Ajker Patrika

যে রেস্তোরাঁয় কাজ পান শুধু ৭৫ বছরের ঊর্ধ্বে মানুষ

ফিচার ডেস্ক
যে রেস্তোরাঁয় কাজ পান শুধু ৭৫ বছরের ঊর্ধ্বে মানুষ

জাপানের ফুকুওকা প্রদেশে সকাল ঠিক ১০টা। উকিহা নো তাকারা নামের একটি রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে জড়ো হয়েছেন পাঁচজন নারী। বয়স ৮০ থেকে ৯০-এর মধ্যে। কেউ মাংস প্রস্তুত করছেন, কেউ বাঁধাকপি কাটছেন, আবার কেউ রান্নার মসলা গুছিয়ে নিচ্ছেন। অ্যাপ্রোন পরে কাজের ব্যস্ততায় দেখে বোঝার উপায় নেই তাঁরা অবসরপ্রাপ্ত নন, বরং নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মী। রেস্তোরাঁটির বিশেষত্ব এটাই। এখানে চাকরি পান শুধু ৭৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ। এমনকি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত প্রবীণেরাও এখানে কাজের সুযোগ পান।

‘দাদির চায়ের ঘর’

রান্না শেষ হলে এই প্রবীণ নারীরাই অতিথিদের সামনে খাবার পরিবেশন করেন। রেস্তোরাঁর ভেতরে রয়েছে ‘গ্র্যান্ডমাস টি রুম’, আরামদায়ক বসার জায়গা। সেখানে সাদা চুলের এই কর্মীরা শুধু খাবারই দেন না, সঙ্গে থাকে পারিবারিক আবহ। যেন নিজের বাড়ির দাদির হাতের রান্না।

ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনের গল্প

এই উদ্যোগ শুরু করেন ২০১৯ সালে ৪৫ বছর বয়সী মিতসুরু ওকুমা। তিনি জানান, অনেক প্রবীণ মানুষের কাছ থেকে তিনি একধরনের কষ্টের কথা শুনতেন। তাঁদের একাকিত্ব ও আর্থিক অনিশ্চয়তা। তাঁরা বলতেন, শুধু পেনশনের টাকায় স্বচ্ছন্দে চলা যায় না। আবার কাজ করতে চাইলেও যাতায়াতের খরচ বা সুযোগ থাকে না। জাপানে বৃদ্ধদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। কিন্তু ওকুমার বিশ্বাস, তাঁদের আজীবনের রান্না, সেলাই কিংবা গৃহস্থালির দক্ষতা অমূল্য সম্পদ। তাই তিনি তাঁদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে না নিয়ে নিয়মিত কর্মচারী হিসেবে চুক্তিবদ্ধ করেন এবং মাসিক বেতন দেন।

তাঁর মতে, এতে প্রবীণেরা নিজ এলাকায় আয় করেন এবং সেই অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতেই ব্যয় করেন। ফলে অর্থের প্রবাহ কমিউনিটির ভেতরেই ঘুরে বেড়ায়।

কাজের আনন্দে নতুন জীবন

৮৫ বছর বয়সী মাসাকো তানিগুচি বর্তমানে এই রেস্তোরাঁর প্রধান রাঁধুনি। বহু বছর বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় কাজ করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগান তিনি। প্রতিটি খাবার পরিবেশনের পর অতিথিদের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেন। হাসিমুখে মাসাকো বলেন, ‘ক্রেতারা যখন খাবারের প্রশংসা করেন, তখন মনে হয় আমি এখনো কাজে লাগছি। এ বয়সেও নিজেকে একা মনে হয় না। এ কাজের মধ্য দিয়ে আমি প্রতিদিন নতুন করে বাঁচি।’

উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ছে অন্য জায়গায়ও

এই মানবিক মডেল এখন ফুকুওকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। ওয়াকায়ামা প্রদেশে ২৯ বছর বয়সী মোয়ে ওগা ‘গ্র্যান্ডমাস বার’ চালু করেছেন। তাঁর দাদি একসময় ছোট একটি বার চালাতেন। কোভিড-১৯-এর সময় সেটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে দাদি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ওগা জানান, ‘আমি এমন একটি জায়গা তৈরি করতে চেয়েছি, যেখানে বিভিন্ন প্রজন্ম একসঙ্গে বসে গল্প করতে পারে।’ এখন তাঁর দাদি আবার অতিথিদের সঙ্গে কথা বলেন, হাসেন।

অন্যদিকে কুমামোতো প্রদেশে ৫১ বছর বয়সী ইউকিকো সুকামোতো। যিনি একটি প্রবীণনিবাস পরিচালনা করেন, আগামী মার্চে ‘গ্র্যান্ডমাস ক্যাফে’ চালুর পরিকল্পনা করছেন। সেখানে কর্মী হবেন নিবাসের প্রবীণ বাসিন্দারাই।

একটি উৎসবে পরীক্ষামূলকভাবে তাঁদের দিয়ে কাজ করানো হয়েছিল। সুকামোতো বলেন, ‘আমি অবাক হয়েছিলাম। তাঁরা আগের চেয়ে বেশি চঞ্চল ও প্রফুল্ল হয়ে উঠেছিলেন। অনেকেই বলেছিলেন, উপার্জনের টাকা দিয়ে নতুন কাপড় কিনতে চান।’

বার্ধক্যের নতুন সংজ্ঞা

এই উদ্যোগ প্রমাণ করে বার্ধক্য মানেই নিঃসঙ্গতা বা অক্ষমতা নয়। উপযুক্ত সুযোগ পেলে প্রবীণেরাও সমাজের সক্রিয় অংশ হতে পারেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দিক থেকেও মূল্যবান।

ফুকুওকার এই রেস্তোরাঁ দেখিয়ে দিচ্ছে, কাজ করার উদ্দেশ্য শুধু উপার্জন করা নয়। বিশেষ করে প্রবীণদের জন্য এটি আত্মসম্মান ফিরে পাওয়ার উপায়। অনেকেই অবসরের পর নিজেকে অপ্রয়োজনীয় বা একা মনে করেন। কিন্তু এখানে কাজের সুযোগ পেয়ে তাঁরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠছেন, নতুন মানুষের সঙ্গে মিশছেন, নিজের দক্ষতা কাজে লাগাচ্ছেন।

সূত্র: জাপান টাইমস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত