বাংলাদেশে চাকরি, পাসপোর্ট, লাইসেন্সসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবাপ্রাপ্তির জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন একটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া। তবে এ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ ও সমালোচনা রয়েছে। অভিযোগ আছে, অনেক সময় অর্থের বিনিময়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের সামাজিক অবস্থান ও চারিত্রিক সত্যতা যাচাইয়ের কথা থাকলেও, ভুল বা অসত্য প্রতিবেদনের কারণে অনেকের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে এই অদৃশ্য জটিলতা এবং ত্রুটিপূর্ণ প্রতিবেদন বহু প্রার্থীকে চাকরি থেকে বঞ্চিত করছে; যা একদিকে দেশীয় গণতন্ত্রের অধিকার খর্ব করছে, অন্যদিকে ন্যায়বিচারের প্রসঙ্গকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ঠিক এমনই বাস্তবতার শিকার হয়েছেন রাজশাহীর পুঠিয়ার কৃষক হাতেম আলীর ছেলে শামীম শাহরিয়ার। তিনি ৪৩তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও ৪৪তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেন। কিন্তু একটি পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রতিবেদন তাঁকে তাঁর স্বপ্নের চাকরি থেকে বঞ্চিত করেছে। ৪৪তম বিসিএসের গেজেটে তাঁর নাম নেই। একদিকে স্বপ্নভঙ্গ, অন্যদিকে কৃষক বাবা হাতেম আলী প্রায় অশ্রুপূর্ণ চোখে ন্যায়বিচার চেয়ে আবেদন করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, আমার ছেলের পরিশ্রম ও মেধার মূল্য আজ কোথায়?
এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রক্রিয়াটি বাতিলের দাবিও তুলছেন। কারণ, বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও অনেকে পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে বাদ পড়ছেন। তাঁদের ভাষায়, সব অর্জন থাকা সত্ত্বেও কেন এমন অবিচার? অনেকের পিতা বা আবেদনকারীর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না; তারপরও রাজনীতির নামে বহু মেধাবীকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। তাহলে কেন শামীমের ওপর এমন আঘাত এল? তাঁকে দ্রুত চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।
শুধু শামীমই নন, অন্য চাকরিপ্রার্থীরাও একই পুলিশ ভেরিফিকেশন জটিলতার শিকার। তাঁদের অনুশোচনা ও হতাশা স্পষ্ট। তাঁদের প্রশ্ন, মেধা-পরিশ্রম-একনিষ্ঠতা এসবের কি কোনো মূল্য নেই? একজন চাকরিপ্রার্থীকে তাঁর মেধা কিংবা কর্মক্ষমতা অনুযায়ী কেন মূল্যায়ন করা হবে না? এ বিষয়ে আইনজীবী বা বিশেষজ্ঞদের মত হলো, প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ না থাকলে, শুধু পুলিশি প্রতিবেদনকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা সংবিধানবিরোধী; বরং প্রার্থীর যোগ্যতা, মেধা, পরিশ্রম এবং ইচ্ছাশক্তির ভিত্তিতেই বিচার হওয়া উচিত।
এ প্রেক্ষাপটে জনগণের কাছে সাধারণ আবেদন যেকোনো সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি পুলিশের প্রতিবেদন কোনো পক্ষের আক্রোশ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে তৈরি হয়, তবে তা অবশ্যই পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সরকারি চাকরিতে যোগ্যতার নিরিখে শূন্য স্থান পূরণের ন্যায়সংগত চেষ্টা ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচায়ক হবে। কারণ, এ ধরনের অনিয়ম ও বঞ্চনা শুধু চাকরিপ্রার্থীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে না; বরং দেশের ন্যায্যতা এবং সমাজের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলো। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার মাধ্যমে শামীম এবং অন্য চাকরিপ্রার্থীদের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া প্রায়ই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফলে নিয়োগ সিদ্ধান্ত যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে না হয়ে ব্যক্তি বা পরিবারের রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, যার উদাহরণ এই লেখায় উঠে এসেছে।
অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীর রাজনৈতিক মতাদর্শ, দলের সঙ্গে সম্পর্ক অথবা স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব পুলিশ ভেরিফিকেশনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। যেসব প্রার্থী রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ কিংবা বিরোধী ধারার বলে বিবেচিত হন, তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশি প্রতিবেদন নেতিবাচক হতে পারে। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়া আটকে যায়, যা অনুচিত। একইভাবে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধ থাকলেও সেটি ভেরিফিকেশনে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেশীদের অভিযোগ বা সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনেক সময় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করে। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অপরাধ না-ও থাকতে পারে। তা ছাড়া অনেক সময় পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রতিবেদন যথাযথভাবে প্রস্তুত হয় না; প্রার্থী সম্পর্কে ভুল তথ্য বা অপ্রমাণিত অভিযোগ প্রতিবেদন হিসেবে উপস্থাপিত হয়, যা পরে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বড় সমস্যা সৃষ্টি করে।
এই সমস্যার সমাধানে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি প্রতিবেদনকে প্রমাণভিত্তিক করা জরুরি। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভেরিফিকেশনের প্রক্রিয়ায় একাধিক পর্যবেক্ষক বা কমিশনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে, যাতে একক ব্যক্তির পক্ষপাতিত্বের ঝুঁকি কমে। পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে অভিযোগ উঠলে, তা বিচারিক পর্যালোচনার জন্য নিরপেক্ষ আদালতে পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকা উচিত, যাতে প্রার্থীরা ন্যায়বিচার পান।
অতএব, বাংলাদেশে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ না হলেও, সঠিক আইনি কাঠামো, মনিটরিং এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এটি আরও নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক হতে পারে। পুলিশকে আরও সতর্ক ও নিরপেক্ষ থাকতে হবে, যেন চাকরি পাওয়া কিংবা পাসপোর্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো আবেদনকারী বৈষম্য কিংবা হয়রানির শিকার না হন। বাংলাদেশে পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টের কারণে একজন আবেদনকারীর চাকরি না হওয়া নৈতিক কি না, এ নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। নৈতিকতানির্ভর করে কেন রিপোর্ট নেতিবাচক হলো, কী প্রমাণ ছিল এবং প্রার্থীর ন্যায্য প্রক্রিয়াগত অধিকার মানা হলো কি না—এসব বিষয়ের ওপর। তবে কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টের কারণে চাকরি না হওয়া নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কারণ, চাকরিতে যোগদানের আগে স্পষ্ট ও লিখিত মানদণ্ড থাকতে পারে, যেখানে আবেদনকারী অপরাধ বা জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে তা বিবেচ্য হয়।
বাংলাদেশের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু এখানে অনেক ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন অস্বচ্ছ, পক্ষপাতপ্রবণ এবং জবাবদিহিহীন হয়ে পড়ে। কখনো অদৃশ্যভাবে নেতিবাচক রিপোর্ট দেওয়া হয় অথচ অপরাধের প্রমাণ থাকে না। এমন রিপোর্ট অনেকের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে চাকরি না হওয়া নৈতিকভাবে দুর্বল; কারণ, সিদ্ধান্তটি মেধা বা যোগ্যতার বদলে অস্বচ্ছ সন্দেহের ওপর নির্ভর করে, যা ঠিক নয়। বহু ক্ষেত্রে প্রার্থী বা পরিবার বা আত্মীয়ের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং তা নেতিবাচক রিপোর্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি নৈতিকভাবে গুরুতর সমস্যা, কারণ রাজনৈতিক মত বা সম্পৃক্ততা গণতান্ত্রিক অধিকার; কিন্তু চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সেটিকে শাস্তির মতো ব্যবহার করা হয়। তাই সংস্কার আলোচনায় আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না আনার সুপারিশ এসেছে, যা প্রশংসনীয়। একবাক্যে বললে, প্রমাণ ছাড়া, শুনানি ছাড়া, ব্যাখ্যা ছাড়া পুলিশি রিপোর্টে চাকরি আটকে দেওয়া নৈতিক নয়। অন্যদিকে নৈতিক
হতে হলে ভেরিফিকেশনকে নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক এবং আপিলযোগ্য করতে হবে। এ কারণেই সংস্কার আলোচনায় ভেরিফিকেশন পুরোপুরি বাদ দেওয়ার কথাও উঠে এসেছে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

ঈদে আগে এত বৈষম্য দেখা যেত না। কারণ তখন আমরা এত উন্নত ছিলাম না। এখন উন্নত হয়েছি, এ জন্য বৈষম্য বেড়েছে। আগে ঈদের মধ্যে সামাজিকতা এখনকার চেয়ে বেশি দেখা যেত।আত্মীয়স্বজনের মধ্যে অতটা বৈষম্য ছিল না। পারস্পরিক দেখাশোনা করার তাগিদ ছিল।
২ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ডামাডোলে বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি পেল গত দশ দিনে দুই দফায় ১০০ টাকা। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চলাচলের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৯৪ টাকা ১৮ পয়সা। এর আগে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরী কমিশন (বিইআরসি) গত ৮ মার্চ প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য....
৬ ঘণ্টা আগে
ইরান যুদ্ধকে ঘিরে বেশ বেকায়দায় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এরপর এই প্রণালি খোলা রাখার জন্য মিত্রদের সাহায্য চেয়েও পাচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
৬ ঘণ্টা আগে
মানুষ তথ্য পেতে চায় তাঁর আশপাশসহ সমাজে-রাষ্ট্রে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কী ঘটছে, তা জানতে। তথ্যপিপাসা মানুষের মজ্জাগত আকাঙ্ক্ষা। আমরা তথ্য সংগ্রহ করি মূলত বইপত্র, অন্যের মাধ্যমে ও সংবাদমাধ্যম থেকে।
২০ ঘণ্টা আগে