Ajker Patrika

প্রবীণেরা আত্মহত্যা কেন করেন

হাসান আলী 
প্রবীণেরা আত্মহত্যা কেন করেন
হাসান আলী

আমাদের সমাজে নীরবে এক ভয়ংকর সংকট বাড়ছে—প্রবীণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন বাড়ে যত্ন, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক প্রবীণ আজ ঠিক তার উল্টো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন—অবহেলা, অপমান, একাকিত্ব ও অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব। এই মানসিক যন্ত্রণাই ধীরে ধীরে ঠেলে দেয় চরম সিদ্ধান্তের দিকে।

প্রবীণেরা আত্মহত্যার জন্য যে পথগুলো বেছে নেন—ফাঁসি দেওয়া, বিষপান, নদীতে ঝাঁপ দেওয়া, উঁচু দালান থেকে লাফিয়ে পড়া, নিজের হাতে-মাথায় বা গায়ে গুলি করা, গায়ে আগুন দেওয়া, প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজেকে আঘাত করা—এই সবই তাঁদের গভীর হতাশা ও অসহায়তার বহিঃপ্রকাশ। এসব মৃত্যু শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, একটি পরিবারের ইতিহাস, স্মৃতি ও মূল্যবোধকেও শেষ করে দেয়।

প্রথম কারণ অবহেলা। সন্তানেরা বড় হয়ে আলাদা সংসার গড়েন, ব্যস্ত হয়ে পড়েন নিজের জীবন নিয়ে। বাবা-মা থেকে যান একাকী। একসময় যাঁরা ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু, আজ তাঁরাই হয়ে যান বাড়তি বোঝা। দ্বিতীয় কারণ অপমান ও লাঞ্ছনা। কথা বলার ভঙ্গিতে, সিদ্ধান্তে অংশ নিতে না দেওয়ায়, কিংবা সামান্য ভুলে তিরস্কারে প্রবীণের আত্মসম্মান ভেঙে যায়। তৃতীয় কারণ অর্থনৈতিক সংকট। ঋণগ্রস্ত হওয়া, পেনশন বা আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পারা—এসব প্রবীণকে অসহায় করে তোলে। চতুর্থ কারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। দীর্ঘমেয়াদি রোগ, ব্যথা, স্মৃতিভ্রংশ, অক্ষমতা—এসব শুধু শরীর নয়, মনকেও ভেঙে দেয়। এই সবকিছুর সমষ্টিতে প্রবীণের মনে জন্ম নেয় একটি ভয়াবহ ভাবনা—‘আমাকে আর কারও দরকার নেই।’

প্রতিরোধে করণীয় কী?

১. পরিবারকে দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রবীণদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় পরিবার। নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, কথা বলা, সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া—এই ছোট ছোট বিষয়ই জীবনের বড় অর্থ তৈরি করে। একটি স্নেহের কথা, একটি আলিঙ্গন অনেক সময় ওষুধের থেকেও বেশি কাজ করে।

২. আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ভাতা, পেনশন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সহজলভ্য ও স্বচ্ছ করতে হবে। পরিবারকেও নিশ্চিত করতে হবে যে প্রবীণ চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের জন্য অর্থ নিয়ে চিন্তিত না থাকেন।

৩. মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে হবে। প্রবীণদের জন্য আলাদা কাউন্সেলিং, হেল্পলাইন ও মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকা জরুরি। বিষণ্নতা বা আত্মহত্যার চিন্তা কোনো লজ্জার বিষয় নয়—এটা চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা।

৪. সমাজভিত্তিক সহায়তা গড়ে তুলতে হবে। মসজিদ, মন্দির, কমিউনিটি সেন্টার ও স্থানীয় সংগঠনগুলো প্রবীণদের নিয়ে নিয়মিত আড্ডা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করতে পারে। সামাজিক সংযোগ আত্মহত্যার ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়।

৫. আইন ও নীতির কার্যকর প্রয়োগ করতে হবে। প্রবীণদের অবহেলা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। পরিবারে নির্যাতন হলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৬. প্রবীণদের অর্থবহ কাজে যুক্ত করতে হবে। তাঁদের অভিজ্ঞতা সমাজের সম্পদ। স্বেচ্ছাসেবা, গল্প বলা, শিক্ষা দেওয়া, ধর্মীয় বা সামাজিক কাজে যুক্ত থাকলে জীবনের অর্থ ফিরে আসে।

প্রবীণদের আত্মহত্যা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের সমাজের ব্যর্থতার প্রতিফলন। আমরা যদি সময়মতো তাঁদের পাশে দাঁড়াই, ভালোবাসা ও মর্যাদা দিই, তাহলে অনেক অমূল্য জীবন রক্ষা করা সম্ভব। একজন প্রবীণ বাঁচলে শুধু একজন মানুষ নয়, একটি প্রজন্ম বাঁচে। আসুন, আমরা সেই প্রজন্মকে বাঁচাতে দায়বদ্ধ হই।

হাসান আলী, প্রবীণবিষয়ক সংগঠক ও লেখক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এবার ইরান ছুড়ছে ১ টনের মিসাইল, বদলে গেল যুদ্ধক্ষেত্র

জুলাই সনদ আদেশ ম্যাসকুলিন না ফেমিনিন জেন্ডার, আমি জানি না: সালাহউদ্দিন

তদবিরের জন্য ‎কর্মস্থল ছেড়ে মন্ত্রণালয়ে না যেতে আইজিপির নির্দেশ

ভিকারুননিসার ছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা, প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলে এনসিপি-বিএনপি নেতা-কর্মীদের হাতাহাতি

অস্ট্রেলিয়ার হোটেল থেকে পালান ৫ ইরানি নারী ফুটবলার, ফেঁসে যান একজন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত