Ajker Patrika

বিসিএসের গোলকধাঁধা

সম্পাদকীয়
বিসিএসের গোলকধাঁধা

প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি রাজধানীর একটি সেমিনারে বিসিএস পরীক্ষাকে একটি ‘অসুখ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভঙ্গুর দশা এবং কর্মসংস্থান পরিস্থিতির বাস্তব দিক ফুটে উঠেছে। প্রশ্ন হলো, যে বয়সে একজন শিক্ষার্থীর উদ্ভাবক, সৃজনশীল মানুষ এবং গবেষক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকার কথা, সেই বয়সে তাঁদের কেন বছরের পর বছর লাইব্রেরির মধ্যে বসে বসে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সময় কাটাতে হচ্ছে? কেন বিসিএস পরীক্ষাকে সোনার হরিণে পরিণত করা হলো? এ দায় কার?

বিসিএস পরীক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের এই অস্বাভাবিক ঝোঁক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বেসরকারি খাতে চাকরির অনিশ্চয়তা এবং সুযোগ-সুবিধার অভাবের বিপরীতে বিসিএস ক্যাডার হওয়া মানেই আজীবন চাকরির নিশ্চয়তা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্ব, যেখানে একজন বিসিএস ক্যাডারকে সমাজের মানুষ অন্য চোখে দেখে থাকে। প্রশাসন, কর ও পুলিশ ক্যাডারে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বেশি। এ জন্য তরুণেরা এসব ক্যাডারের প্রতি বেশি আকর্ষিত হচ্ছেন।

একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই পাঠ্যবই সরিয়ে রেখে যখন বিসিএস ডাইজেস্ট মুখস্থ করতে শুরু করেন, তখন বুঝতে হবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা তাঁদের মূল বিষয়ের ওপর দখল হারাচ্ছেন।

তরুণ প্রজন্মকে এই অসুখ থেকে বের করে আনতে হলে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে। প্রথমত, চাকরির বিভিন্ন সেক্টরে যে বৈষম্য আছে, সেটা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরির মতো বেসরকারি ক্ষেত্রেও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আর সরকারি-বেসরকারি চাকরির জন্য সামাজিক মূল্যায়নের বিষয়টা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।

সবচেয়ে জরুরি—বেকার সমস্যার সমাধান করতে হবে। বিসিএসের ঘোড়দৌড় থেকে তরুণদের বের করে আনতে হলে কর্মসংস্থানের ব্যাপক ক্ষেত্র তৈরির পাশাপাশি বেতনকাঠামোর আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। বিসিএস ক্যাডারদের জন্য বিশেষ সুবিধাসমূহ পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যাতে এটি আর দশটি পেশার মতোই একটি স্বাভাবিক পেশা হিসেবে গণ্য হয়।

কেবল সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইবা পরীক্ষা দিয়ে মেধা যাচাই না করে, কারিগরি ও বিশেষায়িত ক্যাডারদের ক্ষেত্রে মূল বিষয়ের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস যুগোপযোগী এবং পাঠদান পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে সৃজনশীল করতে হবে। বিসিএস পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করতে হবে। আর পরীক্ষা পদ্ধতিতে এমন সংস্কার আনতে হবে, যাতে করে একজন প্রার্থী দ্রুত নিজের অবস্থান বুঝতে পারেন।

বিসিএস কোনো জীবনযুদ্ধের শেষ গন্তব্য হতে পারে না। একটি জাতির সব মেধা যখন চাকরির পেছনে ছোটে, তখন গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কারা নেতৃত্ব দেবেন? এই প্রশ্ন তোলা জরুরি। কারণ, বিসিএস পরীক্ষা সত্যিই এক অসুখে পরিণত হয়েছে। আর এই অসুখের চিকিৎসা রাষ্ট্রকেই করতে হবে।

তারুণ্যের শক্তিকে বিসিএস পরীক্ষার গোলকধাঁধা থেকে বের করে আনা জরুরি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত