Ajker Patrika

সৌদিতে গৃহকর্মী

এক নারী ফিরলেন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে অন্যজন মানসিক ভারসাম্যহীন

নুরুল আমিন হাসান, উত্তরা (ঢাকা)  
এক নারী ফিরলেন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে অন্যজন মানসিক ভারসাম্যহীন
সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার ভারসাম্য হারানো নারীকে পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। গতকাল রাজধানীর বিমানবন্দরসংলগ্ন আশকোনায় ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে। ছবি: আজকের পত্রিকা

ভাগ্যবদলের আশায় সৌদি আরবে পাড়ি দিয়ে উল্টো ভাগ্যবিড়ম্বিত হয়েছেন বরিশালের এক নারী। গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া ওই নারী দিনরাত কাজ করেও খাবার পাননি ঠিকমতো। শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। চারবার হাতবদল হওয়া ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরেছেন; কিন্তু বাড়ি ফেরা হয়নি।

সৌদিতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন আরেক নারী। ১৩ দিন আগে দেশে ফিরলেও পাসপোর্ট ও পরিচয়পত্রের অভাবে তাঁর পরিচয় মিলছিল না। পরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টার ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাঁর পরিচয় বের করে গতকাল মঙ্গলবার তুলে দিয়েছে পরিবারের হাতে।

বরিশালের নারী ফিরলেন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে

ভাগ্যবিড়ম্বিত এই নারীর এখন দিন কাটছে রাজধানীতে বিমানবন্দর-সংলগ্ন আশকোনায়, ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে। দালালের খপ্পরে পড়ে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় সৌদি আরবে গিয়ে তাঁর ভবিষ্যৎই এখন অনিশ্চিত। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবে গিয়ে কোনো টাকা পাইনি। শান্তিতে থাকতে পারিনি, খেতেও পারিনি। শুধু নির্যাতনই সহ্য করেছি।’

ওই নারীর বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এক দালালের মাধ্যমে তিনি পাড়ি জমান সৌদি আরবে। দালাল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ভালো বেতন, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং বাংলাদেশি অন্য নারীদের সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখেন, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমে তাঁকে রাখা হয়েছিল একটি অফিসে। পরে তাঁকে একের পর এক বাড়িতে কাজের জন্য পাঠানো হয়।

ওই নারী অভিযোগ করেন, সৌদি আরবে যাওয়ার পর তিনি চারবার হাতবদল হন। শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনেরও শিকার হন। ভাষাগত সমস্যার কারণে কারও সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারেননি। দিনরাত কাজ করলেও সারা দিনে খাবার হিসেবে পেতেন ছোট একটি রুটি। ক্ষুধার জ্বালায় ডাস্টবিন থেকেও খাবার কুড়িয়ে খেয়েছেন। ঘুমাতেও দেওয়া হতো না। একপর্যায়ে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জানতে পারেন, তাঁকে ১০ হাজার রিয়ালে ‘কিনে নেওয়া’ হয়েছে এবং তিন মাসের বেতন আগেই পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ সেই অর্থের কিছুই তিনি পাননি। অথচ যাওয়ার খরচ জুগিয়েছিলেন নিজের জমানো টাকায়।

ওই নারী জানান, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একদিন পালিয়ে চলে যান মদিনায়। সেখানে খণ্ডকালীন কাজ করে টিকে থাকার চেষ্টা করেন। পরে লোকজনের পরামর্শে মক্কায় গিয়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি মেলেনি। পুলিশ তাঁকে চুরির মামলায় অভিযুক্ত করে মারধর ও অমানবিক আচরণ করে। পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় জানতে পারেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা। অবশেষে অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে দেশে পাঠানো হয়। বিমানবন্দরে এপিবিএন তাঁকে ব্র্যাকের কাছে হস্তান্তর করে। বর্তমানে তিনি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহকারী পরিচালক শরীফুল ইসলাম হাসান বলেন, ওই নারী একাধিকবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। নিয়োগকর্তার কাছে বিচার চাইলে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পুলিশি হেফাজতে থাকার সময় জানতে পারেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা। বিদেশে নির্যাতনের শিকার নারীদের দেশে ফেরানোর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করছে না।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিদেশগামী নারী কর্মীদের নিরাপত্তা, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে দেশে ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন এবং আইনি সহায়তা জোরদার করতে হবে।

১৩ দিন পর স্বজনের কাছে

১৩ দিন আগে সৌদি আরব থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় দেশে ফিরেছিলেন এক নারী (৪০)। কিন্তু তাঁর হাতে ছিল না পাসপোর্ট বা কোনো পরিচয়পত্র। চিনতে পারছিলেন না কাউকেই। তাঁর পরিচয় শনাক্ত করে গতকাল স্বজনদের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর উত্তরায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে ওই নারীর তিন সন্তান তাঁদের মাকে বুকে টেনে নিয়েছেন।

ওই নারীর সন্তানেরা জানান, ২০১৯ সালে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার এক দালালের মাধ্যমে এবং ঢাকার ‘এটিবি ওভারসিজ লিমিটেড’ নামক এজেন্সির সহায়তায় তাঁদের মা সৌদি আরবে যান। সেখানে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। ২০২১ সালের পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এক মেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘নির্যাতনে মায়ের চেহারা এমন হয়েছে যে চেনাই যাচ্ছে না। মা এখন আর কথাও বলছে না। আমাদেরকেও চিনছে না।’

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় নামেন ওই নারী। তাঁর অসংলগ্ন আচরণ দেখে সংশ্লিষ্টরা তাঁকে ব্র্যাকের সেফহোমে পাঠান। পরিচয় না থাকায় তাঁর পরিবার খুঁজে পেতে বেগ পেতে হচ্ছিল। পরে পিবিআইর খুলনা অঞ্চলের এসপি রেশমা শারমিনের উদ্যোগে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেইসের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, ‘এদের মতো নারীদের দুর্দশা দেখার কেউ নেই। নির্যাতিত হয়ে ফেরার পর বিমানবন্দরে তাঁদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি নেই। রাষ্ট্র ও সরকারকে এই অসহায় নারীদের সহায়তায় একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত