Ajker Patrika

১৮০ দিনের পরিকল্পনা: সড়কে স্বস্তি ফেরাতে উদ্যোগী সরকার

  • নারীদের জন্য রাজধানীর ৮ রুটে চালু হবে ৯টি ‘পিংক বাস’
  • বিধি লঙ্ঘনে চালকের লাইসেন্স পয়েন্ট কাটার ব্যবস্থা হবে।
  • দূষণ নিয়ন্ত্রণে ৪০০ বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
১৮০ দিনের পরিকল্পনা: সড়কে স্বস্তি ফেরাতে
উদ্যোগী সরকার
ফাইল ছবি

বিশ্বমানের বহু মাধ্যমভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা গড়তে জাতীয় সমন্বিত পরিবহন মহাপরিকল্পনার জন্য পর্যালোচনা, কৌশলগত রোডম্যাপ ও পরিবহন চাহিদার মডেল প্রণয়ন করা হবে। সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে আইনভঙ্গকারী চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটার ব্যবস্থা চালু করা হবে। নারীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় গণপরিবহন নিশ্চিত করতে রাজধানীতে শুধু নারী যাত্রীদের জন্য চালু হবে ‘পিংক বাস’। সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সড়ক পরিবহন এবং মহাসড়ক বিভাগ যে পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেছে এগুলো তারই অংশ।

বিএনপি গত মধ্য ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রত্যেক মন্ত্রণালয়কে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ তাদের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও নীতিগত বিভিন্ন বিষয়।

রাজধানীতে নারীদের বিশেষ বাসের বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে ৮টি রুটে ৯টি বাস চালু করা হবে। সেখানে নারীরাই চালক ও সহকারী হিসেবে কাজ করবেন। এ লক্ষ্যে নারী চালকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনতে বহুদিন ধরে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এ বিষয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। এবার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় এ নিয়ে আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকার বিদ্যমান ২১ ও ২৬ নম্বর রুটে নতুন বাস সংযোজনের পাশাপাশি নতুন বাস রুট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম ও খুলনা মহানগরে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিআরটিসির বহরে নতুন বাস যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গাড়ি পার্কিং তথা যানজট সমস্যার সমাধানে বিকল্প পার্কিং স্থান নির্বাচন এবং ঢাকার আন্তজেলা বাস টার্মিনাল ও অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ডগুলো ধাপে ধাপে শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত রোড সেফটি স্ট্র্যাটেজি প্রণয়ন করা হবে। এতে অবকাঠামো উন্নয়ন, আইন প্রয়োগ, যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ, চালক প্রশিক্ষণ এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় রয়েছে। নতুন বা সংশোধিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন এবং জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া গণপরিবহনে জিপিএস ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, অনুমোদিত রুটে চলাচল নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনাস্থল দ্রুত শনাক্ত ও উদ্ধার কার্যক্রমের উন্নয়নে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হবে।

গাড়ির মালিকানা হস্তান্তর প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করা এবং যানের অতীতের সব তথ্য বিআরটিএ-আইএসে হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিআরটিসির যানবাহনে ভিটিএস ট্র্যাকিং আপডেট ও মনিটরিং জোরদার করা হবে। পর্যায়ক্রমে সব যানবাহনকে বিমার আওতায় আনা হবে। হালনাগাদ করা হবে মোটরযানের এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা।

পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত প্রকল্পের মাধ্যমে ৩০ হাজার চালক এবং ৬ হাজার পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ধর্মীয় নেতা, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিনিধিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া ‘বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট’-এর আওতায় পর্যায়ক্রমে ৪০০ বৈদ্যুতিক বাস কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

যানজট নিরসনে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) ব্যবস্থার আওতায় গাড়ির নিবন্ধন বর্তমানের ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সহায়তার জন্য নতুন করে আরও একটি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং তিনটি ব্যাংককে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে চালু থাকা ১০টি সড়ক ও সেতুর পাশাপাশি এ সেবা বাড়িয়ে ১৫টিতে নেওয়া হবে।

অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৪১টি আন্ডারপাস, ফ্লাইওভার ও ইন্টারচেঞ্জের নকশা করা হবে। মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-৫ (নর্দার্ন রুট) ও এমআরটি লাইন-১-এর সংশোধিত ডিপিপি প্রণয়ন করা হবে।

পরিবেশবান্ধব যান সাইকেল চালানোর ক্ষেত্রেও কিছু প্রণোদনা রাখা হয়েছে পরিকল্পনায়। এর মধ্যে রয়েছে মেট্রোরেল স্টেশনকেন্দ্রিক রাইড শেয়ারিং সাইকেল সেবা চালুর উদ্যোগ। এর আওতায় উত্তরা এলাকায় ৬টি সাইকেল স্ট্যান্ড নির্মাণ ও ১৫০টি সাইকেল সরবরাহ করা হবে। প্রায় ৬ কিলোমিটার সাইকেল লেন তৈরি করা হবে।

গণপরিবহনের মানোন্নয়নে কন্ডাক্টর ও সুপারভাইজরদের বিআরটিএ থেকে লাইসেন্স দেওয়া হবে। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৫ হাজার কর্মীকে এই লাইসেন্স দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী ও ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য মেট্রোরেল ও দূরপাল্লার পরিবহনে বিশেষ ভাড়া ছাড় চালুর নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এ ছাড়া আড়াই হাজার পরিবহন শ্রমিককে ইউনিফর্ম সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে থাকবে গ্রীষ্ম ও শীতকালীন পোশাক ও জুতা।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। ইশতেহারের আলোকে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মনিটরিং কমিটিও গঠন করা হয়েছে।’

সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য চাইলে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পরিকল্পনাটি ইতিবাচক। তবে বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। যাঁরা এগুলো বাস্তবায়ন করবেন, তাঁদের মধ্যে আগে সংস্কার দরকার। কারণ এর আগেও এসব পরিকল্পনা বিভিন্নভাবে ছিল। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। যেমন লাইসেন্সের পয়েন্ট কর্তন, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ইটিসি। এগুলো কেন বাস্তবায়ন হয়নি? এর কারণ চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে এগোলে আর এসব পরিকল্পনা হোঁচট খাবে না।’

মো. হাদিউজ্জামান বিশেষ করে নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ ও সাইকেল সেবাকে ভালো উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া তিনি কার্যকর সমন্বয় ও নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেন।

সৌন্দর্যবর্ধন কাজের অংশ হিসেবে জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়কের দুই পাশে এবং সওজের বিভিন্ন স্থাপনা-সংলগ্ন খালি জায়গায় ৩ লাখ বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পরিকল্পনায় গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম-খুনের শিকার শহীদদের স্মরণে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনার নামকরণের উদ্যোগ রাখা হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত