Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

সরকারের কাজ ফুটবল মাঠের রেফারির ভূমিকার মতো: ড. রুশাদ ফরিদী

সরকারের কাজ ফুটবল মাঠের রেফারির ভূমিকার মতো: ড. রুশাদ ফরিদী

ড. রুশাদ ফরিদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তিনি ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’-এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। জাতীয় বাজেটে প্রত্যাশা এবং বিভিন্ন খাতে যথার্থ অর্থ বরাদ্দ ও তা যথাযথভাবে ব্যয় না হওয়ার কারণ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।

আপডেট : ১৭ মে ২০২৬, ০৮: ২৬

একটি দেশের জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা কোনো বছরই বাজেটে প্রতিফলিত হয় না। এর কারণ কী?

একটা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে শাসকদের সুশাসন করার ইচ্ছাটা জড়িত। যখন রাষ্ট্রীয় দর্শনের সঙ্গে সুশাসন না থাকে আর দুর্নীতি ও লুটপাট করার উদ্দেশ্য বেশি থাকে, তখন দর্শনটা মুখ্য হয়ে ওঠে না। জাতীয় বাজেটের মধ্যে সেই দর্শনের প্রতিফলন না হওয়াটা একটা বড় কারণ। আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠীর বড় অংশকেই দেখে আসছি এটা করতে। আওয়ামী লীগের শাসনামলের আগে থেকে সেটা হয়ে আসছে। যদিও আওয়ামী লীগের আমলে সেটা বেশি হয়েছে। কিন্তু সব সময় আমরা দেখে আসছি, দুর্নীতি একটা বড় অংশ হিসেবে বিরাজমান ছিল। বাজেটের বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের টাকা বরাদ্দ থাকে, কিন্তু তার বড় অংশই দুর্নীতির মাধ্যমে লোপাট করা হয়। সেটা আমরা সবাই কম-বেশি জানি। আর শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচণ্ড সুশাসনের অভাব থাকার কারণে ব্যাপক দুর্নীতি হয়ে থাকে।

আমাদের দেশে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হয় না কেন?

এ সমস্যাটা মূলত শাসকগোষ্ঠীর কোনো একটা দল ক্ষমতায় গেলে তারা জনগণের কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করে না। ভোটের আগে তাদের একটা দায় থাকে। নির্বাচনের পরে সেই দায়বোধের সংস্কৃতি আর থাকে না। আমরা সেটা গত নির্বাচনের সময়ও দেখলাম। নির্বাচনের সময় তাদের একরকম কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের কথার ধরন পাল্টে গেছে। আমার ধারণা হলো, জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকার অভ্যাস আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেক দিক থেকেই নেই। এটা নতুন কিছু নয়। বাজেটের ক্ষেত্রেও একই বিষয় কাজ করে থাকে। রাজনীতির নষ্ট সংস্কৃতির কারণেই এই রিফ্লেকশনটা (প্রতিক্রিয়া) আমরা বাজেটের মধ্যে দেখতে পাই।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এখন পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। মূল্যস্ফীতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় এবারের বাজেট কেমন হবে বলে মনে করছেন?

আমরা শুনতে পাচ্ছি, এবারের বাজেট ইতিহাস গড়বে। কারণ, তা বিগত সময়ের রেকর্ড ব্রেক করবে। এবারের বাজেট হবে ৯ লাখ কোটি টাকার মতো। কাগজে-কলমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বেশি করে ফোকাস দেওয়া দরকার। কিন্তু বড় সমস্যা হলো বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে। খরচ কোথায় ও কীভাবে হচ্ছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। আর এবারের বাজেটের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, দেশীয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা টালমাটাল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলমান। এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে, কি হবে না—সেটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। ফলে জ্বালানি সংকট এখন স্তিমিত থাকলেও সেটা যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো দিকে যেতে পারে। আর মূল্যস্ফীতিও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। শেখ হাসিনার আমল থেকে বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় থেকে সেটা শুরু হয়েছিল। সেটা শেখ হাসিনা সরকার কোনোভাবেই ম্যানেজ করতে পারেনি। সেটার আরেকটা বড় কারণ হলো, সে সময় দেশের অর্থনীতিতে একটা বড় ধরনের লুটপাট হয়েছিল। এরপর ব্যাংক লুটপাট করে খালি করা হয়েছিল। ফলে অর্থনীতির বেসিক প্রিন্সিপলগুলো (মূল সূত্র) ম্যানেজমেন্টের আওতায় আনতে আওয়ামী লীগ সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। এবং মূল্যস্ফীতি একসময় ১৪-১৫ শতাংশের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। সেটা গত ১৪-১৫ বছরের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ ছিল। এখন তা কমে ৯ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে।

প্রতিবছর বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। অর্থনীতির চরম এ দুরবস্থার মধ্যে আমরা কীভাবে ঋণনির্ভরতা থেকে বের হতে পারি?

ঋণ বাংলাদেশের জন্য বড় কোনো সমস্যা না। যদি করের সঙ্গে ঋণের তুলনা করা যায়, তাহলে সেটা ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি না। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সরকারও বাজেটের পর ঋণ নিয়ে থাকে। কিন্তু ঋণের পার্সেন্টেজটা কত, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশের জন্য ঋণ কোনো থ্রেট না। কিন্তু থ্রেটটা বাড়ছে এ কারণে যে গত আওয়ামী লীগ সরকার কতগুলো মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল। রূপপুরের স্টলমেন্ট ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তারপর পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পাওয়ার প্ল্যান্ট—সবকিছু মিলিয়ে পেমেন্টের বিষয়গুলো আওয়ামী লীগের দুর্নীতির কারণে ঋণের থ্রেট ধীরে ধীরে আমাদের অর্থনীতিতে পড়া শুরু করেছে। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সেটাকে ম্যানেজ করে বাজেট বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকার কীভাবে অগ্রসর হবে, এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

জাতীয় বাজেটে, বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি খাতে জিডিপির কত শতাংশ বরাদ্দ দিলে সেটা জনবান্ধব হতে পারে?

এখন পর্যন্ত এসব খাতে ১-২ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। সেটা তো ন্যূনতম ৫ শতাংশ হওয়া দরকার। যদিও প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা খাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন। সেটা আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক ব্যাপার। কত শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোন খাতে কীভাবে ব্যয় করা হবে। সেটার বড় অংশ যদি দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় করা হয়, সেটা ১০ শতাংশ বরাদ্দ করেও তো লাভ হবে না।

প্রতিবছর বাজেটের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে তার প্রভাব ব্যাপক মাত্রায় পড়ে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। জনগণের প্রত্যাশা বাজেটে প্রতিফলিত না হওয়ার কারণ কী?

জিনিসপত্রের যে দাম বাড়ে, সেটা সব সময় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ভুল ধারণা যে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায়, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে থাকেন। আর সরকার যদি বাজারে র‍্যাব, পুলিশ পাঠিয়ে এবং মোবাইল কোর্ট বসিয়ে ব্যবসায়ীদের জেল-জরিমানা করে, তাহলে বাজারে জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে—আমার কাছে এটা সম্পূর্ণভাবে ভুল ধারণা মনে হয়।

বিশ্বের অনেক দেশে জিনিসপত্রের দাম এখন বাড়তি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধসহ নানা কারণে অধিকাংশ জিনিসের দাম বাড়তি। এসব ক্ষেত্রে আমাদের মিডিয়াগুলোরও একটা বড় ভূমিকা আছে। কিছু কিছু অর্থনীতিবিদও আছেন, যাঁরা কোনো কিছুর দাম বাড়লে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কথা বলেন।

যদি গবেষণা করে দেখা যায়, কোনো জিনিসের দাম বাড়ে কতগুলো বেসিক কারণে। হয় চাহিদা বেড়ে গেছে, নতুবা সরবরাহ কমে গেছে। আমাদের বিভাগের প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা এ বিষয়টা ভালোভাবে বোঝেন এবং তাঁরাও ব্যাখ্যা করতে পারবেন। কিন্তু আমি অবাক হয়ে দেখি যে বড় বড় অর্থনীতিবিদ এবং বড় বড় মিডিয়া যেকোনো জিনিসের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচার করে থাকে যে সিন্ডিকেটের কারণে দাম বেড়ে গেছে এবং ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে সেটা হয়েছে। বিষয়টা আসলে সে রকম নয়।

কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী যে নেই, তা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু আগে তো সেটা প্রমাণ করতে হবে। এটা তো বড় ধরনের একটা অপরাধ। সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো একটা ক্রিমিনাল অফেন্স। সেটা তো আগে তদন্ত করে প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা কখনো করা হয় না।

প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা করা স্বাভাবিক যে বাজেটের পরেও জিনিসপত্রের দাম নাগালের মধ্যে থাকবে। জিনিসপত্রের দাম নাগালের মধ্যে রাখাটা কিন্তু সরকারের হাতে সব সময় থাকে না। দাম যখন বেড়ে যায়, তখন সরকার তদন্ত করতে পারে যে ব্যবসায়ীরা বেশি দাম বাড়িয়েছেন কি না। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, ৯৯ শতাংশ ঘটনার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা সেটা করতে পারেন না।

কখন দাম বেড়ে যায়? ধরুন, ভারত পেঁয়াজের রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। তখন তো কোনো দেশের সাধ্য নেই এটার দাম কমাতে পারে। সরকার তখন বিকল্প জায়গা থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করতে পারে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভিয়েতনাম বা চীন থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে পারে। অতিরিক্ত সরবরাহ থাকলে এমনিতেই জিনিসপত্রের দাম কমে যায়। কিন্তু সেটা না করে মিডিয়া শুধু বলতে থাকে—সিন্ডিকেট, সিন্ডিকেট। সে ক্ষেত্রে তো সরকারের দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়। সে কারণে সরকারও মিডিয়ার সঙ্গে সহমত পোষণ করে নিজের দায় সহজে এড়িয়ে যেতে পারে।

আপনি মিডিয়া বা কিছু বিশেষজ্ঞের কথা বললেন। কিন্তু রাষ্ট্রের কি কোনোই দায় নেই?

অবশ্যই আছে। কিন্তু রাষ্ট্র বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব পালন করে না।

সিন্ডিকেট যে সক্রিয় আছে, সেটা কি অস্বীকার করতে পারবেন?

কোন কোন পণ্যে এবং জিনিসপত্রে সিন্ডিকেট দাম বাড়িয়েছে, তার কি কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবেন? তবে আমি এটাও দাবি করি না যে, সব ব্যবসায়ীই সৎ। ব্যবসাও একটা পেশা। সুযোগ পেলে অনেকে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চায়। শুধু ব্যবসার ক্ষেত্রে নয়। সব পেশার ক্ষেত্রে কথাটি প্রযোজ্য। সাংবাদিক, শিক্ষকসহ সব পেশায় এ ধরনের লোক আছেন। বাংলাদেশের মোটামুটি গড়ে সব পেশায় দুর্নীতিবাজ ও নীতিহীন লোক দেখে আসছি। শুধু ব্যবসায়ীদের কথা কেন বলা হয়? তবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে চলছে কি না, তাতে নজর দেওয়া। সরকারের কাজ ফুটবল খেলার মাঠে রেফারির ভূমিকার মতো। শুধু খেলায় অংশগ্রহণ করা না। খেলার মধ্যে ফাউল হচ্ছে কি না, সেটা দেখা।

এখন বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয় আছে কি না, সেটা তদারকি করা সরকারের দায়িত্ব। আর সিন্ডিকেট তো খেলার ফাউলের মতো। যাঁরা সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন, তাঁদের আইনের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্রব্যবস্থায় চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স করার জন্য যদি প্রতিষ্ঠান না রাখা হয় এবং দুর্নীতি ও অপচয় করলে নিশ্চিত শাস্তি না দেওয়া হয়, এই ভয়টা যদি কারও মধ্যে না থাকে, তাহলে এই অপকর্মগুলো কখনো বন্ধ করা যাবে না।

একটি রাজনৈতিক দল নতুন ক্ষমতায় এসে একটা জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় কি না, সেটার ওপর নির্ভর করছে বাজেটের বরাদ্দগুলো ঠিকভাবে ব্যয় হবে, নাকি দুর্নীতি করে নষ্ট করা হবে। এসব আসলে তাদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে—তারা সুশাসন চায়, কি চায় না।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আজকের পত্রিকা এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বছরের পর বছর দলবদ্ধ ধর্ষণ-ব্ল্যাকমেল, বিচার না পেয়ে দুই বোনের আত্মহত্যা

ইরানের নতুন রণকৌশল: হরমুজের তলদেশ নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান

বিনা খরচে কারিনা কায়সারের মরদেহ দেশে আনছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস

জেরুজালেমের কাছে বিশাল বিস্ফোরণ, ইসরায়েল বলছে ‘পূর্বপরিকল্পিত পরীক্ষা’

রাজধানীতে ৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টি, অলিগলিতে জলাবদ্ধতা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত