Ajker Patrika

মাঠ থেকে বিমানবন্দর: বিশ্বকাপ ফুটবলে বৈষম্যের বহুমুখী চেহারা

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
মাঠ থেকে বিমানবন্দর: বিশ্বকাপ ফুটবলে বৈষম্যের বহুমুখী চেহারা
সুন্দর খেলা উদ্‌যাপন আর কুৎসিত বৈষম্য পাশাপাশি একসঙ্গে চলতে পারে না। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। কোটি কোটি মানুষ তখন একসঙ্গে হাসে, কাঁদে, উদ্‌যাপন করে। ২০২৬ বিশ্বকাপও সেই উৎসবেরই অংশ।

কিন্তু সবার জন্য বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা এক নয়। মাঠে খেলা শুরু হওয়ার আগেই কিছু খেলোয়াড়, সমর্থক ও কর্মকর্তাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে এমন এক বাস্তবতার, যেখানে পাসপোর্টের জাতীয়তাই নির্ধারণ করে দিচ্ছে কে আসতে পারবেন, কে পারবেন না! ফলে প্রশ্ন উঠছে, ফুটবল কি সত্যিই সবার জন্য, নাকি এখনো কারও গায়ের রং অন্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

এবারের বিশ্বকাপে বৈষম্যের প্রথম চেহারা ধরা পড়েছে মাঠে নামার অনেক আগেই, বিমানবন্দরে। সেনেগাল জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের রেলি বিমানবন্দরে বোর্ডিংয়ের সময় কড়া নিরাপত্তা তল্লাশির মুখে পড়তে হয়েছে, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। উজবেকিস্তান দলকে বাড়তি নিরাপত্তা পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছে। উরুগুয়ে দলের মালপত্র তল্লাশি করা হয়েছে শুঁকে দেখার কুকুর দিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ এই ঘটনাগুলোকে লজ্জাজনক ও ঘৃণ্য কাজ বলেছেন। অনেকে অভিযোগ করেছেন, বিশ্বসেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে অপরাধীর মতো আচরণ করা হয়েছে।

সবচেয়ে নির্মম ঘটনাটি ঘটেছে সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরিয়ানকে নিয়ে। আফ্রিকার সেরা রেফারি হিসেবে স্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকারই দেওয়া হয়নি। কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ জানানো হয়নি। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, কারণ একটাই, তিনি সোমালি। আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ কেবল ‘ভেটিং উদ্বেগ’-এর কথা জানিয়েছে, কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি।

রয়টার্সের প্রতিবেদন মতে, ইরাকের স্ট্রাইকার আইমেন হুসেইনকে শিকাগোর ও’হেয়ার বিমানবন্দরে প্রায় সাত ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছে, ফোন পরীক্ষা করা হয়েছে। দলের ফটোগ্রাফার তালাল সালাহকে ১০ ঘণ্টারও বেশি আটকে রেখে শেষ পর্যন্ত প্রবেশাধিকারই দেওয়া হয়নি। আইমেন হুসেইন সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বিশ্বকাপ আয়োজন করতে গেলে বিদেশিদের সঙ্গে এত বৈরী আচরণ কেন?’ এই প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

চিত্রটা আরও উদ্বেগজনক গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে। ইরান দলকে ম্যাচের মাত্র এক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার দিনেই দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের দুই দিন আগে আসার অনুমতি চাইলেও তা নাকচ করা হয়। দলের কোচ আমির ঘালেনোই বলেছেন, তাঁর দল এই বিশ্বকাপের ‘সবচেয়ে নিপীড়িত’ দল। ইরান ফুটবল ফেডারেশন ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে বলেছে, এই বিধিনিষেধ অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য সমান সুযোগের নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

এগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সহজ। কিন্তু একসঙ্গে সাজালে ভিন্ন একটা ছবি দেখা যায়। হাইতি, ইরান, আইভরি কোস্ট ও সেনেগালসহ ৩৯টি দেশের নাগরিকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তারই প্রমাণ। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দেশগুলো মূলত অশ্বেতাঙ্গ, আফ্রিকান বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। ফলে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অনেক দেশের অধিকাংশ সমর্থক নিজেদের দলের খেলা মাঠে বসে দেখার সুযোগই পাননি। তাঁদের অপরাধ একটাই—তাঁরা ভুল পাসপোর্ট নিয়ে জন্মেছেন।

এর চেয়েও অস্বস্তিকর হলো ভিসা জামানতের বিষয়টি। কয়েকটি আফ্রিকান দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত দাবি করা হয়েছে। যে অঞ্চলের অনেক মানুষের মাসিক আয় কয়েক ডলারেরও কম, সেখানে এমন শর্তের অর্থ খুব পরিষ্কার। বলা হচ্ছে না যে তোমরা আসতে পারবে না। বলা হচ্ছে, এমন এক দরজা খোলা আছে, যা বাস্তবে তোমাদের জন্য বন্ধ। বিষয়টি কেবল ভিসা বা অভিবাসনের নয়। অনেকের কাছে এটি প্রশাসনিক ভাষায় বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়ার আরেকটি উপায়।

মাঠের ভেতরের ছবিটাও খুব আলাদা নয়। শুধু ভাষা বদলেছে। সুরিনাম-এল সালভাদর ম্যাচে জাতি-আপমানজনক আচরণের শাস্তি হয়েছে মাত্র ৬২ হাজার ডলার। দক্ষিণ আমেরিকার এক ক্লাব ম্যাচে একই ধরনের অপরাধে জরিমানা ৫০ হাজার ডলার। অথচ মাঠে দেরি করে নামা বা গ্যালারিতে শেষ মুহূর্তে আসার জন্য এর চেয়ে বেশি জরিমানা গুনতে হয়। মাঠের এই বৈষম্য শুধু জরিমানার অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বিশ্বকাপের আগেই একটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ম্যাচে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের জাতি-আপমানজনক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। আরও উদ্বেগজনক হলো, সেই ঘটনায় ভিনিসিয়ুসকেই দায়ী করার চেষ্টা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, এই ভিকটিম ব্লেমিং কেবল সমস্যাকে আড়াল করে না বরং আরও উসকে দেয়।

বৈষম্যের সবচেয়ে নিষ্ঠুর চেহারাটা দেখা যায় মাঠের বাইরে। কাতার বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামগুলো গড়ে উঠেছিল লাখো অভিবাসী শ্রমিকের শ্রমে। বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত ও কেনিয়া থেকে যাওয়া অনেক শ্রমিক কাজ করেছেন সীমিত অধিকার আর অনিশ্চিত জীবনের মধ্যে। কারও মজুরি আটকে ছিল, কারও জন্য দেশে ফেরা ছিল কঠিন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ব্যবস্থাকে আধুনিক দাসত্ব বলেছে। বিশ্বকাপের আলো তাঁদের শ্রমে জ্বলেছে, কিন্তু সেই আয়োজনের সুফল তাঁদের জীবনে খুব কমই পৌঁছেছে।

২০২৬ সালেও দৃশ্যটা বদলায়নি, কেবল মঞ্চ বদলেছে। বাংলাদেশের নারী পোশাকশ্রমিকেরা ফিফার অফিশিয়াল পথে বিশ্বকাপ পণ্য তৈরি করছেন ন্যূনতম মজুরির নিচে। মানবাধিকার সংগঠন ইকুইডেমের তদন্তে উঠে এসেছে, এই শ্রমিকেরা নিয়মিত শারীরিক নিপীড়ন সহ্য করেন, শর্ত ভঙ্গের কারণে চাকরি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটান এবং অতিরিক্ত কাজের ন্যায্য মজুরি পান না।

বিশ্বকাপের জার্সি দেখে আমরা দল চিনতে পারি, কিন্তু সেই জার্সি বানানো মানুষগুলোর কথা খুব কমই মনে রাখি। অথচ বিশ্বকাপের গল্পে তাদের নাম খুব কমই আসে।

বৈষম্যের প্রশ্নে ফুটবলের শাসকদের আচরণ অনেকটা একই রকম। একটি ঘটনা ঘটে, সমালোচনা শুরু হয়, বিবৃতি আসে, তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহ পর সব শান্ত। তারপর নতুন ঘটনা, নতুন বিবৃতি। গবেষকদের ভাষায় এটি ‘পারফরম্যান্স অ্যাক্টিভিজম’। পরিবর্তনের কথা বলা হয়, কিন্তু পরিবর্তনের খরচ বহন করা হয় না। তাই আলোচনার বিষয় বদলায়, বাস্তবতা খুব একটা বদলায় না।

খেলাধুলার ইতিহাস অবশ্য প্রমাণ করে যে পরিবর্তন

সম্ভব, যদি সত্যিকারের চাপ তৈরি হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বয়কট একটি নির্ণায়ক ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৬৮ সালের মেক্সিকো অলিম্পিকে টমি স্মিথ ও জন কার্লোসের নীরব মুষ্টিবদ্ধ হাত পুরো পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলনে নতুন গতি এনেছিল। খেলার মাঠ শুধু প্রতিযোগিতার জায়গা নয়, এটি প্রতিবাদেরও মঞ্চ হতে পারে। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি কাঠামোগত সংস্কারে না পৌঁছায়, তাহলে তা শুধু একটি আবেগময় মুহূর্ত হয়ে ইতিহাসের পাতায় মাত্র একটি ছবি হয়ে থেকে যায়।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রকৃত সমতা নিশ্চিত করতে হলে কয়েকটি বিষয় অপরিহার্য। জাতিবৈষম্যমূলক ঘটনায় জরিমানার পরিমাণ এমন হওয়া দরকার, যা আর্থিকভাবে সত্যিকারের ক্ষতিকর হয়, শুধু প্রতীকী জরিমানা করে লাভ হবে না। শাস্তির প্রয়োগ যাতে সুসংগত ও বৈষম্যমুক্ত হয়, সেটি নিশ্চিত করা দরকার। আয়োজক দেশের অভিবাসন নীতি যাতে খেলোয়াড় ও দর্শকের মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন না করে, সে বিষয়ে ফিফার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা দরকার। সরবরাহ শৃঙ্খলে শ্রমিক শোষণ বন্ধে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকা দরকার।

এই দাবিগুলো নতুন নয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বছরের পর বছর ধরে এগুলো বলে আসছে। কিন্তু ফিফা এখন পর্যন্ত তা কর্ণপাত করেনি, কারণ মুনাফার অঙ্ক তাতে কমে না।

ফুটবল বলে, সবার জন্য একটাই মাঠ। কিন্তু যত দিন গায়ের রং দেখে বিমানবন্দরে থামানো হবে, যত দিন পাসপোর্টের জাতীয়তা দেখে ভিসার মূল্য নির্ধারিত হবে, যত দিন স্টেডিয়াম বানানো শ্রমিকের জীবনের কোনো দাম স্বীকার করা হবে না, তত দিন বিশ্বকাপের উৎসব একটি অসম্পূর্ণ ও অসৎ গল্পই থেকে যাবে। সুন্দর খেলা উদ্‌যাপন আর কুৎসিত বৈষম্য পাশাপাশি একসঙ্গে চলতে পারে না। একটিকে বেছে নিতে হবে। ফুটবল কোন পায়ে দাঁড়াবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত