Ajker Patrika

শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান: সংকটের শিকড় কোথায়

ড. মো. শফিকুল ইসলাম
শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান: সংকটের শিকড় কোথায়
প্রতীকী ছবি

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে না পারা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এর প্রতিক্রিয়ায় সরকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে এবং সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া না গেলে এমপিও ও সরকারি স্বীকৃতি বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বিবেচনার মধ্যে রাখা হয়েছে। জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য এমন উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, শূন্য পাসের সমস্যাকে কি কেবল প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলেই সমাধান হবে, নাকি এর পেছনে থাকা বৃহত্তর কাঠামোগত সংকটও বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে?

পরিসংখ্যানটি গভীরভাবে দেখলে সমস্যার বহুমাত্রিক চরিত্র স্পষ্ট হয়। শূন্য পাস করা ৩১২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২৬টি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন, ৫৭টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এবং ২৯টি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন। অর্থাৎ এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, জনমিতিক পরিবর্তন, শিক্ষক বণ্টন, শিক্ষার্থী ধরে রাখা এবং শিক্ষার মান—সবকিছুর সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেই পরীক্ষার্থীর সংখ্যা খুব কম। অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ জনেরও কম শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, শতাধিক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র পাঁচ থেকে সাতজন। এমনকি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র একজন পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, যে এলাকায় একটি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থীই পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা কতটুকু? এটি কি শুধু বিদ্যালয়ের দুর্বলতা, নাকি এলাকার জনসংখ্যার পরিবর্তন, শিক্ষার্থী অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়া, ঝরে পড়া, দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, কর্মসংস্থানের জন্য স্থানান্তর কিংবা বিদ্যালয়ের প্রতি অভিভাবকদের আস্থাহীনতার ফল, তা আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

শিক্ষকের সংখ্যা ও ফলাফলের অসামঞ্জস্যও বড় উদ্বেগের বিষয়। নাঙ্গলকোটের একটি মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় ১৫ জন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও ১০ পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করেনি; এখানে স্বাভাবিকভাবেই সরকারি অর্থের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু শুধু শিক্ষকসংখ্যা দেখেও সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। দেখতে হবে শিক্ষকেরা বিষয়ভিত্তিক কি না, অনুমোদিত পদে কর্মরত কি না, নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন, প্রতিষ্ঠানপ্রধানের একাডেমিক যোগ্যতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি কতটা কার্যকর এবং স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি কতটা হচ্ছে, সেসব বিষয় নিয়ে ভাবনা জরুরি।

এ কারণেই সরকারের প্রস্তাবিত ব্যবস্থা হওয়া উচিত ছিল ‘শাস্তি আগে নয়, আগে সমস্যা চিহ্নিত করা জরুরি’—এ নীতির ওপর ভিত্তি করে। শিক্ষা প্রশাসন ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীসংখ্যা, শিক্ষকসংখ্যা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, পাঠদান, উপস্থিতি, অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা এবং আগের বছরের ফলাফল পর্যালোচনার কথা বলেছে। এটিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া দরকার। প্রতিটি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি একাডেমিক ডায়াগনস্টিক অডিট চালু করা যেতে পারে। সেখানে তিন ধরনের সমস্যা আলাদা করা প্রয়োজন। যেমন প্রথমত, ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা; দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও একাডেমিক মানের সংকট; তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীস্বল্পতা ও স্থানীয় সামাজিক-জনমিতিক বাস্তবতা।

যেসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর খারাপ ফল হচ্ছে, সেখানে অবশ্যই কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার। প্রতিষ্ঠানপ্রধানের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের পাঠদান পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক ক্লাস এবং নির্দিষ্ট সময়ের ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

মাদ্রাসার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব প্রয়োজন। কারণ, শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের বড় অংশই এই ধারার। তাই শুধু প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শোকজ নয়, অঞ্চলভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে—বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ধারাবাহিক দুর্বলতা আছে কি না? থাকলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং এবং ক্লাস্টারভিত্তিক একাডেমিক সহায়তা চালু করা যেতে পারে। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এবার ২৯টি প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা প্রয়োজন, বিশেষ করে আগের বছর যেখানে কোনো ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান শূন্য পাসের তালিকায় ছিল না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হলো, কম শিক্ষার্থী থাকা সব প্রতিষ্ঠান কি অপরিবর্তিতভাবে চালিয়ে যাওয়া যৌক্তিক? একই এলাকায় যদি একাধিক দুর্বল ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠান থাকে, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ, নিকটবর্তী ভালো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাডেমিক সংযুক্তি অথবা শিক্ষার্থী পরিবহন সহায়তার মতো বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় কমার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো শিক্ষক ও পরিবেশ পেতে পারে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার আগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার, বিশেষ করে মেয়েদের বিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকার ও নিরাপদ যাতায়াতের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে, পরীক্ষার ফল একটি সংকেত, কিন্তু পুরো রোগের পরিচয় নয়। শূন্য পাস অবশ্যই ব্যর্থতা, কিন্তু সেই ব্যর্থতার পেছনে কারণ এক নয়। শিক্ষাবিদরাও তাই একই ধরনের শাস্তির পরিবর্তে সমস্যার ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং ৩১২টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে গবেষণা করে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষক সংকট ও গ্রাম-শহরের শিক্ষাবৈষম্য কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এখন প্রয়োজন জবাবদিহি ও সহায়তার সমন্বিত মডেল। যাদের অবহেলা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা বা দায়িত্বহীনতার কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কিন্তু যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান সমস্যা শিক্ষক সংকট, দারিদ্র্য, শিক্ষার্থীস্বল্পতা, দুর্বল অবকাঠামো কিংবা দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অবহেলা, সেখানে কেবল শাস্তি দিয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে না। সে সবের ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজন হলো, আর্থিক সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, পুনর্গঠন ও নিবিড় তদারকি।

৩১২টি প্রতিষ্ঠানের শূন্য পাস তাই শুধু একটি খারাপ পরীক্ষার ফল নয়; এটি আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার কোথায় কোথায় গভীর দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, তার একটি সতর্ক সংকেত। এই সংকেতকে যদি শুধুই এমপিও বাতিলের প্রশাসনিক ঘটনায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে মূল সমস্যার সমাধান হবে না। আর যদি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতাকে তথ্যভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করে সংশোধন, পুনর্গঠন ও জবাবদিহির সুযোগে রূপান্তর করা যায়, তাহলেই এই উদ্বেগজনক ফল বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের একটি কার্যকর সূচনা হতে পারে।

ড. মো. শফিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত