Ajker Patrika

সম্পর্কে বারবার সন্দেহ হচ্ছে? যেভাবে বুঝবেন এটি অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার লক্ষণ

নাহিন আশরাফ 
সম্পর্কে বারবার সন্দেহ হচ্ছে? যেভাবে বুঝবেন এটি অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার লক্ষণ
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন একই ধরনের প্রশ্ন বছরের পর বছর বারবার ঘুরেফিরে মনে আসে এবং কোনো উত্তরই মনকে স্থায়ীভাবে শান্ত করতে পারে না। ছবি: পেক্সেলস

ভালোবাসার সম্পর্কে কখনো মনে হতে পারে, সঙ্গী আগের মতো যত্নশীল নেই। কখনো মনে হতে পারে, এই মানুষটিই কি আমার জন্য সঠিক? আবার কখনো সঙ্গীর কোনো ছোট আচরণও অস্বাভাবিকভাবে চোখে পড়তে পারে। এসব ভাবনা একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন একই ধরনের প্রশ্ন বছরের পর বছর বারবার ঘুরেফিরে মনে আসে এবং কোনো উত্তরই মনকে স্থায়ীভাবে শান্ত করতে পারে না। সঙ্গী ভালোবাসে কি না, সম্পর্কটি ঠিক আছে কি না, নিজের অনুভূতিই সত্যি কি না—এসব নিয়ে বারবার ভাবতে ভাবতে যদি দিনের বড় একটা সময় কেটে যায়, তাহলে বিষয়টি অন্যভাবে দেখা দরকার।

চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘এই ধরনের সমস্যায় নিজের অনুভূতি নিয়েই সবচেয়ে বেশি সন্দেহ তৈরি হতে পারে। মনে হতে পারে, আমি কি সত্যিই ওকে ভালোবাসি? ওকে নিয়ে আগের মতো উত্তেজনা হয় না কেন? আমি কি ভুল মানুষকে বিয়ে করেছি?’

যত বেশি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হয়, ততই নতুন সন্দেহ তৈরি হতে পারে। ছবি: পেক্সেলস
যত বেশি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হয়, ততই নতুন সন্দেহ তৈরি হতে পারে। ছবি: পেক্সেলস

সানজিদা শাহরিয়া আরও জানান, একদিন হঠাৎ এমন একটি প্রশ্ন মনে এলেই তা গুরুতর সমস্যা নয়। কিন্তু প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার পরও যদি কিছুদিন পরপর আবার একই বিষয় নিয়ে সন্দেহ শুরু হয়, তখন সেটি চিন্তার একটি চক্রে পরিণত হতে পারে। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় মানুষ নিজের অনুভূতি পরীক্ষা করতে শুরু করেন। সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন, তাকে দেখে আগের মতো ভালো লাগছে কি না। একসঙ্গে সময় কাটিয়ে নিজের মনের প্রতিক্রিয়া খেয়াল করেন। অন্য দম্পতিদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের তুলনা করেন। এমনকি পুরোনো ছবি দেখে বোঝার চেষ্টা করেন, আগে বেশি ভালোবাসা ছিল কি না।’

এসবের উদ্দেশ্য সাধারণত নিজের মনে নিশ্চিত হওয়া। কিন্তু যত বেশি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হয়, ততই নতুন সন্দেহ তৈরি হতে পারে।

সঙ্গী আমাকে ভালোবাসে তো

যাঁরা সম্পর্কে এমন দুশ্চিন্তার শিকার হন, তাঁরা সঙ্গীর অনুভূতি নিয়েও অতিরিক্ত চিন্তিত হতে পারেন। ‘সে কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসে?’, ‘সে কি অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট?’, ‘সে কি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?’—এ ধরনের প্রশ্ন বারবার মাথায় ঘুরতে পারে।

সঙ্গীর একটি ছোট আচরণ তখন বড় সংকেত বলে মনে হতে পারে। সে একটু চুপ করে আছে—তাহলে কি রাগ করেছে? মুঠোফোনের বার্তার উত্তর দিতে দেরি করেছে—তাহলে কি আগ্রহ কমে গেছে? আগের মতো প্রশংসা করেনি—তাহলে কি ভালোবাসা কমে গেছে?

এখানে আসল সমস্যা সব সময় ঘটনাটি নয়; বরং একটি ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে মনের মধ্যে তৈরি হওয়া দীর্ঘ চিন্তার ধারাটিই সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বারবার নিশ্চয়তা চাওয়ার অভ্যাস

মনের অস্বস্তি কমানোর জন্য মানুষ সাধারণত কোনো না কোনো উপায় খোঁজেন। কেউ সঙ্গীকে বারবার জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?’ কেউ বন্ধু বা পরিবারের কাছে একই সম্পর্কের গল্প বলে মতামত চান।

আবার কেউ নিজের মনেই উত্তর খুঁজতে থাকেন। একই ঘটনা বারবার বিশ্লেষণ করেন সঙ্গী ওই কথাটি কেন বলল, কেন ওইভাবে তাকাল, কেন আজ ফোন করল না ইত্যাদি।

সাময়িকভাবে এসব করলে স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার একই প্রশ্ন ফিরে এলে বোঝা যায়, এভাবে নিশ্চয়তা খোঁজা স্থায়ী সমাধান দিচ্ছে না।

অন্যদের সঙ্গে তুলনা করেও বাড়তে পারে সন্দেহ

সানজিদা শাহরিয়া জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সন্দেহের সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। অন্য দম্পতিদের ছবি, ভালোবাসার প্রকাশ, ঘুরতে যাওয়া বা সুন্দর মুহূর্ত দেখে নিজের সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা শুরু হতে পারে। ‘তাদের সম্পর্ক এত সুন্দর, আমাদেরটা কেন এমন নয়?’ এই প্রশ্ন থেকে নিজের সম্পর্ক নিয়েও সন্দেহ তৈরি হতে পারে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা সম্পর্ক বাস্তব জীবনের সম্পূর্ণ ছবি নয়। তাই অন্য কারও সম্পর্কের দৃশ্যমান অংশ দিয়ে নিজের সম্পর্কের মান বিচার করলে অযথা অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

তাহলে কি প্রতিটি সন্দেহই সমস্যা

সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘একেবারেই নয়। সম্পর্কে সত্যিকারের সমস্যা থাকলে সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। সঙ্গী যদি নিয়মিত মিথ্যা বলেন, প্রতারণা করেন, অসম্মান করেন বা সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীল না হন, তাহলে বিষয়টি শুধু অতিরিক্ত চিন্তা বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।’

তবে একই প্রশ্ন যদি বারবার ফিরে আসে, উত্তর পাওয়ার পরও শান্তি না আসে এবং সেই চিন্তা যদি দিনের বড় একটা অংশ দখল করে নেয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষ করে যদি সম্পর্কের স্বাভাবিক মুহূর্তগুলো উপভোগ করার বদলে সারাক্ষণ সম্পর্ক ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করতে থাকেন, তাহলে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উপকারী হতে পারে।

যেভাবে এই চিন্তার চক্র থেকে বের হওয়া যায়

প্রথম কাজ হলো প্রতিটি সন্দেহের সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তর খুঁজতে না যাওয়া। মনে প্রশ্ন এসেছে মানেই তার উত্তর এখনই বের করতে হবে, এমন নয়। নিজেকে বলা যেতে পারে, ‘এই মুহূর্তে আমার মনে একটি সন্দেহ এসেছে। এটাকে সত্যি বা মিথ্যা প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই।’ বারবার সঙ্গীর কাছ থেকে নিশ্চয়তা চাওয়া, নিজের অনুভূতি পরীক্ষা করা, পুরোনো ঘটনা বিশ্লেষণ করা কিংবা অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের তুলনা করার অভ্যাসও ধীরে ধীরে কমানো দরকার।

তবে নিজের চেষ্টায় বিষয়টি সামলানো কঠিন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া ভালো। চিন্তা যদি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করে বা সম্পর্কের ওপর বড় প্রভাব ফেলে, তাহলে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।

সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মনে কোনো অনিচ্ছাকৃত চিন্তা আসা মানেই সেটি আপনার সত্যিকারের অনুভূতি নয়। মানুষের মনে নানা ধরনের চিন্তা আসতে পারে। প্রতিটি চিন্তার সঙ্গে লড়াই না করে তাকে শুধু একটি চিন্তা হিসেবে দেখতে শেখা অনেক সময় অস্বস্তির চক্র থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম ধাপ হতে পারে।’

ভালোবাসার সম্পর্কে সবকিছুর শতভাগ নিশ্চয়তা পাওয়া সম্ভব নয়। কোনো সম্পর্কেই প্রতিদিন একই রকম অনুভূতি থাকে না। কখনো খুব কাছের মনে হবে, কখনো অভিমান হবে, কখনো আবার দূরত্বও মনে হতে পারে। সম্পর্কের বাস্তবতা হলো, সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নয়, বরং কিছু অনিশ্চয়তাকে মেনে নিয়েও একসঙ্গে এগিয়ে চলা।

ছবি: পেক্সেলস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত