Ajker Patrika

আগের লক্ষ্য অধরা, এরপরও ৩০০ প্রকল্পের মহাপরিকল্পনা

  • মিটারগেজ লাইন রূপান্তরের লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
  • পূর্বাঞ্চলে ৮০ শতাংশের বেশি মিটারগেজ।
  • কনটেইনার পরিবহন বৃদ্ধি ও ভাড়া সমন্বয়ের পরিকল্পনা।
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
আগের লক্ষ্য অধরা, এরপরও ৩০০ প্রকল্পের মহাপরিকল্পনা

আগের দুটি মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য অধরা থেকে গেলেও নতুন ৩৫ বছর মেয়াদি তৃতীয় মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ২০২৬ থেকে ২০৬০ সাল পর্যন্ত মেয়াদের এই পরিকল্পনায় রয়েছে ৩২০টি প্রকল্প। লাইন মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে রূপান্তর, নতুন ও ডাবল লাইন স্থাপন, আধুনিক সিগন্যাল, নতুন রোলিং স্টক, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো এবং মালামাল পরিবহন বাড়ানোর মতো বড় পরিকল্পনা রয়েছে এতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলওয়ের উন্নয়নে করণীয় অনেক কিছু থাকলেও আগের পরিকল্পনার মৌলিক লক্ষ্যও যদি বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে নতুন পরিকল্পনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

গতকাল সোমবার রেল মন্ত্রণালয়ে রেলসচিবের সভাপতিত্বে ২০২৬ থেকে ২০৬০ সাল মেয়াদি নতুন খসড়া মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। খসড়া মাস্টারপ্ল্যানটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে এ সভা হয়।

এর আগে ২০১০-২০৩০ মেয়াদের প্রথম মাস্টারপ্ল্যানে ২৩৫টি এবং ২০১৬-২০৪৫ মেয়াদের দ্বিতীয় মাস্টারপ্ল্যানে ২৩০টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় পরিকল্পনার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। সেই পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন মাস্টারপ্ল্যান করা হচ্ছে।

নতুন মাস্টারপ্ল্যানে নেওয়া ৩২০ প্রকল্পের মধ্যে প্রকৌশল বিভাগের ১১৮টি, রোলিং স্টক বিভাগের ৮৫টি, সিগন্যাল বিভাগের ৭৯টি এবং ট্রাফিক বিভাগের ৩৮টি প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পগুলো বিভিন্ন ধাপে অগ্রাধিকার অনুযায়ী বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

২০৪৫-এর লক্ষ্যই অধরা

দ্বিতীয় মাস্টারপ্ল্যানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ২০৪৫ সালের মধ্যে দেশের সব মিটারগেজ রেলপথ ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা। নতুন পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এ লক্ষ্য পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। তাই এতে ২০৬০ সাল পর্যন্ত মিটারগেজের রোলিং স্টক রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ২০০৭ সালে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে চুক্তিতে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করিডরগুলো মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে রূপান্তরের অঙ্গীকার করে। পরে দেশের রেল নেটওয়ার্কের গেজ পর্যায়ক্রমে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ব্রডগেজ লাইনে বেশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের উপযোগী ইঞ্জিন ও কোচ ব্যবহার করা যায়। এ লাইন বেশি প্রশস্ত বলে তা অপেক্ষাকৃত দ্রুতগতি ও স্থিতিশীল ট্রেন চলাচলের উপযোগী। দ্বিতীয় মাস্টারপ্ল্যানে ২০২০ সালের পর মিটারগেজ লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) না কেনার পরিকল্পনাও ছিল।

নতুন মাস্টারপ্ল্যানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ রেলের মোট রুট ৩ হাজার ৩৫৫ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে মিটারগেজ ১ হাজার ৫৮৬ দশমিক ২ কিলোমিটার, ব্রডগেজ ১ হাজার ৪০ দশমিক ৯৮ কিলোমিটার এবং ডুয়েলগেজ ৭২৮ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ পূর্বাঞ্চলের ১ হাজার ৪৮৬ দশমিক ৯২ কিলোমিটার রুটের মধ্যে ১ হাজার ২০৭ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার অর্থাৎ ৮০ শতাংশের বেশিই মিটারগেজ।

নতুন পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, পূর্বাঞ্চলে মিটারগেজ লোকোমোটিভের ঘাটতির কারণে ট্রেন পরিচালনাও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নতুন পরিকল্পনায় গেজ রূপান্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্রডগেজ রোলিং স্টক সংগ্রহের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মিটারগেজ রোলিং স্টক রাখার কথা বলা হয়েছে।

পুরোনো রোলিং স্টকে ধুঁকছে রেল

গেজ সংকটের পাশাপাশি রেলের বড় সমস্যা পুরোনো রোলিং স্টক। নতুন মাস্টারপ্ল্যানে বলা হয়েছে, বর্তমান বহরের বড় অংশই ২০-৩০ বছরের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পার করেছে। এতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

রোলিং স্টক রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতাও প্রয়োজনের তুলনায় কম। রেলের তিনটি বড় ওয়ার্কশপে পর্যাপ্ত জায়গা, সহায়ক যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা নেই। বিভিন্ন ওয়ার্কশপে ২০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত জনবল ঘাটতি রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এই ঘাটতি ৪৪-৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।

প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ সময়মতো না পাওয়া এবং অচল রোলিং স্টক বাতিলের ধীর প্রক্রিয়াও সমস্যা বাড়াচ্ছে। এসব সমাধানে ওয়ার্কশপ আধুনিকায়ন, নতুন যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। রেলের গবেষণা ও উন্নয়ন ইউনিটকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

বিদ্যমান অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়াতে সিগন্যাল আধুনিকায়নে জোর দেওয়া হয়েছে। পুরোনো মেকানিক্যাল সিগন্যালের বদলে কালার লাইট সিগন্যাল, কম্পিউটারভিত্তিক ইন্টারলকিং, সেন্ট্রালাইজড ট্রাফিক কন্ট্রোল, অটোমেটিক ট্রেন প্রোটেকশন ও ট্রেন সুপারভিশন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। মাস্টারপ্ল্যানে বলা হয়েছে, আধুনিক সিগন্যালে বড় অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াই লাইনের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। লাইনের মান ও ত্রুটি শনাক্তেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।

আয় কম, ব্যয় বেশি

রেলের অবকাঠামোগত সংকটের সঙ্গে আর্থিক দুর্বলতাও প্রকট। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে রেলের গড় অপারেটিং রেশিও প্রায় ২১০ শতাংশ। অর্থাৎ পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় আয় অনেক কম। আবার মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যয় বাড়লেও ২০১২ সালের পর রেলের ভাড়া সেভাবে বাড়ানো হয়নি। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে ভাড়া সমন্বয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

রেলের আয় বাড়াতে মালামাল পরিবহনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কনটেইনার পরিবহনে রেলের বাজার অংশ প্রায় ৩ শতাংশ। নতুন পরিকল্পনায় আগামী আট বছরে কনটেইনার পরিবহন দ্বিগুণ করে বাজার অংশ অন্তত ১৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে বছরে ১ কোটি ৮০ লাখ টন পর্যন্ত মালামাল পরিবহনের সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য রেলকে শুধু টার্মিনালভিত্তিক পরিবহনকারী না রেখে পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিকস সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ধীরাশ্রম আইসিডি, উত্তরা ইপিজেড ও বেনাপোল আইসিডিকে কাজে লাগিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে পণ্য পরিবহন বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। যাত্রী পরিবহনে বছরে ৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

পরিকল্পনার পেছনে সরকারি ভাবনা

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রেলের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কারিগরি বিষয়সহ নানা কারণে সময় লাগে। বর্তমানে আমাদের রেল নেটওয়ার্কে নতুন লাইন নির্মাণের পাশাপাশি ডুয়েলগেজ ও ব্রডগেজ সম্প্রসারণের কাজও চলছে। কাজের বর্তমান অগ্রগতি পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, ২০৪৫ সালের মধ্যে মিটারগেজ রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জন করা কিছুটা উচ্চাভিলাষী। তাই নতুন পরিকল্পনায় বিষয়টি বাস্তবতার আলোকে আরও ব্যাখ্যা ও সমন্বয় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার এবং পাঁচ বছর মেয়াদি “স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট”-এর সঙ্গে পরিকল্পনাটি সমন্বয় করা হচ্ছে।’

বাস্তবায়নই বড় প্রশ্ন

নতুন মাস্টারপ্ল্যানে ৩২০টি প্রকল্প থাকলেও বড় প্রশ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে। আগের দুই পরিকল্পনায় গেজ রূপান্তরের মতো মৌলিক লক্ষ্যও সময়মতো বাস্তবায়ন হয়নি। অর্থায়ন, জমি অধিগ্রহণ, জনবল ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাটাতে না পারলে এই মাস্টারপ্ল্যানও কাগজে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা।

বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, মাস্টারপ্ল্যানের পর মাস্টারপ্ল্যান হচ্ছে, কিন্তু আগের পরিকল্পনার মৌলিক লক্ষ্যই যদি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে নতুন পরিকল্পনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শুধু ৩২০টি প্রকল্পের তালিকা করে রেলের সমস্যার সমাধান হবে না। কোন প্রকল্প কেন নেওয়া হচ্ছে, কত দিনে এবং কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আগের পরিকল্পনার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা না নিলে এই মাস্টারপ্ল্যানও কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা আছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত