Ajker Patrika

নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে: বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

  • ২০২৪ সাল থেকে ২০২৫ সালে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৫৩ শতাংশ
  • সহিংসতার শিকার হয়ে হত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৯ শতাংশ
‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে: বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন চিত্র-২০২৫’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে এবং এটি এখন একটি গভীর জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। গৃহ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—উভয় স্থানই নারী ও কন্যাশিশুর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষ্য-প্রমাণের দুর্বলতা এবং ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার সামাজিক প্রবণতা অপরাধীদের দায়মুক্তিকে উৎসাহিত করছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন চিত্র-২০২৫’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ সব কথা বলা হয়েছে। আজ সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সমীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের সিনিয়র প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান। তিনি জানান, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদে সংরক্ষিত ১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনার ভিত্তিতে এই সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে।

সমীক্ষায় দেখা যায়, কন্যাশিশুরা দলবদ্ধ ধর্ষণ (১৪২), আত্মহত্যা (২০৩) এবং ধর্ষণের চেষ্টা (১১৭) মামলায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে, প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা হত্যা (৭৫৬), ধর্ষণ (৩৭৬) ও যৌন হয়রানির (১২৫) ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৫ সালে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৫৩ শতাংশ এবং সহিংসতার শিকার হয়ে হত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৯ শতাংশ। পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গৃহিণীরা হত্যার ৫৮ শতাংশ, আত্মহত্যার ৬৩ শতাংশ এবং যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতার ৯৪ শতাংশের শিকার। এ ছাড়া শিক্ষার্থী কন্যাশিশুরা ধর্ষণের চেষ্টা (৮০ শতাংশ), আত্মহত্যা (৬৭ শতাংশ), দলবদ্ধ ধর্ষণ (৩৯ শতাংশ) এবং বাল্যবিবাহের (১০০ শতাংশ) ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। তিনি বলেন, ‘সমীক্ষার ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব নারী—জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নারীরা সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে ছয় থেকে নয় বছর বয়সী শিশুকন্যাদের ধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি হওয়া সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। ধর্ষণের পাশাপাশি হত্যার ঘটনাও বাড়ছে। ফলে নারী শুধু যৌন সহিংসতার শিকারই হচ্ছেন না, তাদের জীবনও ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। এটি কেবল নারীর সংকট নয়, বরং পুরো সমাজের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার সংকট।’

গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু ঘটনা প্রকাশ নয়, বরং সহিংসতার সামাজিক ও কাঠামোগত কারণও তুলে ধরা প্রয়োজন।’ একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশে সংবেদনশীল থাকার পাশাপাশি অপরাধীদের পরিচয় ও দায়ও সামনে আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ধর্ষণ, হত্যা ও এ ধরনের সহিংসতা ফৌজদারি অপরাধ। এসব ঘটনায় স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে আপসের চেষ্টা আইনসম্মত নয় এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। এ ধরনের অপরাধের বিচার অবশ্যই আদালতের মাধ্যমে হতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, জবাবদিহি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত