Ajker Patrika

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে দেশে বড় সংকটের শঙ্কা

অরুণ কর্মকার
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে দেশে বড় সংকটের শঙ্কা
এই সংকটকালে দেশের প্রতিটি নাগরিকের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী ও মিতব্যয়ী হওয়া অবশ্যকর্তব্য। ছবি: এএফপি

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার আজ অষ্টম দিনে গড়িয়েছে। থেমে নেই ইরানও। আক্রান্ত হওয়ার পরপরই তারাও ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ১৫টি দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে। ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, ইতিমধ্যে সারা পৃথিবী তার বিরূপ প্রভাব অনুভব করছে। কিন্তু এই সংঘাত আপাতত অবসানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং তার তীব্রতা ও ব্যাপ্তি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতি সবচেয়ে বড় বিরূপ প্রভাব ফেলছে জ্বালানি খাতে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও সমৃদ্ধ এই জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তা সারা পৃথিবীর অর্থনীতিকে সমূহ সংকটে ফেলে দিতে পারে। ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়েছে। ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দাম বেশি দিয়েও যে জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ পাওয়া যাবে সেই নিশ্চয়তা নেই। কারণ, ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে একমাত্র চীনা জাহাজ ছাড়া সব জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। প্রণালিটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও এখন ইরানের হাতে। তাই এই যুদ্ধ যে সারা পৃথিবীতে, বিশেষ করে জ্বালানি সংকটকে বিপর্যস্ত করতে পারে, তা নিয়ে সন্দিহান থাকার সুযোগ নেই।

তবে বাংলাদেশের সংকট শুধু জ্বালানি নিয়ে নয়। বাংলাদেশের জন্য একই মাত্রার আরও একটি সংকট হলো জনশক্তি। বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমবাজারের অন্তত ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। এর মধ্যে মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশই যায় সৌদি আরবে। তারপর রয়েছে কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে। এসব দেশে কর্মরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশির কষ্টার্জিত অর্থ আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস। এই বৈদেশিক মুদ্রাই আমাদের দেশের আমদানি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি রচনা করে দেয়।

কিন্তু এবার মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি দেশেই যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজমান থাকায় বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ইতিমধ্যে আরব আমিরাতে একজন ও বাহরাইনে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। কুয়েতে চারজন ও বাইরাইনে তিনজন আহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ বা সীমিত থাকায় অনেকেই জরুরি প্রয়োজনে দেশে ফিরতে পারছেন না। আবার অনেকে ছুটি শেষে যথাসময়ে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। কারও কারও ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে একদিকে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে দুশ্চিন্তায় পড়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি স্থায়ী কিংবা দীর্ঘমেয়াদি হলে এবং সরবরাহে সংকট সৃষ্টি হলে বাংলাদেশে জ্বালানি ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে পড়বে।

তবে প্রবল আশঙ্কা থাকলেও যে বাংলাদেশ এখনই বড় সংকটে পড়ে গেছে, তা কিন্তু নয়। এ যুদ্ধ চলমান থাকলে বাংলাদেশের সমস্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে দুই ক্ষেত্রে। সে জন্য এখনই প্রস্তুতি গ্রহণ হবে বুদ্ধিমানের কাজ। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে তেলের বিকল্প বাজার খোঁজার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। এই অবস্থায় এখনই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ারও কোনো শঙ্কা নেই। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে সাতটি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে বলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বর্তমানে দেশে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রল ১৫ দিন, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিন এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুত রয়েছে।

তারপরও দুশ্চিন্তার কারণ হলো, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কাতার এনার্জির অন্যতম প্রধান একটি জ্বালানি স্থাপনা ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। একইভাবে ইরানের ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো তাদের সবচেয়ে বড় শোধনাগার রাস তানুরা সতর্কতার অংশ হিসেবে বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ আমাদের অপরিশোধিত জ্বালানির পুরোটা আসে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। পরিশোধিত জ্বালানি আসে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে। আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে এলএনজি আসে কাতার থেকে। হরমুজ প্রণালি হয়ে এলএনজি পরিবহন এক মাস বন্ধ থাকলে এশিয়ার স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিমত। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আগামী দু-তিন সপ্তাহ কাতারের এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ থাকলে বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে বড় ধরনের আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে সরকারকে।

সম্ভাব্য এই সংকটজনক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার ইতিমধ্যে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়বেলায় স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানির কথা বলা হয়েছে। এখন কথা হলো, তাতে যে দাম এবং সময় বেশি লাগবে, সেই ক্ষতি বাংলাদেশ পোষাবে কী দিয়ে? এ ক্ষেত্রে কি যুক্তরাষ্ট্র কোনো সহায়তা করবে বাংলাদেশকে?

ঢাকা সফররত দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে বৈঠক করে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা এবং দেশের সর্বত্র জনগণ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এটা তো ছিল তাঁদের ব্যবসায়িক আলোচনা। এতে তো আমাদের আশু সমস্যার কোনো সমাধান হবে না।

বিদ্যুৎমন্ত্রী অবশ্য দেশবাসীর কাছে একটি সময়োপযোগী আহ্বান জানিয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদেরকে বিপদে ফেলেছে। এই বিপদের সময় আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী ও মিতব্যয়ী হওয়া। তাই এই সংকটকালে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মিতব্যয়ী হওয়া অবশ্যকর্তব্য। পাশাপাশি আমরা এও জানি যে সরকার সংকট নিরসনে তার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। সেটা করাও সরকারের অবশ্যকর্তব্য।

তবে বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য ‘যুদ্ধ বন্ধ করে দেওয়া’ই হতে পারে একমাত্র সমাধান। পৃথিবীর প্রতিটি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ চায় অবিলম্বে এই যুদ্ধ বন্ধ হোক। ইরাকের ওপর যেমন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কল্পনাপ্রসূত অভিযোগ এনে আক্রমণ করা হয়েছিল, একইভাবে ইরানের ওপরও তাই করা হয়েছে। এই বর্বরতা বন্ধ হওয়া দরকার। কিন্তু সারা পৃথিবীতে যে তাদেরই রমরমা দাপট। এরা মানুষ ও সভ্যতাকে কোন পাঁকে নিয়ে ফেলবে, তা কেবল ভবিষ্যৎই বলতে পারে।

অরুণ কর্মকার

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ইরান যুদ্ধে পালানটিরের ‘মেভেন’ যেন ১২ ঘণ্টায় ৯০০ আজরাইল

বিশ্ব অর্থনীতিতে অশনিসংকেত: দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ জ্বালানি তেলের দাম

ব্রিটেনের ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী বোমারু বিমান, হামলা কি রাতেই

ইরানকে গোপনে মার্কিন সামরিক গতিবিধির তথ্য দিচ্ছে রাশিয়া

অতিথির রণতরি ডুবল মার্কিন হামলায়, প্রশ্নের মুখে ‘মহাসাগরের রক্ষক’ মোদি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত