Ajker Patrika

পিডিবিকে বাঁচাতে হবে

সম্পাদকীয়
পিডিবিকে বাঁচাতে হবে

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) দেউলিয়া হওয়া নিয়ে ২৮ জানুয়ারি আজকের পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। পিডিবি কেন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তার কারণ জানলে আঁতকে উঠতে হয়। তাহলে এখনই বিদ্যুৎ খাতের বিপর্যয় থেকে বের হওয়ার জন্য পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ নেওয়া না হলে আমাদের বিদ্যুতের সমস্যা আরও ভয়াবহ হবে। শুধু বিগত সরকারের ওপর দুর্নীতির কালিমা লেপন করে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এখন এই সমস্যা মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণ করা জরুরি।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ প্রণয়ন করেছিল। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আইনের অধীনে সরকার কোনো দরপত্র ছাড়াই কেবল দর-কষাকষি নীতির মাধ্যমে চুক্তি করে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ করে দেয়। তবে ভয়াবহ ব্যাপার ছিল, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যে দামে বিদ্যুৎ কেনা হতো, তার চেয়ে অনেক বেশি দামে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিক্রি করা হতো। বড় মরণফাঁদ ছিল ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে বসিয়ে টাকা দেওয়া হয়। ফলে যখন উৎপাদন বেড়েছে ৪ গুণ, তখন ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হয়েছে ২০ গুণ।

বেশি দামে ক্রয় করে কম দামে বিক্রি করার এই আত্মঘাতী মডেলে পিডিবি এখন দাঁড়িয়েছে খাদের কিনারে। গত ১৫ বছরে বিদ্যুতের দাম ৩ গুণ বাড়ালেও লোকসান কমেনি, বরং তা পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। এতে পিডিবির ২০২৫ সাল পর্যন্ত লোকসান হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই ক্ষতির পরেও দেশের জনগণ লোডশেডিংয়ের শিকার হয়েছে, বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে তাদের হিমশিম খেতে হয়েছে। আর এই বাড়তি টাকার সিংহভাগ চলে গেছে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর মালিকদের পকেটে।

অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে বিশেষ আইনটি বাতিল করেছে এবং চুক্তিগুলো পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এই সংকট থেকে স্থায়ী উত্তরণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যেমন ভবিষ্যতে যেকোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বাধ্যতামূলক করতে হবে। আমদানি করা ব্যয়বহুল তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো, পিডিবিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। সিস্টেম লস কমানো এবং প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে বিদ্যুতের বিল আদায় বাড়াতে হবে। এ ছাড়া জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি দুর্নীতির যেসব প্রমাণ পেয়েছে, সেগুলোর ভিত্তিতে দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এ ছাড়া যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, সেগুলো চালু করতে হবে।

বিদ্যুৎ খাতকে দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড বলা হয়। কিন্তু গত দেড় দশকে একে ব্যক্তিগত মুনাফা লোটার হাতিয়ার বানানো হয়েছে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, শুধু দাম বাড়িয়ে পিডিবিকে বাঁচানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়; বরং দুর্নীতির ছিদ্রগুলো বন্ধ করাই এখন প্রধান কাজ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত