Ajker Patrika

আসন্ন শারদ উৎসব বনাম দুর্গাপূজা

অজয় দাশগুপ্ত
আসন্ন শারদ উৎসব বনাম দুর্গাপূজা
দুর্গাপূজার সময় প্রতিমা ভেঙে ফেলার শঙ্কায় থাকে না প্রবাসীরা। ছবি: জাহিদুল ইসলাম

দুর্গাপূজাকে আমরা শারদীয় উৎসব নামেও ডেকে থাকি। শরৎকাল বাংলাদেশের এক অপূর্ব ঋতু। যদিও কাগজ-কলমে ছয়-ছয়টি ঋতু, কিন্তু বাস্তবে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত—এরাই টিকে আছে। তবু আরেকটি ঋতু নীরবে এসে দাঁড়ায়। মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে দেখে এই পোড়ার সমাজে, ভঙ্গুর রাষ্ট্রে সর্বদা ক্রন্দনরত দেশে শিউলি ফোটে। ভোরবেলার আকাশ নীল-নীলাকার হয়ে মাথার ওপর বিরাজ করে। মাঝে মাঝে সাদা মেঘের ভেলা আর মন আনমনা করা মাটির গন্ধে সবাই জানে শরৎ এসেছে। সেই শরৎ, যাকে নিয়ে কবি লিখেছেন:

ভালোই হয়েছে প্রভাত এসেছে মেঘের সিংহবাহনে...

বলছিলাম দুর্গাপূজার কথা। বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর এই উৎসব কেবল পূজাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কালক্রমে সাহিত্য-শিল্পের নানা শাখায় পূজার প্রভাব পড়েছে। সে কারণে একসময় দুর্গা উৎসব বা পূজাকে আমরা শারদ উৎসব বলে মানতে চেয়েছি। একটা কথা বলে রাখা ভালো, এখন সময় যতটা উৎসবের, ততটাই বিষাদের। দুর্গা দেবী, তিনি বাঙালি হিন্দু ও দুর্গা বিশ্বাসী যেকোনো মানুষের কাছেই ‘মা’। মা কী করেন? আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে পৃথিবীর একটা সেরা ফটোগ্রাফ বা ছবির কথা—মা ক্যাঙ্গারু হিংস্র বাঘ বা সিংহকে তার শরীর খুবলে খেতে দিচ্ছে এবং বাচ্চাটাকে আগলে রেখেছে পরম মমতায়। এটাই মায়ের স্নেহ। ঢাল, তলোয়ার, কামান, বন্দুকের পুরুষ যা পারে না, নারী তা-ই পারে। আর মা হলে তো কথাই নেই।

আজকের দুর্গা উৎসব বা পূজা বাংলাদেশের বাস্তবতায় কি আসলেই কোনো শারদ উৎসব? আমি বলব, না। এখন যা চলছে তার নাম মাৎস্যন্যায়। মাছেরা যেমন একসঙ্গে এক পুকুরে থাকলেও বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়, বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর অবস্থাও আজ তেমন। তাদের গিলে খাবার মানুষের অভাব নেই। হঠাৎ করে বদলে যাওয়া দেশের বাস্তবতায় রাতারাতি হিন্দুরা ঘোর দুশমন বা শত্রু হয়ে উঠেছে কারও কারও। সবচেয়ে ভয় বা আতঙ্কের ব্যাপার হচ্ছে, বিচারহীন ক্রমবর্ধমান এই আতঙ্কের কোনো সমাধান নেই। বিচার, প্রশাসন বা দেশ পাশে দাঁড়াচ্ছে—এমনটা দৃশ্যমান হচ্ছে না। একসময় যাদের পক্ষ বা যাদের সহযোগী বলে হিন্দুরা মার খেত, তারা আজ নিজেরাই কোণঠাসা। কোণঠাসা না হলেই-বা কী? আমরা কি ভুলে গেছি বিদায় নেওয়ার আগে তারা কী বলেছিল? তারা বলেছিল, এত বেশি পূজা করার দরকার নেই; এত মণ্ডপ বা এত প্যান্ডেল পাহারা দেওয়া সম্ভব না; তাই পূজা কমাতে হবে। এই প্রচ্ছন্ন না বলার ভেতর একধরনের আধিপত্য আর ভয় দেখানো কি শুধু হিন্দুদের বেলায় সত্য হয়েছে? যারা বলেছিল, তাদেরই মূলোৎপাটন দেখেছি আমরা। এর মানে এই, হামবড়া ভাব, আস্ফালন আর দম্ভ প্রকৃতি সহ্য করে না। এখন যারা অত্যাচার আর অনাচার করছে, তাদের পরিণাম আরও ভয়াবহ হতে বাধ্য। এরা হত্যা, নির্যাতন আর ভয়ভীতির মাধ্যমে পুরোনো পাকি কৌশলে হিন্দুদের পালিয়ে যেতে বা থাকলে মেরে ফেলাসহ সম্পত্তি দখল করতে চাইবে না, এমন নিশ্চয়তা কে দিতে পারে? নিয়তি কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। এদেরও বলবে না।

আমরা দুর্গাপূজা করি নির্ভয়ে। আমরা যারা দেশান্তরি বা প্রবাসী, আমাদের কোনো মৃত্যুভয় বা প্রতিমা ভাঙার ভয়ে ভুগতে হয় না। কিন্তু বিষয়টিকে যদি সর্বজনীন ও সর্বতোভাবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে তো এটা মানতে হবে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে একটি মূর্তি বা দেব-দেবীর অপমান মানে আমাদের সবার অপমান। বিশেষ করে আমরা যে দেশে জন্মেছি বা যাদের মাতা-পিতা যে দেশে জন্মেছে, জন্মসূত্রে সে দেশ, সে মাটি আমাদের জন্মভূমি। দুনিয়ার কোন রীতিতে কারও জন্মভূমিতে কাউকে এভাবে অপমান বা নির্যাতন করা সম্ভব? অথচ সেটাই ঘটে চলেছে কোথাও কোথাও।

দুর্গার আগমন আমাদের সবার জন্য শক্তি আর সাহসের এক বার্তা। পুরাণ মতে দুর্গাকে জননীর প্রতিফলন মনে করা হয়। বহু দেব-দেবীর সম্মিলন আর সৃজনে তাঁর জন্ম। তাঁর অস্ত্রগুলোও বিভিন্ন দেবতার কাছ থেকে পাওয়া। এই যে বহু বলধারিণী দুর্গা, তিনি আমাদের কাছে শুধু ভক্তিরস নিয়ে কেন আসবেন? কেন তিনি পাঁচ দিন পূজিতা হওয়ার জন্য আসবেন? যুগ-যুগান্ত ধরে যাঁর আরাধনা চলবে, বাঙালি যাঁকে মা ও কন্যারূপে ভালোবাসে, তাঁর কাছ থেকে আমাদের শক্তি, সাহস, আত্মরক্ষাও চেয়ে নিতে হবে। সে জন্যই তিনি আসবেন।

অসাম্প্রদায়িক হওয়ার সাধনা কেবল বাঙালি হিন্দুর একার কাজ হতে পারে না। পৃথিবীতে বহু ধর্ম এসেছে, আবার মিলিয়েও গেছে। যারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে না, স্বয়ং ঈশ্বরও তাদের রক্ষা করতে অসমর্থ। হানাহানি, মারামারি বা উগ্রতার পরিবর্তে প্রেম আর ভালোবাসায় বিশ্বাসী হিন্দুরা ভুলে গেছে তাদের শ্রেষ্ঠ প্রেমের দেবতা শ্রীকৃষ্ণ না থাকলে মহাভারতের যুদ্ধে ধর্মের জয় হতো না। নিজ হাতে অস্ত্র ধারণ না করলেও যুদ্ধ কৌশল আর ভূমিকায় তিনিই পার্থ, তিনিই আমাদের জয়ের নায়ক। এই ঘটনায় এটা স্পষ্ট—ধর্মের জন্য, ধর্ম রক্ষার জন্য আর প্রাণের জন্য মানুষকে কৌশলী আর সাহসী হতেই হয়।

আজ আবার দুর্গাপূজার এই পবিত্র সময়কালে শরতের আকাশে যখন সিঁদুর রঙের মেঘ, যখন মানুষের আনন্দ, আতঙ্ক আর ভয়ের মুখোমুখি, যখন বাঙালি হিন্দু জানে বাঁচার লড়াই করছে, তখন আমাদের কতর্ব্য কী? আমাদের উচিত সব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো; যার যার জায়গা ও সাধ্য থেকে ত্রাণ ও পরিত্রাণে সাহায্য করা। মনে রাখতে হবে, বাঙালি হিন্দুর এক বিশাল সংখ্যার অপমান বা নিশ্চিহ্নকরণ ভবিষ্যৎকে কেবল বিপদগ্রস্ত করা ছাড়া আর কিছুই করবে না।

বিশ্বাস তীব্র হোক। মা দুর্গা যে ভয়হীনতার প্রতীক, তিনি যে আমাদের বিজয়ী করতে পারেন, সে আস্থা কাজে প্রতিফলিত হোক। শারদ উৎসব আবার শারদ উৎসব হবে সেই দিন, যেদিন বাঙালির মাথার ওপর থেকে ভয়ের ছায়া সরে যাবে; কেউ অপমানিত হবে না বা জীবননাশের সামনে দাঁড়াবে না। তত দিন পর্যন্ত আমরা নাহয় একান্তে দুর্গাপূজাই করব।

লেখক: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত