Ajker Patrika

মব করে হত্যা থামছে না, বিচার হয়নি একটিরও

  • ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত মবে নিহত ৪৭৯ জন।
  • আসকের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম ৮ মাসেই নিহত হয়েছেন ১৫৪ জন।
  • ঢাবিতে তোফাজ্জল হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র জমা হলেও বিচার শুরু হয়নি।
এস এম নূর মোহাম্মদ, ঢাকা  
মব করে হত্যা থামছে না, বিচার হয়নি একটিরও
ঢাবির ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ফাইল ছবি

‘মব’ করে হত্যার ঘটনা থামছেই না। চলতি সেপ্টেম্বরেও খুলনায় এক শিক্ষার্থী এবং কক্সবাজারে এক যুবক মবের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মবের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ১৫৪ জন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত মবের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৪৭৯ জন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মব করে হত্যার ঘটনায় মামলা হলেও বিচারে গতি না থাকায় এমন ঘটনা থামছে না। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মবে প্রাণহানির ঘটনায় করা কোনো মামলারই বিচার এখনো শেষ হয়নি।

আইনজ্ঞরা বলছেন, এসব মামলা দ্রুত বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হলে এমন ঘটনা বন্ধ হবে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে আদালতের প্রতি মানুষের আস্থাও বাড়বে।

জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল আজকের পত্রিকাকে বলেন, মবের যেকোনো ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়া যেতে পারে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে মব-সন্ত্রাসের ঘটনা কমে যাবে বলে তিনি মনে করেন। তবে মবের ঘটনায় হতাহতের যে সংখ্যা বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

কক্সবাজারের মহেশখালীতে ১৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ ফয়সাল (২৭) নামের এক যুবককে চোর সন্দেহে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক ও কিশোর তাঁকে পেটাচ্ছে। ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনা নগরে পিটিয়ে হত্যা করা হয় নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আজমুল হোসেনকে। মেসের শিক্ষার্থী ও বহিরাগতরা তাঁকে পেটান। এ দুটি ঘটনায় মব করে হত্যার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। দুটি ঘটনায় মামলা হয়েছে।

২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর চোর সন্দেহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক তোফাজ্জল হোসেনকে আটকের পর ভাত খাইয়ে মব করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। নির্মম ওই ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আসামিদের মধ্যে মাত্র ২ জন কারাগারে, ৯ জন জামিনে আছেন। বাকি ১৭ জনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হলেও তাঁদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ওই ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার বিচারকাজ শুরু হয়নি।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা শামীম মোল্লাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হলেও দুই বছর পরও প্রতিবেদন দেয়নি পিবিআই।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চোর সন্দেহে মব সৃষ্টি করে রিহান মাহিন নামের এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা এবং দুজনকে আহত করার ঘটনায় মামলা হয় গত বছরের ২২ আগস্ট। এ ঘটনায় নিহত কিশোরের মায়ের করা ওই মামলার অভিযোগপত্র এখনো দেওয়া হয়নি।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে (২৭) মব সৃষ্টি করে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার পর মরদেহ বিবস্ত্র করে গাছে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় পরদিন মামলা হয়। এ মামলায় ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমন আরও হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকার সংগঠন আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মব সহিংসতায় ১২৮ জন নিহত হন। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৭ জনে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১৫৪ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৫৭ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৪ জন, খুলনা বিভাগে ২০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৫ জন, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে ১১ জন করে এবং রংপুর বিভাগে ৬ জন রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মব করে হত্যার কোনো ঘটনার মামলারই বিচার এখনো হয়নি। বেশির ভাগ মামলার অভিযোগপত্রই দেওয়া হয়নি। যেগুলোর অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিচারেও গতি নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের গেস্ট ফ্যাকাল্টি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মশিউর রহমান সবুজ আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিচার বিলম্বিত হওয়ার কারণে অনেকে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন। এ জন্য যেকোনো অপরাধের বিচার উপযুক্ত সময়ে শেষ করা দরকার। মবের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। মব-সহিংসতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে আইনের শাসন ব্যাহত হবে। তাই মবের ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; যাতে অন্যরা এ রকম অপরাধ করতে সাহস না দেখায়। এ ছাড়া মবের ঘটনার বিচার অবশ্যই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করা উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাসহ মবে প্রাণহানির ঘটনায় হাইকোর্টে রিট করেছিলেন আসকের আইনজীবী মো. শাহিনুজ্জামান। রিটে মবের ঘটনাগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং মব বন্ধে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল। ওই রিটের শুনানি হলেও কোনো আদেশ দেননি হাইকোর্ট।

শাহিনুজ্জামান বলেন, মবের ঘটনায় বিচারহীনতা এবং মব-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে অহরহ মব-সন্ত্রাস ঘটছে। এমন ঘটনা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি মবের মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত