Ajker Patrika

উদ্বোধন কাল

জুলাই স্মৃতি জাগ্রত রাখবে গণভবনের জাদুঘর

শরীফ নাসরুল্লাহ, ঢাকা
জুলাই স্মৃতি জাগ্রত রাখবে গণভবনের জাদুঘর
জুলাই আন্দোলনের নানা ঘটনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে। এই আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মাণ করা হয়েছে ভাস্কর্য। আগামীকাল বুধবার এটি উদ্বোধন হওয়ার কথা। রাজধানীর গণভবনে। ছবি: আজকের পত্রিকা

কয়েকবার তারিখ পেছানোর পর ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বাসভবন গণভবনে গড়ে তোলা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের দ্বার খুলছে। অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের দিন ৫ আগস্টই এর উদ্বোধন হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে অভ্যুত্থানের এবারের বর্ষপূর্তির মধ্যেই জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হবে বলে অঙ্গীকার করা হয়েছিল।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর) দীপংকর বিশ্বাস আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘৫ আগস্ট জুলাই জাদুঘর উদ্বোধন হচ্ছে এটা নিশ্চিত। যাবতীয় প্রস্তুতি চলছে।’

ইতিমধ্যে জাদুঘর পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। জুলাই জাদুঘরের নতুন মহাপরিচালক নিযুক্ত হয়েছেন ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হবে। টিকিট কেটে জাদুঘরে প্রবেশ করতে হবে।

জুলাই জাদুঘরের জনবল নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক ওঠায় কিছুদিন আগে বাতিল হয় এর প্রক্রিয়া। এটি উদ্বোধনে দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ।

জাদুঘরের পর্ষদ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘জনবল নিয়োগ হয়নি। উদ্বোধন হওয়ার পরে জনবল নিয়োগ হবে। আপাতত আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ চলবে। পাশাপাশি যুক্ত থাকবে জাতীয় জাদুঘরের কিছু জনবল।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাস্তায় নেমে এসেছিল ছাত্র-জনতা। বিপুল গণরোষের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনের শেষ দিন ৫ আগস্ট দুপুরের দিকে ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করেন। এরপর ক্ষুব্ধ জনতার স্রোত ঢুকে পড়ে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত গণভবনে। তাদের ক্ষোভের জেরে এত দিন কঠোর নিরাপত্তায় সুরক্ষিত থাকা ভবনটির সীমানাপ্রাচীর ও ভেতরের অনেক কিছু ধ্বংস হয়। উত্তেজিত জনতার একাংশ ভবনটি থেকে কিছু সামগ্রী নিয়েও যায়। এসব জিনিসপত্রের কিছু কর্তৃপক্ষ পরে উদ্ধার করে। আবার অনেকে স্বেচ্ছায় ফিরিয়ে দিয়ে যান।

জানা গেছে, জাদুঘরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের বিবরণ, ভুক্তভোগীদের স্মৃতি ও স্মারক, জুলাই শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী, গণভবনে পাওয়া নথিপত্র, ঐতিহাসিক স্মারক ও শিল্পকর্ম থাকবে। এ ছাড়া আছে তিন দিকে সম্প্রসারিত লেক, ফুডকোর্ট, প্রার্থনাকক্ষ, প্রক্ষালনকক্ষ, স্যুভেনিরের দোকান, ২২টি সেল নিয়ে তৈরি প্রতীকী আয়নাঘরের কাঠামো। জুলাই আন্দোলন, শাপলা চত্বর ট্র্যাজেডি, বিডিআর বিদ্রোহ ইত্যাদিসহ গুম-খুনের শিকার প্রায় চার হাজার মানুষের নাম ও স্মৃতি সংরক্ষণে কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে জাদুঘরে। তৈরি করা হয়েছে আড়াই হাজারের বেশি প্রতীকী কবর। থাকবে বিভিন্ন বিষয়বস্তুর ওপর প্রামাণ্যচিত্র দেখার ব্যবস্থা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে। এরপর গণভবনে ভাঙচুর চালায় হাজারো মানুষ। ফাইল ছবি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে। এরপর গণভবনে ভাঙচুর চালায় হাজারো মানুষ। ফাইল ছবি

শেখ হাসিনার টানা প্রায় ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছিল গণভবন। উন্মুক্ত স্থান, লেকসহ এর আয়তন প্রায় ১৮ একর। ১৯৭৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও সচিবালয় হিসেবে গণভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে শেখ হাসিনা ছাড়া দেশের আর কোনো প্রধানমন্ত্রী সেখানে বাস করেননি। ২৯ হাজার বর্গফুট আয়তনের দোতলা ভবনটিতে পরিবার নিয়ে থাকতেন শেখ হাসিনা।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের তিন দিন পর গঠিত ড. মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার পরের মাসেই গণভবনকে আন্দোলনের স্মৃতিবাহী জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ বিষয়টি নীতিগতভাবে অনুমোদনের পর জাদুঘর-বিষয়ক অধ্যাদেশ জারি করে। নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করার পর গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল পাস হয়।

জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্র-জনতা এবং সংস্কৃতিকর্মীরা জাদুঘর উদ্বোধনের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, এ জাদুঘর পরিদর্শন করে রক্তঝরা এ আন্দোলন সম্পর্কে মানুষ অনেক কিছু জানতে পারবে। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে আন্দোলনে পথে নামা, আহত, শহীদ পরিবারসহ হাজারো মানুষের আবেগ।

‘শুধু জাদুঘর নয়’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই এবং জাদুঘরের পর্ষদ সদস্য মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, ‘এটা শুধু জাদুঘর নয়, ১৭ বছরের অত্যাচার-অবিচারের ইতিহাস। অবশেষে খুলতে যাচ্ছে এটা স্বস্তির খবর। ১৭ বছরের যে অন্যায়-অবিচারের চিত্র, তা মানুষ নিজের চোখে দেখে উপলব্ধি করতে পারবে। এই জাদুঘর থেকে শিক্ষা নিয়ে শাসকেরা ভবিষ্যতে দেশ পরিচালনায় কাজে লাগাতে পারবে।’

জাদুঘর নির্মাণে ওঠা বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে স্নিগ্ধ বলেন, ‘যেসব অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা আছে, সেগুলো অবশ্যই আমাদের পর্ষদে আলোচনা হবে। সামনে এ বিষয়ে কী করা যায় তা নিয়ে পর্ষদে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর গত বছরের ১৬ জুলাই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একটি বিবৃতি দেয়। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘সরকারি অর্থ ব্যয়ে ক্রয়ের ক্ষেত্রে যেভাবে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা এড়িয়ে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির যুক্তিতে কাজ দেওয়া হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

গত ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের উত্তরে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেছিলেন, ‘সুস্পষ্ট অভিযোগ পেলে এবং তা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সংস্কৃতিকর্মীদের প্রশ্ন

সংস্কৃতিকর্মীদের কেউ কেউ মনে করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য রাখা সামগ্রী ও বিষয়বস্তুর বিষয়ে জনগণ অন্ধকারে। তাঁদের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গেই এ বিষয়ে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের নেতা এবং বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান লাল্টু বলেন, ‘জুলাই জাদুঘরে আদৌ কী সংরক্ষণ করা হবে তা নিয়ে আন্দোলনে যাঁরা সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়েছে বলে জানা নেই। আমাদের কখনো এ বিষয়ে জানানো হয়নি। কিন্তু আমরা সংস্কৃতিকর্মীরা জুলাই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’

দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে মফিজুর রহমান লাল্টু বলেন, ‘বিগত তথ্য উপদেষ্টার সময়ে দুর্নীতি হয়েছে, এটা বোঝাই যায়। এ সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। এটা তাঁরা বাস্তবায়ন করছেন। কিন্তু কতটুকু কী হয়েছে এ বিষয়ে গোটা জাতি অন্ধকারে আছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত