Ajker Patrika

সবচেয়ে দামি চিজের নাম ‘গাধার বাচ্চা’, তৈরি হয় গাধার দুধ থেকে

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
সবচেয়ে দামি চিজের নাম ‘গাধার বাচ্চা’, তৈরি হয় গাধার দুধ থেকে
বিশ্বের সবচেয়ে দামি পনির তৈরি হয় বিলুপ্তপ্রায় বলকান গাধার দুধ থেকে। বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র গাধার দুধের এই পনিরের নাম পুলে। ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

রান্নার টেবিলে চিজ বলতেই চোখ বুজে মনে ভেসে ওঠে গলে পড়া সুস্বাদু কোনো পাস্তা বা পিৎজার ফ্রেম। কিন্তু রাজকীয় আভিজাত্য আর দুষ্প্রাপ্যতার সমীকরণে যদি এক কেজি চিজের দাম ১ হাজার ইউরো ছাড়িয়ে যায়? তখন তা শুধু একটি খাবার থাকে না। হয়ে ওঠে এক শিল্পকর্ম। এটি আবার কোনো সোনা বা হীরা দিয়ে মোড়ানো চিজ নয়। এটি সাধারণ কোনো ডেইরি ফার্মের গরু বা ভেড়ার দুধেও তৈরি হয় না। বিশ্বের সবচেয়ে দামি এই পনিরের জন্ম হয় বিলুপ্তপ্রায় বলকান গাধার দুধ থেকে। শুনতে খানিকটা অদ্ভুত লাগলেও এটিই এখন দুনিয়ার সবচেয়ে এক্সক্লুসিভ খাবার। বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র গাধার দুধের এই পনিরের নাম পুলে। দুষ্প্রাপ্য গাধা, বিশেষ উৎপাদন প্রক্রিয়া, কঠোর আইনি বিধিনিষেধ এবং শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস নিয়ে গড়ে ওঠা পুলে পনিরের পেছনের চমকপ্রদ গল্পটি সত্যিই অদ্ভুত।

যেভাবে শুরু হলো পুলের গল্প

বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র গাধার দুধের তৈরি পনির পুলে। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র গাধার দুধের তৈরি পনির পুলে। ছবি: সংগৃহীত

গল্পের শুরু ১৯৯৭ সালে। সার্বিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য ও পরিবেশবিদ স্লোবোদান সিমিচ সার্বিয়ার জাসাভিকা স্পেশাল নেচার রিজার্ভ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বিলুপ্তপ্রায় বলকান জাতের গাধাগুলো রক্ষা করা। কিন্তু গাধার পাল বাড়তে বাড়তে যখন প্রায় ২০০টিতে পৌঁছাল, সিমিচ দেখলেন, তাঁর কাছে উপচে পড়া গাধার দুধ জমে আছে। এত দুধ নিয়ে কী করবেন ভেবে না পেয়ে বেলগ্রেডের এক পনির প্রস্তুতকারকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, এই দুধ থেকে তৈরি হবে পনির। আর এভাবেই জন্ম নেয় বিশ্বের প্রথম গাধার দুধের পনির পুলে। সার্বিয়ান ভাষায় এর অর্থ গাধার বাচ্চা বা ফয়েল।

কেন এত আকাশছোঁয়া দাম

সার্বিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য ও পরিবেশবিদ স্লোবোদান সিমিচ প্রতিষ্ঠিত জাসাভিকা স্পেশাল নেচার রিজার্ভ-এ বিলুপ্তপ্রায় বলকান গাধা। ছবি: সংগৃহীত
সার্বিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য ও পরিবেশবিদ স্লোবোদান সিমিচ প্রতিষ্ঠিত জাসাভিকা স্পেশাল নেচার রিজার্ভ-এ বিলুপ্তপ্রায় বলকান গাধা। ছবি: সংগৃহীত

এই পনিরের এত দামের মূল কারণ লুকিয়ে আছে এর জটিল উৎপাদন প্রক্রিয়ায়। গরু দিনে প্রায় ৫৭ লিটার বা তারও বেশি দুধ দিতে পারে। কিন্তু একটি গাধী দিনে দুই লিটারের কম দুধ দেয়। অর্থাৎ আধা গ্যালনের কম। আবার গাধীর দুধ পেতে তার বাচ্চা হওয়া পর্যন্ত অন্তত তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়। যন্ত্র দিয়ে গাধার দুধ দোয়ানো একেবারেই অসম্ভব। গাধারা এতই একগুঁয়ে যে শুধু বাচ্চার উপস্থিতিতে এবং মানুষের হাতে দিনে তিন বেলা দুধ দেয়। এদিকে প্রতি এক কেজি পুলে চিজ তৈরি করতে প্রয়োজন হয় প্রায় ২৫ লিটার দুধ!

উৎপাদন কৌশল ও অনন্য স্বাদ

পুলে শতভাগ গাধার দুধে তৈরি হয় না। এতে ৬০ ভাগ গাধার দুধের সঙ্গে ৪০ ভাগ ছাগলের দুধ মেশানো হয়। বিশেষ প্রযুক্তি, নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া ও উপাদানের মিশ্রণে এই দুধ জমাট বাঁধিয়ে ছোট ছোট ৫০ গ্রামের গোল্ডেন পিরামিড আকারে ছাঁচে ঢেলে তৈরি করা হয় পনির। স্বাদে এটি স্প্যানিশ মানচেগো পনিরের মতো কিছুটা ভঙ্গুর এবং হালকা হলদেটে। এর স্বাদ মৃদু মিষ্টি-টক। গাধার দুধে গরুর দুধের চেয়ে ভিটামিন সি-এর পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। সার্বিয়ানরা ঐতিহ্যগতভাবে শূকর বা গাধার মাংসের সসেজ এবং স্থানীয় ফল থেকে তৈরি ব্র্যান্ডি রাকিজার সঙ্গে পাতলা করে কাটা পুলে পনির পরিবেশন করে থাকেন।

দ্বিধা কাটিয়ে বিশ্বজুড়ে তুমুল কদর

শুরুর দিকে সিমিচের বন্ধুরাও এই চিজ মুখে তুলতে চাননি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ধনী রুশ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ইউক্রেনীয় ব্যাংকাররা স্রেফ এই পনির কিনতে সার্বিয়ার সেই ফার্মে ছুটে আসেন। শোনা যায়, মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা তাঁর রূপ ধরে রাখতে এই গাধার দুধে গোসল করতেন। গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস এই গাধার দুধ ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতেন। সেই দুধের তৈরি পনিরের কদর তো হওয়ারই কথা।

আইনি বাধা ও বিরল অভিজ্ঞতা

আপনি চাইলেও নিজের শহরের সুপারশপ থেকে পুলে কিনতে পারবেন না। সার্বিয়ার সরকারি ডেইরি তালিকায় গরু, ছাগল বা ভেড়ার দুধের উল্লেখ থাকলেও গাধার দুধের কোনো আইনি অনুমোদন বা স্বীকৃতি নেই। ফলে এই পনির বিদেশে রপ্তানি করা বা বাণিজ্যিক উৎপাদন করা আইনত নিষিদ্ধ। তাই বিশ্বের সবচেয়ে দামি এই পনিরের স্বাদ নিতে হলে আপনাকে ব্যাগ গুছিয়ে সোজা চলে যেতে হবে সার্বিয়ার জাসাভিকা রিজার্ভের সেই ফার্মেই। ইতিহাস, যত্ন আর বিরলতার এমন মিশেল বলেই তো পুলে শুধু এক টুকরো পনির নয়, একেকটি শিল্পকর্ম।

সূত্র: বিবিসি, বিজনেজ ইনসাইডার, দ্য টেক আউট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত