Ajker Patrika

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসে বাংলাদেশের ঋণমান কমতে পারে ৬ ধাপ, বাড়তে পারে ঋণের বোঝা: গবেষণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
জীববৈচিত্র্য ধ্বংসে বাংলাদেশের ঋণমান কমতে পারে ৬ ধাপ, বাড়তে পারে ঋণের বোঝা: গবেষণা
ছবিতে বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকা। ছবি: উইকিপিডিয়া

জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়কে আর্থিক বাজার ও ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলো যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় বাংলাদেশসহ বহু দেশ ভবিষ্যতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রভাব অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের সার্বভৌম ঋণমান (সভরেন ক্রেডিট রেটিং) ৪ থেকে ৬ ধাপ পর্যন্ত অবনমন হতে পারে। এতে সরকারের ঋণ গ্রহণের ব্যয় বেড়ে যাবে এবং অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত ওই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাজ্যের সাসেক্স, শেফিল্ড ও হেরিয়ট-ওয়াট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদেরা। তাঁরা বিশ্বের প্রথম ‘জীববৈচিত্র্য-সমন্বিত সার্বভৌম ঋণমান মডেল’ তৈরি করেছেন বলে দাবি করেছেন।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্যবহৃত ঋণমান নির্ধারণ পদ্ধতিগুলো পরিবেশগত অবক্ষয় ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়কে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয় না। ফলে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮৩ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের মূল্যায়নে বড় ধরনের ভুল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

গবেষকেরা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের রেটিং পদ্ধতির একটি সংশোধিত সংস্করণ ব্যবহার করে দেখিয়েছেন, পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাস্তুতন্ত্র আংশিকভাবে ভেঙে পড়লেও তার অর্থনৈতিক অভিঘাত ব্যাপক হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বন্য পরাগবাহক প্রাণী, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ এবং ক্রান্তীয় বনাঞ্চল।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, এসব বাস্তুতন্ত্রের আংশিক পতনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের উৎপাদন ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারকে ঋণের সুদ বাবদ অতিরিক্ত ১৬২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হতে পারে। সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ম্যাথিউ আগারওয়ালা বলেন, আর্থিক বাজার কার্যত প্রকৃতি-সম্পর্কিত ঝুঁকির প্রতি অন্ধ। জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে এবং দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য কমিয়ে দেয়। এর ফলে ঋণ গ্রহণের খরচ বৃদ্ধি পায় এবং সরকারি আর্থিক চাপও বাড়ে।

বাংলাদেশের জন্য কী ঝুঁকি?

গবেষণায় বিশেষভাবে বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, জীববৈচিত্র্য-সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান ৪ থেকে ৬ ধাপ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

একই ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াও। ঋণমান অবনমন হলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নিতে সরকারকে বেশি সুদ দিতে হয়। এর ফলে উন্নয়ন ব্যয়, অবকাঠামো প্রকল্প এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থায়ন আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি খাত, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বিদেশি অর্থায়ন সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ২৩টি দেশে মোট ৫৫০ কোটি মানুষের বসবাস। জীববৈচিত্র্য-সংশ্লিষ্ট এই ঋণমান অবনমন অনেক দেশকে সার্বভৌম ঋণ খেলাপির ঝুঁকির আরও কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

ভারত ও চীনের ওপরও বড় প্রভাব

গবেষণায় দেখা গেছে, একই পরিস্থিতিতে ভারতের সার্বভৌম ঋণমান চার ধাপ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আর চীনের রেটিং ২০ ধাপের স্কেলে ৫ ধাপেরও বেশি অবনমন হতে পারে। এর ফলে ভারতের বার্ষিক ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার এবং চীনের ক্ষেত্রে ৭০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিজনেস স্কুলের গবেষক পাতি ক্লুসাক বলেন, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট দেখিয়েছিল যে উদীয়মান ঝুঁকি উপেক্ষা করলে তার পরিণতি কতটা গুরুতর হতে পারে। তাঁর মতে, পরিবেশগত ও জীববৈচিত্র্য-সংক্রান্ত ঝুঁকি যদি এখনো ঋণমান মূল্যায়নের বাইরে রাখা হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি একই ধরনের ভুল আবারও করতে পারে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, সার্বভৌম ঋণমান অবনমনের প্রভাব শুধু সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর অভিঘাত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত, বিনিয়োগ তহবিল ও পেনশন ফান্ড পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।

বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্য ক্ষয়ের কারণে অতিরিক্ত যে ঋণ-পরিষেবা ব্যয় তৈরি হবে, তা বিশ্বব্যাপী বার্ষিক বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তার প্রায় তিন-চতুর্থাংশের সমান। এ ছাড়া, এটি জাতিসংঘের বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোর আওতায় ১৯৬টি দেশের জন্য বছরে ২০০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন সংগ্রহের লক্ষ্যেরও একটি বড় অংশের সমপরিমাণ।

গবেষণার লেখকেরা নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ঋণমান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক মডেলে প্রকৃতি-সম্পর্কিত ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি, জীববৈচিত্র্য রক্ষার খরচ তার ধ্বংসের অর্থনৈতিক ক্ষতির তুলনায় অনেক কম।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের সাবেক সার্বভৌম ঋণ বিশ্লেষক মরিটজ ক্রেমার, যিনি গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ক্ষেত্রে রেটিং এজেন্সিগুলো ভবিষ্যতের পরিবেশগত ঝুঁকিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, ‘আজ যে বন্ডগুলোর মেয়াদ ৩০ বা ৫০ বছর পরে শেষ হবে, সেগুলোর রেটিং তখন ৩ থেকে ৪ ধাপ পর্যন্ত নিচে নেমে যেতে পারে। এটিই মূল সমস্যা।’

গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এখন শুধু পরিবেশগত নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ঋণ ব্যবস্থাপনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ও প্রকৃতি-নির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এই সতর্কবার্তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত