Ajker Patrika

স্বৈরাচার গেছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আসেনি: মতিউর রহমান

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ২১: ৪৬
স্বৈরাচার গেছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আসেনি: মতিউর রহমান
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পতন হলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র ধর্মঘটে অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, ৬৪ বছর পরও তাঁকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য দাবি জানাতে হচ্ছে।

আজ রোববার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের দ্বিতীয় দিনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিষয়ক নির্ধারিত বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) তিন দিনের ওই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে। আগামীকাল সোমবার সম্মেলনটি শেষ হবে।

প্রায় ১৫ মিনিটের বক্তৃতার শুরুতেই মতিউর রহমান ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারির স্মৃতি তুলে ধরেন। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়েছিল। বিভিন্ন দাবির মধ্যে ছিল কথা বলার অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। প্রথম আলোর সম্পাদক বলেন, ‘সেই বিক্ষোভে আমি নিজেও অংশ নিয়েছিলাম। এরপর বহু আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালেও মূল বিষয়গুলো একই জায়গায় থেমে আছে। দুঃখ হলো—সে দাবিতে এখনো আমাদের কথা বলতে হয়।’

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতনকে মতিউর রহমান অবিশ্বাস্য ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে প্রায় ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকার দেশবাসীকে অনেকটা হতাশ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের কিছু উদ্যোগ বেশি দূর এগোয়নি, কোনো কোনো কমিশনের প্রস্তাব আলোর মুখই দেখেনি।

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন ছিল উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, ওই সময় নানা চাপ ও ভয়ের মুখে বেশ কিছু সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের মালিকানা বদলেছে, অনেক সম্পাদকের জায়গায় নতুন কেউ এসেছেন আর অনেক সাংবাদিককে কাজ ছাড়তে হয়েছে।

প্রথম আলোর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মতিউর রহমান বলেন, পুরো সময় ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হয়েছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপ ও হুমকি ছিল। দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশ থেকে বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার চালানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলোর অফিসের সামনে প্রায় সাত দিন বিক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়েছে বলে জানান তিনি।

২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রায় সারা রাত প্রথম আলোর কার্যালয়ে আগুন জ্বলেছে, লুটপাট হয়েছে। মতিউর রহমানের অভিযোগ, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী সময়মতো ও যথেষ্ট শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসেনি। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তাদের সরাসরি কঠোর নির্দেশ দেননি। এরপর ডেইলি স্টারের কার্যালয়ও অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার একটি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। ওই কমিশনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবে সাংবাদিক, সম্পাদক ও পরিচালকদের মধ্যে ইতিবাচক ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু সরকার তা বাস্তবায়নে ‘সামান্যতম’ উদ্যোগও নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শেখ হাসিনার শাসনকালে স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ ভীষণ সংকুচিত ছিল বলে জানান মতিউর রহমান। তিনি বলেন, সাংবাদিক ও সম্পাদকদের জেলে যেতে হয়েছে, অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। প্রথম আলোর সার্কুলেশন কমানোর চেষ্টা হয়েছে, সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয়েছে। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ৫০টি দেশি-বিদেশি বড় কোম্পানির বিজ্ঞাপনও বন্ধ করা হয়েছিল। তাঁর নিজের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ৮০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছিল। এর মধ্যে কিছু মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে।

২০২৪ সালের শুরুর দিকে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রথম আলোর মালিকানা ছেড়ে দিতে কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছিল বলেও জানান মতিউর রহমান। তিনি বলেন, এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল সম্পাদককে সরানো এবং মালিকানা একটি অর্থ পাচারকারী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া। এসব শেখ হাসিনার নির্দেশেই হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ভালো নির্বাচন বলে উল্লেখ করেন মতিউর রহমান। এতে বিএনপি প্রায় ১৯ বছর পর ক্ষমতায় এসেছে। তিনি জানান, ১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-০৬ সালে বিএনপির দুই আমলে তিনি প্রথমে ভোরের কাগজ ও পরে প্রথম আলোর সম্পাদক ছিলেন। তখন সরকারের অনেক নীতির কঠোর সমালোচনা করেও কোনো হয়রানি বা আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়তে হয়নি। খালেদা জিয়ার সঙ্গে উচ্চস্বরে তর্কও হয়েছে, কিন্তু সে জন্য শাস্তি পেতে হয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তখন তর্কবিতর্ক হয়েছে।

অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকেই মতিউর রহমান বিএনপি সরকারের কাছে প্রত্যাশার কথা জানান। তিনি বলেন, বিএনপির ৩১ দফার ১১ নম্বরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে মিডিয়া কমিশন গঠনের কথা আছে। নির্বাচনী ইশতেহারেও নির্ভীক সাংবাদিকতার সুরক্ষা ও সাংবাদিক নির্যাতনবিরোধী বিশেষ সেল গঠনের মতো প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনাও হয়েছে বলে জানান তিনি।

‘নইলে আমরা পিছিয়ে পড়ব’

মতিউর রহমান বলেন, প্রতিশ্রুতির পর এখনো সংস্কারে তেমন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। মিডিয়া কমিশন গঠন নিয়ে একটি মতবিনিময় বৈঠকের পর আর কিছু শোনা যায়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ও পুরোনো বিল পরিশোধেও অগ্রগতি নেই বলে জানান তিনি।

প্রথম আলোর সম্পাদক আরও বলেন, কিছু পত্রিকা ও টেলিভিশনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তনের কথা শোনা গেছে। কোনো কোনো সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অনিশ্চয়তা ও চাপের কথা বলছেন, সংবাদ ও মতামত প্রকাশে স্বনিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কিছু প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বক্তব্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

সরকার মাত্র সাত মাস পার করেছে ও হাতে অনেক সময় আছে, এ কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রথম আলোর সম্পাদক বলেন, ‘দল ও সরকারকে এখনই সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমের জরুরি কাজগুলো শুরু করতে হবে, নইলে আমরা পিছিয়ে পড়ব।’

মতিউর রহমান বলেন, ‘আমার সেই ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সালের কথা বারবার মনে পড়ে যায়। সেদিন আমরা দাবি তুলেছিলাম—কথা বলার অধিকার দিতে হবে; সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিতে হবে। নানা আন্দোলন ও সংগ্রামের মুখে বারবার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যাচ্ছে, কিন্তু মূল বিষয়গুলো আগের জায়গাতেই স্থবির হয়ে আছে। দুঃখ হলো—সে দাবিতে এখনো আমাদের কথা বলতে হয়। দাবি জানাতে হয়।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত