Ajker Patrika

২৭ বছর হেঁটে পৃথিবী ভ্রমণ

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
২৭ বছর হেঁটে পৃথিবী ভ্রমণ
কার্ল বুশবি পাড়ি দিচ্ছেন রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চল। ছবি: দ্য হাল স্টোরি

মাত্র ৫০০ ডলার পকেটে নিয়ে একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন কার্ল বুশবি। সঙ্গে ছিল একটি অদ্ভুত দৃঢ় অঙ্গীকার—পৃথিবীর পুরোটা হেঁটে ঘুরে না ফেলা পর্যন্ত ঘরে ফিরবেন না।

১৯৯৮ সালে ইংল্যান্ডের ইস্ট ইয়র্কশায়ারের হাল শহর থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন বুশবি। তখন বয়স ছিল ২৯। আজ বয়স ৫৬। প্রায় ২৭ বছর তিনি হেঁটে চলেছেন। পাড়ি দিয়েছেন ২৫টি দেশের প্রায় ৫৮ হাজার কিলোমিটার পথ। এই অভিযানের নাম তিনি দিয়েছিলেন গোলিয়াথ অভিযান। যেখানে একমাত্র শর্ত ছিল, কোনো মোটরচালিত যান ব্যবহার করা যাবে না এবং কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফেরা যাবে না।

সামরিক জীবন থেকে মুক্তির খোঁজে

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে প্যারাট্রুপার হিসেবে ১২ বছর চাকরি করেছেন কার্ল বুশবি। ছবি: দ্য হাল স্টোরি
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে প্যারাট্রুপার হিসেবে ১২ বছর চাকরি করেছেন কার্ল বুশবি। ছবি: দ্য হাল স্টোরি

দীর্ঘ ১২ বছর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে প্যারাট্রুপার হিসেবে কাজ করার পর কার্ল বুশবির মনে হয়েছিল, তাঁর জীবন যেন কোনো এক শিকলে বাঁধা। সেই একঘেয়েমি ও সীমাবদ্ধতা থেকে জন্ম নেয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। একদিন তিনি মানচিত্রে একটি রেখা আঁকলেন। ইংল্যান্ড থেকে ইউরোপ, এশিয়া, সাইবেরিয়া পেরিয়ে বেরিং প্রণালি হয়ে আমেরিকা, তারপর আবার ঘরে ফেরা। যাত্রা শুরু হয় চিলির পুন্তা আরেনাস থেকে। প্রতিদিন গড়ে ৩০ কিলোমিটার হেঁটেছেন। এভাবেই বছরের পর বছর চলতে থাকে তাঁর পথচলা।

জঙ্গল, বরফ আর মৃত্যুর মুখোমুখি

এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি দেখেছেন মানুষের সহনশীলতা। একসময় তাঁকে পাড়ি দিতে হয় দক্ষিণ আমেরিকার ভয়ংকর দারিয়েন গ্যাপ, কলম্বিয়া ও পানামার মাঝের সেই দুর্গম জঙ্গল। যেখানে অপরাধী চক্র, জলাভূমি ও বিষাক্ত প্রাণীর ভয় সব সময় তাড়া করে। সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায় আসে ২০০৬ সালের মার্চে। আলাস্কা থেকে রাশিয়ার সাইবেরিয়া বরফে জমে থাকা বেরিং প্রণালি পেরোনোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ফরাসি অভিযাত্রী দিমিত্রি কিফারের সঙ্গে ১৪ দিন ও ১৪ রাত বরফের ওপর যুদ্ধের মতো সংগ্রাম করেন।

শেষ পর্যন্ত দুই মহাদেশকে হেঁটে যুক্ত করার ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করলেও আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। রাশিয়ায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে আটক করা হয়। জেরা শেষে বহিষ্কার করা হয় এবং পাঁচ বছরের জন্য রাশিয়ায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

ভ্রমণের ফাঁকে অর্থ আয়

এই অভিযানে তাঁর খরচ এসেছে মূলত স্পনসরশিপ, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ও মানুষের সহায়তা থেকে। কিন্তু সব সময় তা ছিল না। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে তিনি মেক্সিকো ও কলম্বিয়ায় বছরের পর বছর আটকে পড়েন। টাকার অভাবে কখনো কুকুরের মল পরিষ্কার করেছেন, কখনো অন্যের কুকুর হাঁটিয়েছেন শুধু খাবারের বিনিময়ে। ২০০৫ সালে তিনি লেখেন তাঁর বই ‘জায়ান্ট স্টেপস’, যা থেকে পাওয়া রয়্যালটিও কিছুটা সহায়তা দেয় তাঁর বিশ্বভ্রমণে।

রাশিয়া পাড়ি দিচ্ছেন কার্ল বুশবি। ছবি: দ্য হাল স্টোরি
রাশিয়া পাড়ি দিচ্ছেন কার্ল বুশবি। ছবি: দ্য হাল স্টোরি

সমুদ্র সাঁতরে পাড়ি

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক জটিলতায় ইরান বা রাশিয়া হয়ে ভ্রমণ অসম্ভব হয়ে পড়লে তিনি নেন এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত, কাস্পিয়ান সাগর সাঁতরে পার হওয়া। টানা ৩১ দিন সাঁতরে তিনি ও তাঁর সঙ্গী সমুদ্র পার হন কোনো জাহাজ বা বিমানের সাহায্য ছাড়াই।

সবচেয়ে বড় ত্যাগ পরিবার

এই অভিযাত্রায় শারীরিক যন্ত্রণা ছিল ভয়ংকর। কিন্তু সবচেয়ে গভীর ক্ষত ছিল মানসিক। ১৯৯৮ সালে যখন তিনি যাত্রা শুরু করেন, তাঁর ছেলে অ্যাডাম তখন স্কুলপড়ুয়া। ২৭ বছর ধরে তিনি ছেলের পুরো শৈশব মিস করেছেন। আজ অ্যাডাম নিজেই বাবা। অথচ কার্ল বুশবি এখনো কোনো নাতি-নাতনিকে কোলে নেননি।

এই দীর্ঘ পথে কার্ল হারিয়েছেন অনেক কিছু। বাবাকে শেষবার দেখেছিলেন বহু আগে। ছেলের পুরো শৈশব কেটেছে তাঁকে ছাড়া। এখন ছেলের নিজের পরিবার রয়েছে। কিন্তু বিনিময়ে তিনি পেয়েছেন এমন কিছু, যা সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না। পেয়েছেন অচেনা সব মানুষের ভালোবাসা এবং নিঃস্বার্থ সহায়তা। এ বছরের কোনো একসময় কার্ল বুশবি নিজের শহরে ফিরবেন। এর মধ্য দিয়ে শেষ হবে তাঁর গোলিয়াথ অভিযান।

সূত্র: সিএনবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত