Ajker Patrika

জাতীয় বন্দর কৌশল: নদীবন্দর প্রকল্পে ব্যয়ের ৭৯ শতাংশই ড্রেজিংয়ে

  • ড্রেজার কেনা, ড্রেজিং ও সংশ্লিষ্ট কাজে বিপুল এই ব্যয় হচ্ছে
  • কোথায় কত ড্রেজিং প্রয়োজন ও সুফল কতটা, তা মূল্যায়ন করা হচ্ছে না
  • তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে নতুন কৌশলপত্রে
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
জাতীয় বন্দর কৌশল: নদীবন্দর প্রকল্পে ব্যয়ের  
৭৯ শতাংশই ড্রেজিংয়ে
ছবি: সংগৃহীত

দেশের নদীবন্দর ও নৌপথ উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দের বেশির ভাগ টাকা খরচ হচ্ছে ড্রেজিংয়ে। কিন্তু কোথায় কতটা ড্রেজিং প্রয়োজন, নৌযান ও পণ্য চলাচলের পরিমাণ এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া এত ব্যয়ের ড্রেজিং অপচয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি কৌশলপত্রের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে নেওয়া প্রকল্পগুলোর প্রকৃত ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট ব্যয়ের ৭৯ শতাংশ গেছে ড্রেজিং, ড্রেজার কেনা ও সংশ্লিষ্ট কাজে। তবে বিপুল এই ব্যয়ের বিপরীতে কোথায় কত ড্রেজিং প্রয়োজন এবং এর অর্থনৈতিক সুফল কতটা, তা নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় বন্দর কৌশলের নদীবন্দর অংশের ব্যয় বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে। এ জন্য তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে নতুন একটি কৌশলপত্রে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও জাপানের ওভারসিজ কোস্টাল এরিয়া ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (ওসিডিআই) কৌশলপত্রটি প্রণয়ন করছে। কৌশলপত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের নৌপথ ও বন্দর অববাহিকায় প্রতিবছর প্রায় ৫০ কোটি থেকে ২৪০ কোটি টন পলি জমে। ফলে নৌপথ সচল রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং প্রয়োজন। শুধু পলি অপসারণ নয়, কোথায় কতটা ড্রেজিং করা হচ্ছে এবং এতে অর্থনীতিতে কী সুফল মিলছে, সেই হিসাব করা হচ্ছে না। এবার সেই হিসাব করার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে কৌশলপত্রে।

নথিতে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নৌপথে রক্ষণাবেক্ষণমূলক ড্রেজিংয়ের পরিকল্পিত পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ঘনমিটার।

এর মধ্যে বিআইডব্লিউটিএর নিজস্ব ড্রেজার দিয়ে প্রায় ৮৩ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করার পরিকল্পনা ছিল। তবে ড্রেজিংয়ে তোলা পলি কোথায় ফেলা হবে, সেটিও বড় সমস্যা হয়ে উঠছে।

কৌশলপত্রের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, পলি অপসারণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য উপযুক্ত জায়গা নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। ফলে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি তোলা পলি কোথায় ও কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, সেটিও পরিকল্পনার অংশ হওয়া দরকার।

রক্ষণাবেক্ষণমূলক ড্রেজিংয়ে জবাবদিহি বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। কৌশলপত্রের সুপারিশে বলা হয়েছে, ড্রেজিংয়ের অর্থনৈতিক সুফল পরিমাপের জন্য নৌযানের ধরন ও আকার অনুযায়ী চলাচলের পরিমাণ নির্ধারণ এবং নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান তৈরি করতে হবে। এতে কোন নৌপথে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক যুক্তি বেশি, সেটি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিও তুলে ধরা হয়েছে নথিতে। এতে বলা হয়েছে, বর্তমানে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতের জন্য পূর্ণাঙ্গ মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) নেই। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ নৌপথ করিডর মাস্টারপ্ল্যান এবং নদীবন্দর মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কৌশলপত্রের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ড্রেজিংসহ নৌপথ উন্নয়নে বিনিয়োগের আগে পণ্যের উৎস ও গন্তব্য, নৌযান চলাচলের পরিমাণ এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ করে কোথায় বিনিয়োগ করলে বেশি সুফল পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ড্রেজিংকে যদি নৌপথ উন্নয়নের একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা হয়, তাহলে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হবে, কিন্তু টেকসই সুফল পাওয়া যাবে না। কোথায় কত ড্রেজিং প্রয়োজন, নৌযান ও পণ্য চলাচল কতটা, তার ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন ছাড়া ড্রেজিং প্রকল্প নেওয়া হলে তা একসময় শুধু অর্থ ব্যয়ের ধারাবাহিকতায় পরিণত হবে।’

ড্রেজিংয়ে এত ব্যয়ের কারণ কী জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) এ এইচ মো. ফরহাদ ফোন কেটে দেন। পরে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. মুহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনিও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জাকারিয়া বলেন, ‘জাতীয় বন্দর কৌশল এখনো চূড়ান্ত হয়নি। খসড়ার ওপর মতামত নেওয়া হচ্ছে। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সভা করে মতামত পর্যালোচনার পর কৌশলপত্রটি পরিমার্জন করা হবে। কৌশলপত্রে বন্দরগুলোর উন্নয়নে কী করা উচিত, তার দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এর সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হবে।’

সচিব আরও বলেন, ‘বন্দরগুলোর উন্নয়নে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে ডেটাবেইস তৈরি জরুরি। বর্তমানে নদীবন্দরগুলোর অনেক কার্যক্রম ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। এসব কার্যক্রম আধুনিকায়নসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত