Ajker Patrika

ছয় বছরে ৩ ফসলি জমি কমেছে ৭০০ একর

  • জমির শ্রেণি পরিবর্তন, উপেক্ষিত ভূমি সুরক্ষা আইন। ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের।
  • বাড়ি, দোকানপাটের পাশাপাশি জমির উপরিভাগের মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়।
মাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজার
ছয় বছরে ৩ ফসলি জমি কমেছে ৭০০ একর
কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে স্থাপনা। গত সোমবার মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের কামদপুর এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

আমন ফসল ঘরে তোলার পর শুষ্ক মৌসুমে অনেক কৃষক বোরো ধান চাষের জন্য জমিতে হালচাষ করছেন, কেউ আবার চারা রোপণ করছেন। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার-ভানুগাছ সড়কের পাশে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ভিন্ন দৃশ্য। তিন ফসলি কৃষিজমি ভরাট করে সড়কের পাশের জমিতে অনেকে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ করছেন।

এই চিত্র শুধু পতনঊষার-ভানুগাছ সড়কের পাশের নয়, জেলার সব স্থানে এমন ঘটনা ঘটছে। গত ৬ বছরে প্রায় ৭০০ একর কৃষিজমি কমেছে এ জেলায়।

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজারে কয়েক বছর ধরে ব্যাপকভাবে কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে উঠছে বিভিন্ন স্থাপনা। সময় যত যাচ্ছে, ততই দৃশ্যমান পাকা ভবনের সংখ্যা বাড়ছে। প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে গড়ে তোলা স্থাপনা তৈরি শহর থেকে শুরু করে গ্রামীণ সড়কের পাশেই ঘটছে। এসব স্থাপনা নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভার কাছে অনুমতি নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে কেউ এসবের পরোয়া করে না। উপেক্ষিত রয়ে যাচ্ছে ভূমি সুরক্ষা আইন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জেলার সাতটি উপজেলাসহ হাকালুকি, হাইল, কাউয়াদিঘী হাওরের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি ভরাটের মহোৎসব চলছে। কয়েক বছর আগেও যেসব জমিতে তিন ফসল হতো, সেসব এখন ভরাট হয়ে গেছে। এসব জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে বসতঘর, দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এতে একদিকে কমছে ফসলি জমি, অন্যদিকে ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের।

এ ছাড়া অনেক জমির মালিক অল্প কিছু টাকার জন্য জমির ওপরের স্তরের মাটি কেটে বিক্রি করছেন বিভিন্ন ইটভাটার মালিকদের কাছে। ভূমি ব্যবহার ও সেচ পরিসংখ্যান জরিপ সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭০০ একর কৃষিজমি কমেছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, ফসলি জমি ভরাট করে বাড়িঘর, দোকানপাট নির্মাণ ও জমি ভরাট করে ফেলে রাখা হয়েছে।

আইন অনুসারে, ব্যক্তিমালিকানাধীন বা যেকোনো জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট পৌরসভা, উপজেলা প্রশাসন বা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমতি নিতে হবে। সড়কের পাশে বাড়িঘর নির্মাণ করা হলে অবশ্যই জায়গা রেখে স্থাপনা তৈরি করতে হবে।

কৃষিজমিতে নানা স্থাপনা গড়ে তোলা ব্যক্তিদের মতে, এখন জমিতে কৃষি চাষ করে লাভ হয় না। এর চেয়ে জমি ভরাট করে দোকান বা বাসাবাড়ি নির্মাণ করলে একদিকে জমির দাম বাড়ে, অন্যদিকে ভাড়া পাওয়া যায়। এ ছাড়া অনেকের আগে পরিবারের সদস্যসংখ্যা কম ছিল, যা এখন বেড়েছে। এ জন্য অনেকে নতুন বাড়িঘর নির্মাণ করছেন।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নূরুল মুহাইমিন মিল্টন বলেন, ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন থাকলেও এর কোনো কার্যকর প্রয়োগ নেই আমাদের দেশে। এই আইন অল্প পরিসরে বাস্তবায়িত হলেও কিছুটা কৃষিজমি রক্ষা করা যেত। যেভাবে জমি ভরাট করা হচ্ছে, তাতে করে একসময় খাদ্যের অভাব দেখা দিতে পারে। সময় যত যাচ্ছে, কৃষিজমি ভরাটের প্রবণতা বাড়ছে। যে যার ইচ্ছেমতো এই কাজ করছে।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন বলেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কৃষিজমি ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। অনেকের পরিবার বড় হয়েছে, এ জন্য নতুন করে ঘরবাড়ি নির্মাণের প্রয়োজন হচ্ছে। আমাদের সবাইকে মিলে কৃষিজমি রক্ষা করে স্থাপনা তৈরি করতে হবে। আমাদের দেশে কৃষিজমি ভরাটের বিষয়ে আইন হলো, স্থাপনা নির্মাণের আগে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। তবে এই আইন কেউ মানতে চান না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত