Ajker Patrika

বিরল ডিমেনশিয়ায় এক পরিবারের হারিয়ে যাওয়ার করুণ কাহিনি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ২২: ৪০
বিরল ডিমেনশিয়ায় এক পরিবারের হারিয়ে যাওয়ার করুণ কাহিনি
ছবি: নিও সায়েন্টিস্ট

মায়ের পর একে একে পাঁচ ভাইবোনকে যেন চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেখেছেন বার্ব। তাঁরা কেউই মারা যাননি, কিন্তু বয়স চল্লিশের কোঠায় পৌঁছানোর পর আচরণে এমন পরিবর্তন আসতে শুরু করে যে, ধীরে ধীরে তাঁরা হয়ে ওঠেন নিজেদেরই অচেনা মানুষ। সন্তানদের প্রতি উদাসীনতা, জীবনসঙ্গীর সঙ্গে অস্বাভাবিক আচরণ এবং সামাজিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলা—সব মিলিয়ে পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন, তাদের জীবনে নেমে এসেছে এক বিরল ধরনের ডিমেনশিয়া।

বার্বের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কারণ তিনি জানতেন, পরিবারের সদস্যদের আক্রান্ত করার জন্য দায়ী জিনটি তাঁর শরীরেও থাকতে পারে। সেই জিন উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল নানা প্রশ্ন—তিনি নিজেও যদি আক্রান্ত হন, তাহলে তাঁর স্বামী, দুই সন্তান ও বন্ধুদের কী হবে? একসময় কি তিনিও নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলবেন?

সাংবাদিক রবার্ট কোলকার তাঁর নতুন বই ‘দ্য ভ্যানিশিং ফ্যামিলি: লাভ, ফেইট, অ্যান্ড দ্য কোয়েস্ট টু এন্ড ডিমেনশিয়া’-তে (The Vanishing Family: Love, Fate, and the Quest to End Dementia) যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার এই পরিবারের হৃদয়বিদারক কাহিনি তুলে ধরেছেন। বইটি শুধু একটি পরিবারের দুর্ভাগ্যের গল্প নয়; এতে উঠে এসেছে ভালোবাসা, শোক, বংশগত রোগ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যতে এই রোগের চিকিৎসা আবিষ্কারের আশার কথাও।

কোলকারের আগের বই ‘হিডেন ভ্যালি রোড’-এ একই পরিবারের ছয় ভাইবোনের সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার বাস্তব কাহিনি উঠে এসেছিল। নতুন বইটিও অনেকটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের রহস্য অনুসন্ধানের মতো। একে একে পরিবারের সদস্যদের পরিচয় এবং কীভাবে তাদের মধ্যে ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া বা এফটিডি দেখা দেয়, তা তুলে ধরা হয়েছে।

ডিমেনশিয়ার মোট রোগীর মধ্যে বিরল এফটিডির হার ৫ শতাংশেরও কম। আলঝেইমার রোগের তুলনায় এটি সাধারণত অনেক কম বয়সে দেখা দেয়। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে স্মৃতিশক্তি হারানোর বদলে ব্যক্তির আচরণে পরিবর্তন বেশি স্পষ্ট হয়। রোগী হঠকারী হয়ে উঠতে পারেন, আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন এবং সামাজিক আচরণের স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করতে পারেন। পরবর্তী সময়ে কথা বলা, পোশাক পরা কিংবা নিজে নিজে শৌচাগার ব্যবহারের মতো সাধারণ কাজও কঠিন হয়ে পড়ে।

বার্বের পরিবারের ক্ষেত্রে সমস্যাটির সঙ্গে এমএপিটি নামের একটি জিনের মিউটেশনের সম্পর্ক রয়েছে। এই জিন ‘টাউ’ নামের একটি প্রোটিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে, যা সাধারণত মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের কাঠামো ও কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। জিনটির ত্রুটির কারণে মস্তিষ্কে ক্ষতিকর মাত্রায় টাউ জমতে পারে। পরিবারের কোনো সদস্যের মধ্যে এই মিউটেশন থাকলে তাঁর সন্তানের তা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ।

বইটির সবচেয়ে আবেগঘন অংশগুলোর একটি হলো পরিবারের সদস্যদের জেনেটিক পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত। কেউ সত্য জানতে চান, আবার কেউ ভবিষ্যতের আশঙ্কা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চান। বার্বের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন ছিল—নিজের ভবিষ্যৎ না জানা কি সন্তানদের কাছ থেকে সত্য গোপন করা, নাকি তাদের কয়েকটি স্বাভাবিক বছর উপহার দেওয়া?

তবে বইটি শেষ পর্যন্ত আশার কথাই বলে। বার্ব রোগটির চিকিৎসা আবিষ্কারের জন্য সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ নেন। এফটিডি-তে আক্রান্ত পরিবারগুলো ‘কিউর এমএপিটি এফটিডি’ নামে একটি উদ্যোগ গড়ে তুলেছে, যার লক্ষ্য জিন থেরাপি ও টাউ কমানোর ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এগিয়ে নেওয়া।

ডিমেনশিয়া গবেষণায় দীর্ঘদিন আলঝেইমার রোগ এবং বিটা-অ্যামিলয়েড প্রোটিনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও, টাউ-কে লক্ষ্যবস্তু করে চিকিৎসা নিয়েও এখন গবেষণা বাড়ছে। লেখক এমন গবেষণার কথাও তুলে ধরেছেন, যেখানে টাউ-এর মাত্রা কমিয়ে সাধারণ আচরণগত অবক্ষয়ের গতি ধীর করার সম্ভাবনা দেখা গেছে।

‘দ্য ভ্যানিশিং ফ্যামিলি’ তাই শুধু একটি পরিবারের হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে দেখায়, একটি দুরারোগ্য বংশগত রোগের মুখোমুখি হয়েও মানুষ কীভাবে ভালোবাসা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশাকে আঁকড়ে ধরে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত