Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

বৈচিত্র্যপূর্ণ লাইফস্টাইল দেখতে চায় মানুষ

বৈচিত্র্যপূর্ণ লাইফস্টাইল দেখতে চায় মানুষ

আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে অ্যান্টার্কটিকা অভিযান, ব্রাজিলের আমাজন, চিলির আতাকামা মরুভূমি কিংবা পাবলো নেরুদার বাড়ি, নিকারাগুয়ার রেইনফরেস্ট অথবা বার্লিন থেকে নেদারল্যান্ডসের টিউলিপ বাগান—কোথায় যাননি মহুয়া রউফ! এবার তিনি ঘুরছেন ওশেনিয়া। এখন আছেন ভানুয়াতুতে। ভ্রমণে যাওয়ার আগে ও পরে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রজত কান্তি রায়

এখন কোথায় আছেন?

এখন আছি ভানুয়াতু। দেখছি এখানকার স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা। দেখছি আদিবাসী পাড়া, ব্লু লেক। এখানে একটা পোস্ট অফিস আছে সাগরের পানির নিচে। প্লাস্টিকের পোস্ট কার্ড নিয়ে গিয়ে ডুবুরির মতো করে সে পোস্ট অফিসে পোস্ট করে দিয়ে আসতে হয়। আমি যাচ্ছি আজ সেখানে।

বেশ দীর্ঘ একটা বিরতির পর আবার ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছেন। ভানুয়াতু মানে ওশেনিয়া। আর কোথায় কোথায় যাওয়ার পরিকল্পনা আছে?

আমার ভ্রমণের বড় অংশ জুড়ে ছিল উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। এবার আমার কাছে মনে হলো, ওশেনিয়া অঞ্চলটা দেখা জরুরি। জরুরি এই কারণে যে পৃথিবীর এই অংশ নিয়েই আমাদের বেড়ে ওঠা। আমাদের বইপুস্তকে আমরা যে ভূগোল বা ইতিহাসের নানান অংশ পড়তাম, সেখানে তেমন কিছু আসলে আমরা পাইনি। হ্যাঁ, আমরা শুধু অস্ট্রেলিয়ার প্রাণী বৈচিত্র্যের কথা জানতাম। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার আশপাশে আরও বৃহৎ জনগোষ্ঠী আছে নানান দেশে, যেমন সামোয়া, ফিজি বা ভানুয়াতুর কথা বলা যায়। এই দেশগুলো দেখার দীর্ঘদিনের একটা ইচ্ছা ছিল আমার। কিন্তু অনেক দিন ধরে ব্যবস্থা করে উঠতে পারছিলাম না। এখানে খরচ, সময় এবং প্রস্তুতির একটা বিষয় আছে। আমার কাছে এখন মনে হয়েছে, পৃথিবীর এই অংশটা এক্সপ্লোর করা দরকার। সে রকম একটা তাগিদ থেকে আমি এবার সিদ্ধান্ত নিলাম, ওশেনিয়া অঞ্চল ভ্রমণ করব।

কোন কোন দেশ?

মূলত অস্ট্রেলিয়া। সেখান থেকে ভানুয়াতু এসেছি। এখানে সপ্তাহখানিক থাকব। সেখান থেকে চলে যাব ফিজি। ফিজিতে আমার একটু বেশি সময় থাকার ইচ্ছা আছে, ১০ থেকে ১২ দিন। আর ফিজি থেকে চলে যাব সামোয়া। মজার একটা কথা বলি, সামোয়া দেশটার একেবারে কাছে আরেকটি দেশ আছে। সেটির নাম আমেরিকান সামোয়া। খুবই অল্প জল দূরত্ব। সে দেশটি নিয়ন্ত্রণ করে আমেরিকা। ফলে তার সময় পরিচালিত হয় আমেরিকার টাইম জোনকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ সামোয়ার টাইম এক রকম আর মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে আমেরিকান সামোয়ার টাইম একেবারে অন্য রকম।

মানে একই ধরনের জিওগ্রাফিতে!

একই ধরনের জিওগ্রাফি। আমেরিকান সামোয়াতে সকাল ৭টা মানে আমেরিকাতেও সকাল ৭টা।

এই যে প্রায় দেড় বছরের বিরতি নিয়ে আবার একটা ভ্রমণের পরিকল্পনা করা, এর এক্সাইটমেন্টটা কেমন?

এটা আসলেই রোমাঞ্চকর। এর মধ্যে আবার চ্যালেঞ্জও আছে। সবকিছু মিলিয়ে একেবারে অন্য রকম একটা ব্যাপার, যেটা একেবারে নিজের ভেতরে হয়। আমাকে ধীরে ধীরে সঞ্চয় করতে হবে। এটা হচ্ছে আমার চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ, যেটার সঙ্গে বারবার চলে আসে রাষ্ট্রের কথা। ভিসা পাওয়া বা না পাওয়া।

পর্যটনের ধরনটা কি বদলে গেছে?

পর্যটন এখন আর আগের পর্যটন নাই। মানুষ এখন লাইফস্টাইল দেখতে চায়। মানুষ এ দেশে সমুদ্র দেখতে আসবে না। মানুষ এ দেশে বাঙালি লাইফস্টাইল দেখতে আসবে। তারা রাস্তায় হেঁটে হেঁটে একটা বাজার দেখতে চায়, পুরান ঢাকা দেখতে চায়। লোকালয়, অনেক মানুষ পুরোনো দোকানে কীভাবে খায়, সেটা দেখতে চায়। একটা সুনির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে শুধু ছবি তুলে পর্যটন করার দিন আসলে শেষ। ফলে শুধু কিছু কিছু জায়গায় পুলিশ রেখে নিরাপত্তা দিলেই সেটা আর পর্যটন হবে না। তারা আপনার কৃষি দেখবে, সংস্কৃতি দেখবে। এসব বিষয়ে আমাদের কোনো রূপরেখা নাই। আমরা তো জানিই না বিদেশি পর্যটকেরা কী দেখতে আসছে আমাদের দেশে। এটা নিয়ে যদি একটা সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকত, এগুলোর ওপর কাজ হলে ভালো হতো। আমি একবার ব্রাজিলের ইগুয়াজু বলে একটি শহরে চলে গিয়েছিলাম। সেখানে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে—এই তিন দেশের বর্ডার আছে। মাঝখানে একটা শান্ত নদী। ওদিকে আর্জেন্টিনা এবং আমি দাঁড়িয়ে আছি ব্রাজিলে। সন্ধ্যার পর আমি দেখলাম এই বর্ডারে একটা দুই ঘণ্টার নৃত্য উৎসব শুরু হলো। আমি জানতামও না যে এখানে এটা হয়। আমি আসলে তিনটা দেশের বর্ডার দেখতে গিয়েছিলাম। সবাই গোল হয়ে চেয়ার নিয়ে বসে গেল। ওখানে সাজানো কোনো মঞ্চ ছিল না। এটা খোলা জায়গা। তো আমিও একটা চেয়ারে বসে পড়লাম। এই তিন দেশের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য-গান পরিবেশিত হতে থাকল দুই ঘণ্টা ধরে। আমাদের সঙ্গে ভারতের বা মিয়ানমারের দীর্ঘ বর্ডার আছে। আমরা কি কখনো পেরেছি বা চেয়েছি কিছু করতে?

এখন তো বাংলাদেশের পর্যটকেরা ভীষণভাবে ভিসা নিয়ে ভোগান্তিতে আছে। এটাকে কীভাবে দেখছেন?

আমি এ কারণেই ওশেনিয়ায় এসেছি। আমি কোনো দেশের ভিসা পাচ্ছিলাম না। ভারতে ভিসা পাওয়ার সিস্টেম থাকলেও তা অত্যন্ত জটিল হয়ে গেছে। সরাসরি অ্যাপ্লাই করে পাওয়া যাচ্ছিল না। যেমন আমার কলম্বিয়া যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। সেটার জন্য আমার দিল্লি যেতে হবে। কিন্তু ভারতের ভিসা পাওয়া খুব একটা সহজ নয়। তাই আমার কাছে মনে হলো, একটা অপশন আছে—ঘরে বসে ভিসা করা যায় অস্ট্রেলিয়ার।

ভিসা নিয়ে বাংলাদেশের আসলে কী করা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

বিশ্বস্ততা একটা বড় ব্যাপার। রাষ্ট্রের স্ট্যাবিলিটি বড় ব্যাপার। গতকাল আমি একটা ভিডিও দেখছিলাম। সেখানে বলা হচ্ছে, পৃথিবীর ১৮০টির বেশি দেশে অনায়াসে চলে যেতে পারেন জাপানিরা। কেন? কারণ, জাপানিরা কোথাও গিয়ে অসততা করে না, কোথাও অবৈধভাবে যাওয়ার চেষ্টা করে না। তারা কখনো পলিসির বাইরে যায় না। ফলে জাপানিদের ওপর পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বিশ্বাস এত বেশি। আর আমরা কীভাবে পৃথিবীর নানা দেশকে আমেরিকা বা ইতালি যাওয়ার হাব বানাব, সে চিন্তা করি। এই কাজগুলো করতে গিয়ে আমরা বিপদে পড়েছি। পর্যটনের কথা আপনি বাদ দেন। যেসব শিক্ষার্থী পড়তে যাচ্ছেন, তাঁরাও শিকার হচ্ছেন, ভিসা পাচ্ছেন না। রাষ্ট্র হিসেবে আপনি যদি শক্তিশালী না হয়, পৃথিবীব্যাপী বিশ্বস্ত না হয়, তাহলে সব ক্ষেত্রে বা বিশেষ করে পর্যটনের ক্ষেত্রে আপনি অনেক বেশি সাফারার হবেন। রাষ্ট্র হিসেবে আপনি কত দক্ষ, রাষ্ট্র হিসেবে আপনি কতটা বৈদেশিক সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, এগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত