সমুদ্রের তলদেশে প্রাচীনতম জাহাজের সন্ধান, কী আছে এতে

ভূমধ্যসাগরের তলদেশে মিলল ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন এক রত্নভান্ডার। তুরস্কের আন্তালিয়া উপকূলের কাছে কেকোভা দ্বীপের জলসীমায় প্রত্নতাত্ত্বিকেরা খুঁজে পেয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। প্রাথমিক গবেষণায় জাহাজটিকে ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৭০০ বছর আগের বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সময়কালকে বলা হয় প্রাথমিক ব্রোঞ্জ যুগ। অর্থাৎ, মিসরের বিখ্যাত গিজার পিরামিড তৈরির সময়কালে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানো এই জলযানের সমুদ্রতলে সলিলসমাধি হয়।
উপকূল থেকে খুব কাছে, মাত্র ৩০ মিটার পানির নিচে একটি ঢালু অংশে ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় আবিষ্কৃত হয়েছে তিনটি বিশাল পাথরের নোঙর। আরও আছে ৩০টির বেশি বিশেষ মাটির পাত্র বা ‘অ্যামফোরা’। পানিতে চার হাজার বছরের বেশি সময় ধরে ডুবে থাকার কারণে কাঠ দিয়ে তৈরি জাহাজের মূল কাঠামো পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। তবে টিকে রয়েছে সমান তলা, জোড়া হাতল ও মাঝখানে খাঁজকাটা অনবদ্য নকশার এসব সিরামিকের পাত্র।
ঐতিহাসিক বাণিজ্য-সংযোগ
জাহাজের কাঠ না থাকায় রেডিওকার্বন ডেটিং সম্ভব ছিল না। তবে সিরামিক পাত্রের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে এর সঠিক সময়সীমা উন্মোচিত হয়েছে। তুরস্কের আকদেনিজ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. হাকান ওনিজের নেতৃত্বে ও আন্তালিয়া জাদুঘরের পরিচালকের অধীনে ২০২৬ সালে শুরু হওয়া এই অভিযানে সিরামিকের নকশা মিলিয়ে দেখা যায়। মাটির উপাদান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব পাত্র জর্ডান উপত্যকার কোনো কারখানায় তৈরি। এই ধরনের সিরামিক পাত্রের উপস্থিতি আগে মিসর (গিজা, সাক্কারা, আবুসির), প্রাচীন ট্রয় নগরী ও ক্রিটের মিনোয়ান সভ্যতায় দেখা গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, ১০ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট এই বাণিজ্য তরি লেভান্ত বা ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করে প্রাচীন ট্রয় নগরী বা ক্রিট দ্বীপের দিকে যাচ্ছিল। এটি প্রমাণ করে, ব্রোঞ্জ যুগেও ভূমধ্যসাগরজুড়ে বিস্তৃত অঞ্চলের মাঝে উন্নত আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক বাণিজ্যের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ছিল।
পাত্রের ভেতরের রহস্য ও নাবিকদের রহস্যময় জীবন
উদ্ধার করা পাত্রগুলো পরীক্ষার সময় এক অবিশ্বাস্য চমকের সম্মুখীন হন অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি ইউনিভার্সিটির প্রত্নতাত্ত্বিক ড. কারিন সোভাডা। পাত্রগুলোর ভেতরে এখনো মোমের মতো মসৃণ ঘন তরলের অবশিষ্টাংশ সংরক্ষিত রয়েছে। গবেষক দল ধারণা করছে, এগুলো জলপাই তেল, ওয়াইন বা গাছের রজন হতে পারে। আবার বড় আকারের এই পাত্রগুলো একাধিকবার ব্যবহারের ফলেও ভেতরের প্রলেপটি জমাট বাঁধতে পারে। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারটি হলো পাত্রের গায়ে দুটি ছিদ্র এবং ৯টি বিশেষ চিহ্নযুক্ত একটি নির্দিষ্ট অ্যামফোরা। প্রাথমিক মূল্যায়নে মনে করা হচ্ছে, এটি দুধ থেকে মাখন বা পনির তৈরির পাত্র। যা থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অনুমান করছেন, সেকালের নাবিকেরা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় নিজেরা ব্যবহারের জন্য ছাগল সঙ্গে রাখতেন এবং তা থেকে টাটকা দুধ পান কিংবা দুগ্ধজাত খাবার তৈরি করতেন। এটি প্রাচীনকালের সমুদ্রযাত্রীদের জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের এক বিরল চিত্র তুলে ধরে।

নতুন রেকর্ড ও প্রদর্শনীর প্রস্তুতি
এই আবিষ্কারের মাধ্যমে কেকোভার জাহাজটি বর্তমানে বিশ্বের প্রাচীনতম জাহাজের ধ্বংসাবশেষ হিসেবে স্থান অধিকার করেছে। এর আগে গ্রিসের দোকোস দ্বীপের কাছে পাওয়া ৪ হাজার ২০০ বছর আগের ধ্বংসাবশেষটি প্রাচীনতমের তকমা ধরে রেখেছিল। কাঠ অক্ষত থাকা সবচেয়ে প্রাচীন অক্ষত জাহাজের ধ্বংসাবশেষটি কৃষ্ণাঙ্গ সাগরে বুলগেরিয়া উপকূলে আবিষ্কৃত হয়। জাহাজটি প্রায় ২ হাজার ৪০০ বছর আগের।
তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী মেহমেত নুরি এরসোয় জানিয়েছেন, এই ঐতিহাসিক টাইম ক্যাপসুলটি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আন্তালিয়ায় ‘মেডিটেরেনিয়ান আন্ডারওয়াটার আর্কিওলজি মিউজিয়ামে’ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। কেকোভার প্রতিকূল বাতাস ও স্রোত ইতিহাসের অনেক জলযান গিলে খেলেও আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের এক অজানা নাবিকের স্মৃতিকে বিশ্বের সামনে নতুন করে জীবিত করে তুলেছে এই অবিস্মরণীয় আবিষ্কার।
সূত্র: আফ্রিকা নিউজ, বিবিসি









