Ajker Patrika

নারী ও শিশু নির্যাতন: মামলায় সাজা কম খালাসের হার বেশি

  • এক দশকে ধর্ষণের শিকার অন্তত ৫ হাজার ৫৯৮ শিশু
  • তাদের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭৪ শিশুকে
  • জানুয়ারি-এপ্রিলে মেয়েশিশুর বিরুদ্ধে ৪৭৯টি সহিংসতা
  • নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দেড় লাখ মামলা
শাহরিয়ার হাসান ও অর্চি হক, ঢাকা
নারী ও শিশু নির্যাতন: মামলায় সাজা কম
খালাসের হার বেশি
প্রতীকী ছবি

সিলেটে ৬ মে চার বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা, ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছর বয়সী আরেক শিশু ধর্ষণের পর খুন, ১৬ মে মুন্সিগঞ্জে ১০ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা, ১৯ মে পাবনায় পঞ্চম শ্রেণির এক শিশুকে ধর্ষণ। একই দিন (১৯ মে) রাজধানী ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা মানুষকে নাড়া দিয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বলছে, দেশে গত এক দশকে অন্তত ৫ হাজার ৫৯৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত ২৭৪ শিশু। তবে এগুলোর অধিকাংশ মামলার বিচার দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। অনেক মামলায় আসামিরা খালাসও পেয়েছে। এক বছর আগে সারা দেশে আলোড়ন তোলা মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায় হয়েছে। তবে উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির অপেক্ষায়।

এক গবেষণার তথ্য বলছে, নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যায়।

মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের বেপরোয়া করে তুলেছে। দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে কমে আসতে পারত।

পল্লবীর আট বছরের শিশুর ওপর নৃশংসতা মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। এ ঘটনার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানুষ সোচ্চার হয়েছে। এর মধ্যেই চট্টগ্রামে গত বৃহস্পতিবার ও গতকাল শুক্রবার দুই শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবারের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ মানুষ অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। চলতি মাসে পল্লবীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার শিকার হওয়া শিশুদের বয়স ৪-১০ বছরের মধ্যে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি ভুক্তভোগীর পূর্বপরিচিত বা প্রতিবেশী।

গণমাধ্যমে যেসব ঘটনা এসেছে, তাতে দেখা গেছে, ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে নিখোঁজের এক দিন পর চার বছর বয়সী এক মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার নবম শ্রেণির এক ছাত্র জিজ্ঞাসাবাদে তাকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করেছে। এর দুদিন পর মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ ওঠে। ১৯ মে পাবনার চাটমোহরে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে বলেছে, ৬ মে সিলেটের জালালাবাদে চার বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

চট্টগ্রাম মহানগরের পৃথক দুটি স্থানে বৃহস্পতিবার ও গতকাল দুটি শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে। এর আগে মার্চে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার পর গলা কেটে হত্যাচেষ্টার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়।

মানবাধিকার সংগঠন ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে গত এক দশকে অন্তত ৫ হাজার ৫৯৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ২৭৪ শিশুকে। এসব ঘটনায় করা অধিকাংশ মামলার এখনো বিচার শেষ হয়নি। আর যেসব মামলার বিচার শেষ হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আসামিরা খালাস পেয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ১ হাজার ২৮ জন নারী ও মেয়েশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মেয়েশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ৪৭৯টি ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৭৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ১৫৩ শিশু।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। বর্তমানে দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোয় ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৫০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৪২ হাজার ২৭২টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগেও অনেক মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকারকর্মী শাহীন আনাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ধর্ষণের অন্যতম প্রধান কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অপরাধীরা মনে করে, তারা শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যাবে। পল্লবীর শিশুটির ধর্ষকও হয়তো ভেবেছিল, কিছুদিন জেল খেটে বের হয়ে আসতে পারবে। কারণ, শিশু ধর্ষণের ঘটনায় শাস্তি কার্যকর হওয়ার নজির খুব কম। তিনি বলেন, মামলার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা, সামাজিক চাপ, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা রেহাই পেয়ে যায়। পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও ভয়াবহভাবে বাড়ছে।

মাগুরার আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার এক বছর পেরিয়ে গেলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। ২০২৫ সালের ৫ মার্চ ধর্ষণের শিকার হয় শিশুটি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে পরে মারা যায়। বিচারিক আদালত রায়ে প্রধান আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। হাইকোর্টে আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় রায় কার্যকর হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফওজিয়া করিম বলেন, যৌন হয়রানি ও শিশু যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো আলাদা আইন নেই। উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি নীতিমালা থাকলেও সেটি এখনো আইনে পরিণত হয়নি। তিনি বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না, সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম—সব জায়গায় শিশু সুরক্ষা ও নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এমন অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক ও পারিবারিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধীদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য পুলিশের একটি সফটওয়্যারভিত্তিক ডেটাবেইস রয়েছে। চার-পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য সেখানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে পুনরায় অপরাধে জড়ানোর আগেই তাদের রেকর্ড দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা খুব একটা দেখা যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলা তদন্তে অবহেলা, দুর্বল তদন্ত এবং বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় এমন ঘটনা থামছে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক সংকট, ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক দৈন্য—এসব কারণে সাধারণত এ ধরনের অপরাধ ঘটে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

রাতভর উত্তাল চট্টগ্রাম: পুলিশের পোশাক পরিয়ে সরানো হয় ধর্ষণে অভিযুক্তকে, রাখা হয়েছে কোথায়?

তথ্য গোপন করে ১৬ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের পদে বহাল তিনি

স্থানীয় নির্বাচনে বড় পরিবর্তন: থাকছে না পোস্টার ও দলীয় প্রতীক, অক্টোবরে ভোটের প্রস্তুতি

যৌথ পরিবারে কোরবানি কীভাবে দিতে হয়, বিধান কী

বাংলাদেশ সিরিজের পর বাদ রিজওয়ান

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত