশকের বেশি সময় পর আজ সেই খোমেনির উত্তরাধিকারী ব্যবস্থার পতন সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে হচ্ছে।

তবে ইরানের ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো—প্রতিটি অভ্যুত্থানের জন্য মানুষকে প্রায় অর্ধশতাব্দী বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, আর প্রতিবারই পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে তারা পথে নেমেছে। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কখনোই পুরোপুরি ধরা দেয়নি। সামনের দিনে ইরানিদের ভাগ্যে যা-ই থাকুক না কেন, খামেনি শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য যে আরও গভীরভাবে আমেরিকা-ইসরায়েল জোটের প্রভাববলয়ে ঢুকে পড়বে, তা প্রায় নিশ্চিত। এর ফলে রাশিয়া-চীন-উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে যে প্রতিরোধী বলয় রয়েছে, সেটিও কার্যত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। ইরানের মুক্তিকামী মানুষ চলমান লড়াইয়ে জয়ী হলেও প্রকৃত মুক্তি আদৌ মিলবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। নতুন এক সাম্রাজ্যবাদের হাতের পুতুল হওয়ার আশঙ্কা তাদের সামনে হাতছানি দিয়েই দাঁড়িয়ে আছে।

আজ ইরান এমন এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভাঙন, দীর্ঘদিনের শাসন-সংকট এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধ-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক চাপ একে অন্যকে আরও তীব্র করে তুলেছে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে দোকানদারদের ধর্মঘট ও বিক্ষোভ দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা খুব দ্রুতই বাজার বা ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ ছাড়িয়ে একটি সার্বিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়। দ্রুত অবমূল্যায়িত রিয়াল, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থার ফাটল—সব মিলিয়েই এই বিস্ফোরণ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৫ সালের জুনে সংঘটিত ১২ দিনের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের অভিঘাত। যুদ্ধ রাষ্ট্রযন্ত্রকে আরও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক করলেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশা কমাতে পারেনি; বরং নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি আয়ের সংকোচন এবং মুদ্রার আরও অবমূল্যায়নের মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে যে যুদ্ধ সাময়িকভাবে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিয়েছিল, যুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় সেটিই আন্দোলনের জন্য উর্বর জমি তৈরি করেছে।

আন্দোলন তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর ভাষাও ক্রমেই আরও হুমকিমূলক হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের নিরাপত্তা ও বিচারিক কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যেই সতর্কবার্তা দিয়েছে—বিক্ষোভ অব্যাহত থাকলে কঠোরতম শাস্তি, দ্রুত বিচার এবং ‘রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে’ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক দমন করা হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট হিসেবে তুলে ধরার প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে। এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের গুজব ইরানজুড়ে নতুন এক আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ইরানিই আশঙ্কা করছেন, অভ্যন্তরীণ আন্দোলনকে অজুহাত করে যদি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বা সীমিত হামলা হয়, তাহলে তার ভয়াবহ খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। ফলে রাজপথে ক্ষোভ ও সাহস যেমন বাড়ছে, তেমনি ঘরে ঘরে জমছে অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধভীতির চাপ—যা এই আন্দোলনকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এই আন্দোলনের প্রাথমিক চালিকাশক্তি ছিল অর্থনীতি। রিয়ালের মূল্য ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই ‘জীবনের ব্যয় কমাও’ ধরনের স্লোগান রূপ নেয় সরাসরি শাসনবিরোধী দাবিতে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, প্রাদেশিক শহর এমনকি সরকারি ভবনও হয়ে ওঠে ক্ষোভের কেন্দ্র। আন্দোলন ঠেকাতে রাষ্ট্র ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও ব্ল্যাকআউটের পথ বেছে নেয়—যা একদিকে আন্দোলনের সংগঠন দুর্বল করলেও, অন্যদিকে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে।

২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই সংকটে একধরনের দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছেন। শুরুতে সংলাপ, সহানুভূতি ও সীমিত ভর্তুকির প্রতিশ্রুতি থাকলেও আন্দোলন বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতা বেড়েছে। একদিকে সংযমের ভাষা, অন্যদিকে ‘বহিরাগত শত্রুর ষড়যন্ত্র’—এই পরিচিত বয়ান আবারও সামনে এসেছে। বাস্তবতা হলো, এই আন্দোলন মূলত ঘরোয়া সংকটের ফল; কিন্তু আন্তর্জাতিক উত্তেজনা তাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সুযোগসন্ধানী অবস্থান আন্দোলনকারীদের আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা বাড়ালেও, একই সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর দমননীতিকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। ওয়াশিংটন থেকে আসা হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত ইরানের ভেতরে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সামনে এনে দেয়, আর তেহরানও পাল্টা হুমকির ভাষায় আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। এই ভূরাজনৈতিক নাটক আন্দোলনের আসল সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবিগুলোকে আড়াল করে দিচ্ছে।

যদিও প্রশ্ন থেকেই যায়—এই আন্দোলন কি নিকট ভবিষ্যতে শাসনব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে পারবে? বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও আমলাতন্ত্রের বহুস্তর কাঠামো এখনো শক্তভাবেই টিকে আছে; অন্তত এই মুহূর্তে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। স্বল্প মেয়াদে রাষ্ট্র হয়তো দমন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করবে, কিন্তু এর বিনিময়ে রাজনৈতিক বৈধতা আরও ক্ষয় হবে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই জমে থাকা ক্ষোভ দমন দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব নয়।

ইরানের বর্তমান আন্দোলন মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভাঙন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সামাজিক বৈষম্যেরই বহিঃপ্রকাশ; তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকেন্দ্রিক চলমান ভূরাজনৈতিক চাপ একে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ক্রমাগত মুদ্রার মান কমে যাওয়া, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, কাজের সংকট এবং নাগরিক জীবনে রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ মানুষকে এমন এক প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে ক্ষোভ আর ভয় একসঙ্গে জমাট বাঁধছে। এর বিস্ফোরণকে সম্ভবত মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখিয়ে কিংবা গুলি করে মেরে থামানো যাবে না। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার দাবি মানুষের মৌলিক দাবি। কাজ নেই, খাবার কেনার সামর্থ্য নেই, অথচ আছে প্রতিনিয়ত চোখরাঙানি। কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে ক্ষুধা-দারিদ্র্যযুক্ত একটি দেশের মানুষকে বছরের পর বছর ধরে দমনপীড়ন করে আর জাতীয়তাবাদী স্লোগান দিয়ে চুপ করিয়ে রাখা সম্ভব নয়; কোনো না কোনো চেহারায় এই অসন্তোষ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবেই।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

কী শর্তে গাজায় ট্রাম্পের বাহিনীতে যোগ দেবে বাংলাদেশ, জানালেন প্রেস সচিব

এ দেশে আমাদের বহু সুখস্মৃতি, ফিরে আসতে পেরে দারুণ আনন্দিত: নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত

২০১৪ সালের নির্বাচনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখার বন্দোবস্ত হয়

তেহরানের একটি মর্গেই ১৮২ মরদেহ, ভিডিও ভাইরাল

৭ মাসেই বরখাস্ত আলোনসো, রিয়ালের নতুন কোচ হয়েছেন কে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত