Ajker Patrika

১০ ধাপে ত্বকযত্নের দিন ফুরোল, এসেছে ‘স্মার্ট রেফারিং’

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
১০ ধাপে ত্বকযত্নের দিন ফুরোল, এসেছে ‘স্মার্ট রেফারিং’
১০ ধাপে ত্বকযত্নের দিন শেষ। রূপসচেতনেরা বুঝতে পারছে, একাধিক পণ্য ত্বকে ব্যবহারের চেয়ে ত্বক বুঝে শুধু প্রয়োজনীয় প্রসাধনী বা পণ্য বেছে নেওয়াটাই মূল বিষয়। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি।
১০ ধাপের রুটিনটি ত্বকের প্রয়োজনীয় হওয়ার চেয়ে মূলত ট্রেন্ড দিয়ে চালিত ছিল। শোভন সাহা, স্বত্বাধিকারী ও কসমেটোলজিস্ট, শোভন মেকওভার

করোনা-পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল কোরীয় ত্বকচর্চার রুটিন। সেলিব্রিটি থেকে সাধারণ নারী—সবার কাছে ত্বকের যত্নে ১০টি সুনির্দিষ্ট ধাপ পার করা যেন হয়ে উঠেছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একের পর এক ক্লিনজার, টোনার, সেরাম, ময়শ্চারাইজার ইত্যাদি ব্যবহারকে একটি জটিল কোরিওগ্রাফির মতো করে দেখা হতো। কোনটার পর কোনটা ব্যবহার করতে হবে, তা ছিল মুখস্থ রাখার মতো ব্যাপার। অতিমারির পর থেকে কিছুদিন আগপর্যন্ত বেশি মানেই ছিল ভালো—আরও সেরাম, আরও টোনার, আরও ধাপ! কিন্তু এর ফল ভালোর চেয়ে খারাপই হয়েছে বেশি। ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে পারে, ত্বকে একাধিক পণ্য়ের লেয়ারিংয়ের ফলে জ্বালা ভাব তৈরি হচ্ছে। ত্বকের সুরক্ষা স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পিগমেন্টেশন বেড়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকে একাধিক ধাপের রূপচর্চা থেকে ধীরে ধীরে সরে এসেছে। রূপসচেতনেরা বুঝতে পারছে, একাধিক পণ্য ত্বকে ব্যবহারের চেয়ে ত্বক বুঝে শুধু প্রয়োজনীয় প্রসাধনী বা পণ্য বেছে নেওয়াটাই মূল বিষয়।

১০ ধাপের রূপ-রুটিনের উত্থান ও পতন

রূপবিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিকোণ থেকে, ১০ ধাপের ত্বকের যত্নের রুটিন বেশির ভাগ মানুষের জন্য কখনোই বাধ্যতামূলক ছিল না। শোভন মেকওভারের স্বত্বাধিকারী কসমেটোলজিস্ট শোভন সাহা বলেন, ‘১০ ধাপের রুটিনটি ত্বকের প্রয়োজনীয় হওয়ার চেয়ে মূলত ট্রেন্ড দিয়ে চালিত ছিল।’ যদিও এটি হাইড্রেশন এবং উপাদান স্তরে স্তরে ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করেছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ত্বকের যত্নে কার্যকর হলো নির্দিষ্ট উপাদান, সঠিক ক্রম এবং এগুলো ব্যবহারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। বেশির ভাগ ত্বকে এত স্তরের প্রয়োজন হয় না।’

শোভন সাহা বলেন, ‘ক্লিনজিং, ময়শ্চারাইজিং, ইউভি থেকে সুরক্ষা—এটিই হলো ত্বকযত্নের মূল ভিত্তি। বাদবাকি ধাপগুলো ত্বকের নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য, তা মোটেও সর্বজনীন নয়। ফলে ১০ ধাপের রূপচর্চায় খরচের খাত বেড়েছিল; অন্যদিকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য ব্যবহারের ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ত্বকের ভালোর চেয়ে ক্ষতিই হয়েছে বেশি।’

যেভাবে ১০ ধাপের রূপ রুটিন আশাহত করেছে

কয়েক বছর রাজত্ব করলেও ২০২৬ সালে এসে ধীরে ধীরে এই ধরনের রূপচর্চায় আর বিশ্বাস রাখতে পারছে না অনেকে। এর কারণ হলো—

১০ ধাপের রূপচর্চার একটি ধাপে ছিল সেরামের ব্যবহার। প্রতীকী ছবি পেক্সেলস
১০ ধাপের রূপচর্চার একটি ধাপে ছিল সেরামের ব্যবহার। প্রতীকী ছবি পেক্সেলস

রূপ-রুটিনে অতিমাত্রায় সক্রিয় উপাদানের প্রয়োগ

রেটিনল, এএইচএ, বিএইচএ ইত্যাদির ব্যাপক ব্যবহার সাধারণ রূপ-রুটিনকে বদলে দিয়েছে। এই উপাদানগুলো শক্তিশালী এবং ত্বকের জন্য উপকারী। কিন্তু সমস্যাটা সেরাম ও টোনারের উপাদানের মধ্যে নয়, বরং এগুলোর অপব্যবহারে। এগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহারে গত পাঁচ-ছয় বছরে ত্বকের সুরক্ষা স্তরের ক্ষতি হয়েছে; বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে যাঁরা একই সপ্তাহে একাধিক শক্তিশালী উপাদানযুক্ত পণ্য ব্যবহার করেছেন। শোভন সাহা বলেন, ‘যখন এগুলো অতিরিক্ত ব্যবহার করা হয়, তখন ত্বকের সুরক্ষা স্তর ভেঙে যেতে পারে। ফলে ত্বকের সংবেদনশীলতা বাড়ে এবং জ্বালাপোড়া হয়।’

গ্লাস স্কিন ট্রেন্ডের উন্মাদনা অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করেছিল

এরপর এল সেই রূপকথার রাজকুমারীদের মতো গ্লাস স্কিন ট্রেন্ড, যা মূলত ছিল উজ্জ্বল, পোরসবিহীন চকচকে ত্বক পাওয়ার বাসনা। শোভন সাহা জানান, স্বাস্থ্যকর ত্বকে স্বাভাবিকভাবে র রোমকূপ ও টেক্সচার থাকে। আর্দ্রতা এবং ইউভি সুরক্ষার মাধ্যমে ত্বকের সুরক্ষা স্তর সর্বোত্তমভাবে কাজ করে। একে প্রাণবন্ত দেখাতে ১০টি স্তরের প্রয়োজন হয় না।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশ যেহেতু গ্রীষ্মপ্রধান, তাই এখানকার মানুষের ত্বক তৈলাক্ত এবং পিগমেন্টেশনের প্রবণতাযুক্ত। গ্লাস স্কিন রুটিনে সাধারণত আর্দ্রতা দানকারী পণ্যের ব্যবহার বেশি থাকে। ফলে আর্দ্র পরিবেশে এসব পণ্যের ব্যবহার ব্রণ ও ছত্রাকজনিত সমস্যার কারণ হতে পারে।’

অর্থাৎ শীতপ্রধান দেশে রোজ যেসব পণ্য ত্বকে মানানসই, তা আমাদের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশের মানুষ রোজ ব্যবহার করলে ত্বকের ভালোর চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে।

শোভন সাহা আরও যোগ করেন, পোরসবিহীন, নিখুঁত ত্বকের অবাস্তব প্রত্যাশাও তৈরি করেছে ১০ ধাপের এই রূপ-রুটিন। এটি জৈবিকভাবে সব দেশের মানুষের ক্ষেত্রে অর্জনযোগ্য নয়।

এ বছর ত্বক পরিচর্যায় যে পরিবর্তন আসতে পারে

ম্যাক্সিমালিস্ট রুটিন থেকে স্মার্ট লেয়ারিংয়ে অভ্যস্ত হচ্ছে রূপসচেতনেরা। শোভন সাহা বলেন, ‘বেশির ভাগ মানুষের জন্য বা সুস্থ ত্বকের জন্য ৩ থেকে ৫টি সক্রিয় উপাদানযুক্ত পণ্যই যথেষ্ট। ক্লিনজার, ময়শ্চারাইজার, সানস্ক্রিন এবং এক বা দুটি নির্দিষ্ট পরিচর্যার পণ্য। এর বাইরে লেয়ারিং করলে যে ফল উন্নত হবেই, এমনটা নয়।

ত্বকের যত্নে বিশ্বের সবার জন্য একটিই সমাধান থাকবে, এ কথা ভাবা ভুল। শোভন সাহার ভাষ্য, ত্বক ‘বেশি’ কিছুতে সাড়া দেয় না। এটি সঠিক সময়ে সঠিক আণবিক সংকেতে সাড়া দেয়। আসল কথা হলো, যে সমস্যা তার সমাধান খুঁজতে হবে। বাড়তি কিছু ব্যবহার বাহুল্যই বলতে হবে।

বর্তমানে ম্যাক্সিমালিজমের পরিবর্তে মানুষ মিনিমালিস্ট হয়ে উঠেছে রূপচর্চার ক্ষেত্রেও। গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে ‘লেস ইজ মোর’ ধারণাটি।

যে জায়গার আবহাওয়া ঠান্ডা, সেখানে শুষ্ক ত্বকের জন্য আর্দ্রতা বাড়ানোর যত্নের প্রয়োজন হতে পারে। ব্রণপ্রবণ ত্বকের জন্য বিশেষ সক্রিয় উপাদানের প্রয়োজন হতে পারে। সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে সেরে না ওঠা পর্যন্ত বিশেষ কিছু পণ্য ব্যবহার কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। কারণ, ত্বক সঠিক সময়ে সঠিক আণবিক সংকেতে সাড়া দেয়, পণ্য ব্যবহারের পরিমাণে নয়।

শোভন সাহা বলেন, ‘২০২৬ সালে ত্বকের যত্ন কমিয়ে দিতে হবে, সে কথা হচ্ছে না। এর মানে হলো, যত্নের কাজটি সঠিকভাবে করা—কম কিন্তু স্মার্ট পণ্য ব্যবহার করা, যা ত্বকের সুরক্ষা স্তর ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। বিশেষ করে আমাদের দেশের মানুষের ত্বকের জন্য এটুকুই বলব।’

একসময় ১০টি স্কিন কেয়ার ধাপ রূপসচেতনতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ২০২৬ সালে, সচেতনতার অর্থ হলো আপনার ত্বকের সুরক্ষা স্তর বোঝা, সক্রিয় উপাদানগুলোর মধ্যে সময়ের ব্যবধান রাখা এবং ক্লিনজিং, টোনিং, ময়শ্চারাইজিংসহ প্রতিটি ধাপ যেন তার সঠিক ক্রম পায়, তা নিশ্চিত করা। স্মার্ট স্কিন কেয়ার শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী করারও একটি কৌশল।

ছবি: পেক্সেলস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ফেনী ও পঞ্চগড়ের আলোচিত দুই এসপি প্রত্যাহার

৯০ লাখ ভোটার বাদ দিয়ে হারানো হয়েছে তৃণমূলকে, মমতার আবেদনে সাড়া দিলেন আদালত

বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণে ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফকে জমি হস্তান্তর: শুভেন্দু

জঙ্গল সলিমপুরে হবে দুটি পুলিশ একাডেমি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ক্যামেরা প্রস্তুত করে রাজশাহীতে যুবককে গাছে বেঁধে লাঠিপেটা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত