Ajker Patrika

যাঁদের চিন্তায় গড়ে উঠেছিল আজকের শহীদ মিনার

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
যাঁদের চিন্তায় গড়ে উঠেছিল আজকের শহীদ মিনার

একুশে ফেব্রুয়ারি দিনভর শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের চত্বর। শহীদ স্মৃতি অমর করতে গড়া এই মিনার জানিয়ে দেয়, মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল বাঙালি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এখন যে মিনারটি রয়েছে, তা বায়ান্নর রক্ত ঝরার কয়েক বছর পর নানা পর্বে নির্মিত হয়। বায়ান্নর ২৩ ফেব্রুয়ারি নির্মিত প্রথম অস্থায়ী মিনারটি পুলিশ ভেঙে দিয়েছিল তিন দিনের মাথায়ই।

১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাসে ভাস্কর হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদের করা নকশায় শুরু হয়েছিল ভাষাশহীদদের স্মরণে মিনার তৈরির কাজ। তবে ১৯৫৮ সালেই আইয়ুব খানের সামরিক আইন জারির কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ভাস্কর নভেরাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব কাজ বাদ দিয়ে সেখান থেকে সরে যেতে হয়। পরে কাজ শেষ করেন হামিদুর রহমান। ১৯৫৯-৬২ সময়ে অসমাপ্ত মিনারেই সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারদের শ্রদ্ধা জানিয়েছেন মানুষ। এরপরে মিনারের মূল নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ বরকতের মা মিনার উদ্বোধন করেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় পাকিস্তানি বাহিনী এটি ভেঙে ফেলে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে নতুন করে শহীদ মিনার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেবার ১৯৬৩ সালের সংক্ষিপ্ত নকশার ভিত্তিতেই কাজ শেষ করা হয়। ১৯৭৬ সালে নতুন নকশা অনুমোদিত হয়। সেখানে ১ হাজার ৫০০ বর্গফুটের ভিত্তির ওপর চারটি ক্ষুদ্র ও একটি বড় থাম ছিল। এর পেছনে ছিল বড় লাল সূর্যের নকশা।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থপতি বা মূল পরিকল্পনা, নকশাকারের কথা বললেই চলে আসে শিল্পী হামিদুর রহমানের নাম। তবে গোড়া থেকেই এ কাজে যুক্ত ছিলেন দেশের সবচেয়ে পরিচিত নারী ভাস্কর নভেরা আহমেদও। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বছর দশেক আগে স্থায়ীভাবে ফ্রান্স চলে যান নভেরা। তাঁর ফরাসি স্বামী গ্রেগোয়ার দো ব্রুন্স এমনও লিখেছেন, পূর্ব পাকিস্তান সরকার ভাস্কর্যে বিদেশি ডিগ্রি থাকা নভেরাকেই শহীদ মিনার নির্মাণের দায়িত্ব দিয়েছিল। তিনি সহকারী হিসেবে নেন হামিদুর রাহমানকে। সামরিক আইন জারি হওয়ায় কাজ বন্ধ হয়ে গেলে নভেরা অন্যত্র চলে যান। সহকারী থেকে হামিদুর রহমানই হন শহীদ মিনার প্রকল্পের প্রধান।

প্রচলিত ধারণা, শহীদ মিনারের থামগুলো মা ও তাঁর গুলি খেয়ে পড়ে যাওয়া সন্তানদের প্রতীক। তবে নভেরার ফরাসি স্বামী গ্রেগোয়ার দো ব্রুন্সের মতে, এখানে আসলে তুলে ধরা হয়েছে আশীর্বাদের মুদ্রা অর্থাৎ ভঙ্গিমা। একটি হাত, যা জনতাকে আশীর্বাদ করছে। তাই শহীদ মিনারে পাঁচটি আঙুলের মতো কাঠামো রয়েছে। স্ত্রী নভেরার সঙ্গে আলাপের কথা উল্লেখ করে ব্রুন্স লিখেছেন, ‘এটি মা আর সন্তানের ভাস্কর্য নয়। যদি তা-ই হতো, তাহলে পাঁচটির বদলে দুটি বা তিনটি আঙুল থাকত।’

প্যারিসে নিজেকে নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে নভেরাও শহীদ মিনার নির্মাণের প্রেক্ষাপট নিয়ে এ রকম কথাই বলেছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারি লোকজন যোগাযোগ করেছিল, আমি তাদের আইডিয়ার কথা বলেছি। ...অনেক কাজ একা করতে হবে বলে হামিদকে বলি সাহায্যের জন্য।’

সৈয়দ শামসুল হকসহ বিভিন্ন সময়ে কিছু শিল্পী, লেখক, শিল্প সমালোচকও তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে দাবি করেছেন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পরিকল্পনা ও নকশায় সক্রিয়ভাবেই যুক্ত ছিলেন ভাস্কর নভেরা আহমেদ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত