Ajker Patrika

সুখী দেশে পরদিন যা হলো

সোনালী ইসলাম
সুখী দেশে পরদিন যা হলো

ভুটানকে আমার মনে হয় এই উপমহাদেশের স্বর্গভূমি। যদিও সবাই কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ বলে থাকেন। আমি এ পর্যন্ত তিনবার ভুটানে গিয়েছি। পারলে আরও অনেকবার যেতে চাই । তবে হ্যাঁ, পর্যটক হিসেবে আপনি যদি শপিং মল খোঁজেন বা নাইটক্লাবে সন্ধ্যা কাটাতে চান, তবে ভুটান আপনার জন্য নয়।

সব দেশ যেমন গ্রস ন্যাশনাল প্রোডাক্ট দিয়ে দেশের উন্নতির মাপকাঠি নির্ধারণ করে, ভুটান সেটাকে মাপে গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস দিয়ে। জনগণের খুশিই দেশটির কাছে মূল্যবান। এই অসাধারণ ধারণার আবিষ্কারক রাজা জিগমে সিংহে ওয়াংচুক—বর্তমান রাজার পিতা। ৫০ বছর আগেও ভুটান খুবই রক্ষণশীল দেশ ছিল। তারা কোনো পর্যটক ঢুকতে দিত না। রাজা জিগমে সিংহে ওয়াংচুক ভুটানের বৌদ্ধ পুরোহিতদের সঙ্গে আলোচনা করে দেশের উন্নতির জন্য পর্যটকদের জন্য সে দেশের দরজা খুলে দেন। এখানে বলে রাখা ভালো, ভুটান পরিপূর্ণভাবেই বৌদ্ধধর্মের দেশ। সে দেশে রাজা আর ধর্মীয় গুরুদের মর্যাদা প্রায় সমান।

শেষবার আমি একাই গিয়েছিলাম ভুটান। বেড়ানোর জন্য চেলালাপাস, দৌচালা, পুনাখা, টাইগারনেস্ট তো আছেই, এখন তৈরি হয়েছে প্রায় ১৭৭ ফুট উঁচু এবং পিতল আর সোনার তৈরি বিশাল বুদ্ধমূর্তি। প্রথমবার ভুটানে গিয়ে শুনে এসেছিলাম, এমন একটা প্রজেক্ট হতে যাচ্ছে। দ্বিতীয়বার অর্ধেক তৈরি দেখেছি। তৃতীয়বারে গিয়ে সম্পূর্ণ বুদ্ধমূর্তি এবং পুরো কমপ্লেক্স দেখতে পেলাম। বিশাল চত্বরে তৈরি এই মূর্তির নিচে পুরোটাজুড়ে আছে প্রার্থনা ঘর। সেখানে দেয়াল ঘেঁষে কাচে ঘেরা আছে আরও ১ লাখ ২৫ হাজার সোনালি রঙের বুদ্ধমূর্তি।

গাইড বলেছিলেন, গাড়ি নিয়ে মন্দিরের দরজার কাছে যেতে। সেটা পেছনের পথ। কিন্তু আমি রাজি হলাম না। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম মন্দিরের দরজার কাছে। অপূর্ব সুন্দর নকশা করা কাঠের বিশাল দরজা। ভেতরে ঢুকলাম, মানে আমি এখন বড় মূল মূর্তিটার তলায়। ধূপ আর পদ্মফুলের সুগন্ধে বিশাল ঘরটা যেন আমাকে আলিঙ্গন করল। একজন পুরোহিত এক কোনায় বসে কয়েকজনের সঙ্গে মৃদুস্বরে কথা বলছেন। পুরো আবহটাই এত পবিত্র যে মন ভালো হয়ে গেল। আমি ধীরে ধীরে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করলাম। কথিত আছে এই ১ লাখ ২৫ হাজার বুদ্ধমূর্তির সামনে দিয়ে হাঁটলে ১ লাখ ২৫ হাজারবার বুদ্ধ দর্শনের পুণ্য হয়। আমি পাপী মানুষ, যেখানেই পুণ্যের খোঁজ পাই সেখানেই হাজির হয়ে যাই। সেটা সে যে ধর্মেরই হোক না কেন!

হাঁটতে হাঁটতে সেই পুরোহিতের সামনে আসতেই তিনি চোখ তুলে তাকালেন। আমি থেমে, তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলাম। তিনি এক মুহূর্ত থেমে আমার মাথায় হাত রাখলেন। তারপর ভুটানি ভাষায় গাইডকে কী যেন বললেন। আমি প্রদক্ষিণ পুরো করে গাইডকে জিজ্ঞাসা করলাম, পুরোহিত কী বলেছিলেন? গাইড জানালেন, তিনি বলেছেন, আমি যেন আগামীকাল টাইগারনেস্ট থাকসান মনাস্ট্রিতে না যাই। বিপদ হতে পারে। আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই গাড়িতে ফিরে এলাম। ঘরে এসে হঠাৎ মনে হলো, পুরোহিত থাকসান মনাস্ট্রিতে আমার যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানলেন কীভাবে? গাইড সেই মনাস্ট্রিতে আমাকে নিয়ে যেতে পারলে অনেক বেশি নুট্রাম বা ভুটানি মুদ্রা পেতেন। তিনিই-বা থেমে গেলেন কেন?

পরদিন গাইড আমাকে নিয়ে গেলেন পুনাখাতে। মাচু নদী আর পাচু নদীর সংযোগস্থলে তৈরি এই মনাস্ট্রিতেই রাজাদের বিয়ে এবং নানা রাজকীয় ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়। সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে শুনলাম থাকসান মনাস্ট্রির পথে ঘোড়া পা পিছলে পড়ে একজন নিহত হয়েছেন আর আমাদের হোটেলের এক বাসিন্দা গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি! আমি একই সঙ্গে অবাক ও স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এই বিপুল বিশ্বের কতটুকু রহস্যই-বা আমরা জানতে পারি!

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত