
প্রচলিত একটি কথা আছে, পৃথিবীর বুকে কৃষির প্রথম বীজটি বপন হয়েছিল কোনো এক নারীর সুনিপুণ হাতে। সভ্যতার উন্মেষকাল থেকে আজ অবধি কৃষির সঙ্গে নারীর এই নাড়ির টান একটুও ছিন্ন হয়নি, বরং কালের পরিক্রমায় তা পেয়েছে নতুন মাত্রা। সময় পাল্টেছে, সেই সঙ্গে পাল্টেছে মানুষের জীবনযাপন প্রণালি। একসময় এই বদ্বীপে কৃষি বলতে কেবল ধান, পাট বা অন্য শস্যজাতীয় ফসল উৎপাদনকেই বোঝানো হতো। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সেই ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। শস্যজাতীয় ফসলের পাশাপাশি হাঁস, মুরগি, মাছ, কোয়েল, গরু, মহিষ ইত্যাদি লালনপালন এখন কৃষির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
গত শতাব্দীর আশির দশক থেকে বাংলাদেশের কৃষি সম্প্রসারণে অভাবনীয় এক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এই পরিবর্তনে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে বহু গুণ। বলা যায়, আজকের বাংলাদেশে কৃষিতে যে বৈপ্লবিক সাফল্য এসেছে, তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে দেশের লাখো নারীর ঘাম, মেধা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের পোলট্রি বা পোলট্রিশিল্পে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় একটি চালিকাশক্তি। এই বিশাল শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়োজিত রয়েছে ৬০ লাখের বেশি মানুষ। সবচেয়ে বিস্ময়কর ও আশাব্যঞ্জক তথ্য হলো, এই বিপুলসংখ্যক কর্মীর ৪০ ভাগই নারী। তাঁরা কেবল শ্রমিক হিসেবেই কাজ করছেন না, বরং অনেকেই নিজ উদ্যোগে খামার গড়ে তুলেছেন। দেশের অর্থনীতির এই বিশাল চাকাকে যাঁরা নিজ হাতে ঘোরাচ্ছেন, তাঁদেরই একজন শরীয়তপুরের চরমধ্যপাড়া গ্রামের অদম্য নারী ফাতেমা বেগম।
সফল মানুষের পথ কখনো মসৃণ হয় না। ফাতেমা বেগমের গল্পটিও এর ব্যতিক্রম নয়। সালটা ২০০৭। ফাতেমার স্বামী তারিকুল ইসলাম একটি মুরগির খামার চালাতেন। কিন্তু ক্রমাগত লোকসানের মুখে একপর্যায়ে খামারটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। ঋণের বোঝা আর হতাশা যখন পুরো পরিবারকে গ্রাস করছিল, ঠিক তখনই সংসারের হাল ধরার সিদ্ধান্ত নেন ফাতেমা। যে পরম মমতার হাতে তিনি সংসার আগলে রেখেছিলেন, সেই হাতেই তুলে নেন লোকসানে নিমজ্জিত খামারটি পরিচালনার দায়িত্ব।
স্বামী তারিকুল ইসলামের বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই পুরোনো খামারকে ঘিরেই নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। মাত্র ৫০০ মুরগি নিয়ে ফাতেমার যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তাঁর দরদ, যত্ন আর নিরলস পরিশ্রমে সেখানে আর কখনোই লোকসানের কালো মেঘ জমতে পারেনি।
ফাতেমা বেগমের অদম্য চেষ্টা আর সঠিক পরিকল্পনার ফলস্বরূপ আজ তাঁর সেই ছোট্ট উদ্যোগটি বিশাল আকার ধারণ করেছে। মাত্র ৫০০ মুরগি থেকে শুরু হওয়া খামারে এখন মুরগির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজারে। সময়ের ব্যবধানে একটি খামার থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন নয়টি মুরগির খামার। ফাতেমা বেগমের বসতবাড়িসংলগ্ন এলাকাতেই গড়ে উঠেছে তিনতলাবিশিষ্ট এই আধুনিক মুরগির খামার। শুধু এখানেই থেমে থাকেননি তিনি; চরমধ্যপাড়া গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় নিজের উপার্জিত অর্থে জমি কিনে তিনি তাঁর এই খামারের সম্প্রসারণ করেছেন। শূন্য থেকে শুরু করে আজ তিনি কোটি টাকার পোলট্রি সাম্রাজ্যের এক সফলনারী উদ্যোক্তা।
যেকোনো সফল মানুষের অগ্রগতির পেছনে থাকে সুসম্পর্কের রসায়ন। ফাতেমা বেগমের এই আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনেও রয়েছে তাঁর স্বামীর সঙ্গে চমৎকার মানসিক বোঝাপড়া। স্বামী তারিকুল ইসলাম অকপটে স্বীকার করেন যে তাঁর জীবনে এবং সংসারে এক উজ্জ্বল আলো হয়ে এসেছেন ফাতেমা। যেখানে তিনি ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেখানে ফাতেমার অদম্য চেষ্টা আর সুপরিকল্পনার যৌথ সম্মিলন সেই ব্যর্থতার অন্ধকারকে চিরতরে দূর করেছে।
এই দম্পতির পারস্পরিক বোঝাপড়া তাঁদের আর্থিক উদ্যোগটির সম্প্রসারণকে প্রতিদিন আরও গতিশীল করছে। ফাতেমা কেবল একজন সফল খামারিই নন, তিনি একজন আদর্শ গৃহিণী এবং দায়িত্বশীল কন্যাও। একদিকে তিনি যেমন নিজের সংসার ও বিশাল খামার সামলাচ্ছেন, তেমনি সন্তান হিসেবে পরম যত্নে দায়িত্ব পালন করছেন নিজের বৃদ্ধ বাবা-মায়েরও। নারীর ক্ষমতায়নের এর চেয়ে সুন্দর ও বাস্তব উদাহরণ আর কী হতে পারে!
গত শতাব্দীর আশির দশক থেকে বিকাশমান পোলট্রিশিল্প বর্তমানে গভীর এক সংকটের সময় অতিক্রম করছে। মুরগির খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ওষুধের চড়া মূল্য, পরিবহন খরচ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার অস্থিতিশীলতা তৃণমূল পর্যায়ের খামারিদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাতেমা বেগমও এর বাইরে নন। একজন প্রান্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি প্রতিনিয়ত এই বিষয়গুলো মোকাবিলা করছেন। কিন্তু তাঁর কাছে সংকট মানেই থেমে যাওয়া নয়, বরং নতুন করে লড়াই করার কৌশল শেখা। ফাতেমার মতো তৃণমূলের উদ্যোক্তারা প্রমাণ করেছেন যে ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো বৈরী পরিস্থিতিকেই জয় করা সম্ভব।
প্রত্যন্ত গ্রামের এক নারী আপন শক্তিতে পুরো এলাকায় নতুন অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল তৈরি করেছেন। শুধু নিজেই সফল হননি, এলাকার অনেককেই জুগিয়েছেন অনুপ্রেরণা। সংসারের সচ্ছলতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। এখানেই থামতে চান না ফাতেমা বেগম, লক্ষ্য আরও বহুদূর যাওয়ার।
প্রিয় পাঠক, ফাতেমা বেগমের মতো এমন হাজারো উদ্যোগী নারীর হাতেই আজ নীরবে রচিত হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির এক অনন্য ভিত। সদিচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম আর সুপরিকল্পনা মানুষকে যে সাফল্যের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে পারে, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গড়েছেন শরীয়তপুরের এই উদ্যোক্তা।
আমাদের দেশের একটি বড় সমস্যা হলো বেকারত্ব। উচ্চশিক্ষা শেষ করে তরুণসমাজ যখন চাকরির পেছনে ছুটে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে, তখন ফাতেমার গল্পটি তাদের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে। আধুনিক কৃষি ও পোলট্রিশিল্প এখনো দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত। অন্ধের মতো চাকরির পেছনে না ছুটে, সঠিক পরিকল্পনা ও বুঝেশুনে কৃষিতে বিনিয়োগ হতে পারে বেকারত্ব ঘোচানোর দারুণ এক উপায়।
তবে এই খাতের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। কৃষি প্রশিক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, বাজার সম্প্রসারণ এবং কৃষিশিল্পের বিকাশে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ আমাদের কৃষি অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে পারে। আমাদের প্রত্যাশা, যথাযথ কর্তৃপক্ষ তৃণমূল পর্যায়ের এই বিষয়গুলো গভীরভাবে আমলে নেবে। তরুণদের পেশাগত দক্ষতা অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখার পাশাপাশি, ফাতেমা বেগমের মতো উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দিতে পারলে কৃষির হাত ধরেই গড়ে উঠবে আগামীর এক সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ।
লেখক: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই

দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। প্রতিটি সংসদীয় আসনে ছেলে ও মেয়েদের জন্য একটি করে আবাসিক সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ গড়ে তোলা হবে।
৩ ঘণ্টা আগে
ব্রিটিশ আমলে ১৮৭০ সালে দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখনো শহরের ভেতরে অনেক লাল বিল্ডিং চোখে পড়ে। একসময় এই উপজেলা শহরে হাজার হাজার মানুষ রেল কারখানায় কাজ করত। তবে কারখানাটির এখন আর সেই জৌলুশ নেই।
৩ ঘণ্টা আগে
পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে মা-বাবা-সন্তানের সম্পর্ক। একসময় মা-বাবার অকারণ অপত্যস্নেহ দেখে সমালোচনা করত মানুষ। এখন মা-বাবা অবলীলায় সন্তানকে হত্যা করতে পারেন, লাশ লুকিয়েফেলে দিতে পারেন কোথাও এবং দোষ চাপাতে পারেন মেয়ের স্বামীর ওপর। ৮ জুলাই রাতে খুলনা শহরতলির প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় নির্জনা নামের...
১ দিন আগে
ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি বাজার অনেক আগেই পৃথিবীর অসংখ্য শহর যেন দুই রঙে ভাগ হয়ে যায়। একই মহল্লার একই ভবনের ছাদে উড়তে থাকে দুই দেশের পতাকা। একই পরিবারের রাতের খাবারের টেবিলেও শুরু হয় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তর্ক। বাংলাদেশের অলিগলি থেকে শুরু করে ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া.....
১ দিন আগে