Ajker Patrika

বাজারে নতুন টাকার আকাল

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা
বাজারে নতুন টাকার আকাল
ফাইল ছবি

বাজারে সব ধরনের নোটে নতুন টাকার বড় আকাল। বিপরীতে ছেঁড়া-ফাটা, ফুটো ও নোংরা অকার্যকর নোটে এখন বাজার সয়লাব। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় নিয়মিত নতুন নোট ছাড়ছে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বাজারে সরবরাহ কম। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে খুচরা নোটের সংকট। দৈনন্দিন লেনদেনে ১০০, ২০ ও ১০ টাকার নোটের অভাব সবচেয়ে বেশি টের পাচ্ছেন ব্যাংকের গ্রাহক, বাজারে দোকানি ও ক্রেতারা।

পরিস্থিতি এমন যে ব্যাংক থেকে টাকা তুলেও অনেক সময় খুচরা নোট মিলছে না। এটিএম বুথে ভোগান্তি আরও বেশি। ২০ হাজার টাকা তুললেও ৫০০ টাকার নোট পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। কোনো কোনো বুথে ১৯টি ১০০০ টাকার নোটের সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে দুটি ৫০০ টাকার নোট। ফলে টাকা হাতে নিয়েও খুচরা ভাঙাতে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছুটতে হচ্ছে।

এদিকে বাজারে যে নোট ঘুরছে, তার বড় অংশ পুরোনো, ছেঁড়া-ফাটা, ফুটো ও নোংরা। ৫০০-১০০০ টাকার নোটেও স্ট্যাপলারের বড় ফুটো, স্কচটেপ মারা, ছেঁড়া অংশ ও ময়লা দেখা যাচ্ছে। অনেক দোকানি এসব নোট নিতে চান না। মেট্রোরেলের টিকিট কাটার মেশিন কিংবা ব্যাংকের ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিনেও পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত নোট অনেক সময় বাতিল হয়ে যাচ্ছে। ফলে এক হাতে পাওয়া টাকা অন্য হাতে দেওয়ার সময় নতুন ঝামেলা তৈরি হচ্ছে।

মগবাজারে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি সিআরএমে সম্প্রতি ৫০ হাজার টাকা জমা দিতে গিয়ে মো. আলী আহম্মদের ১৫টি নোট বাতিল হয়। তিনি বলেন, পাশের ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছেন; কিন্তু মেশিন টাকা নেয়নি। অথচ বাবার চিকিৎসার জন্য সেদিনই বাড়িতে টাকা পাঠানোর প্রয়োজন ছিল।

শুধু গ্রাহক নন, ব্যবসায়ীরাও একই সমস্যার কথা বলছেন। তাঁদের ভাষায়, ১০০, ২০ ও ১০ টাকার নোট হাতে না থাকলে ছোটখাটো কেনাকাটার টাকা ফেরত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যাংক থেকেও এখন অনেক ক্ষেত্রে খুচরা নোট চাওয়া অনুযায়ী পাওয়া যায় না। ফলে দোকানিদের খুচরা টাকা জোগাড় করা আলাদা কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, নতুন নোট ছাপাতে ব্যয় রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন টাকা ছাপাতে ব্যয় হয়েছে ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। আগের অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ২৩৪ কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। এক বছরে ব্যয় বেড়েছে ২২৪ কোটি টাকা বা ৯৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ। গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ ব্যয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে নোট মুদ্রণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ২৩৫ কোটি টাকায় নেমেছিল। এক বছর পর তা প্রায় ৪৫৯ কোটি টাকায় উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসংবলিত পুরোনো নকশার নোট ছাপানো ও বাজারে ছাড়া বন্ধ হয়ে যায়। নতুন নকশার নোট তৈরি, অনুমোদন ও ছাপানোর প্রক্রিয়ায় সময় লাগায় বাজারে নতুন নোটের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ১০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার নতুন নোট বাজারে ছাড়া হয়েছে। তবে ২০ ও ৫০ টাকার নোটের কাঁচামাল সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। নোট ছাপানোর খরচও বেড়েছে। সর্বত্র ডিজিটাল লেনদেন চালুই হতে পারে এর কার্যকর সমাধান। তাই বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এর বিস্তার বাড়লে নগদ টাকার চাহিদা ও ব্যবহার দ্রুত কমবে বলে মনে করেন তিনি।

বাস্তবতা হলো, দেশে এখনো দৈনন্দিন কেনাকাটা ও ছোট লেনদেনে নগদের ওপর নির্ভরতা বেশি। এ পরিস্থিতিতে নতুন ও ভালো মানের নোট এবং খুচরা টাকার সরবরাহ একসঙ্গে স্বাভাবিক না হলে মানুষের ভোগান্তি কমবে না বলে মনে করেন ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নোট ছাপাতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কাগজ, বিশেষ কালি, নিরাপত্তা সুতা ও বিভিন্ন রাসায়নিকের প্রায় পুরোটা বিদেশ থেকে আনতে হয়। কাঁচামাল দেশে আসার পরও নোট ছাপাতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে। সীমিত সক্ষমতার কারণে টাঁকশালেও একসঙ্গে চাহিদামতো নোট ছাপানো সম্ভব হয় না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর কাঁচামাল, পরিবহন ও ডলারের দাম বাড়ায় এই ব্যয় আরও বেড়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত