সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন, মন খারাপ নাকি জৈবিক গোলযোগ

ভোর চারটায় অ্যালার্ম বেজে উঠলেও বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করে না। রাতের পর রাত ছটফট করেও যখন ঘুম আসে না, তখন মনে হয় মাথার ভেতরে যেন একটা ঘড়ি উলটো দিকে চলছে। মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশনকে আমরা সাধারণত মন খারাপ বা জীবনের কোনো কঠিন পরিস্থিতির ফল হিসেবেই জানি। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, এর পেছনে শারীরিক বা জৈবিক একটি বড় কারণ থাকতে পারে। আর সেটা হলো আমাদের শরীরের ভেতরের ২৪ ঘণ্টার অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’-এর গোলযোগ!
সম্প্রতি ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অস্ট্রেলিয়ার এক বিশাল গবেষণার ডেটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রায় প্রতি চারজনে একজনের (প্রায় ২৩ শতাংশ) ডিপ্রেশনের পেছনে মূল ভূমিকা রাখতে পারে এই ‘সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন’ বা অভ্যন্তরীণ ঘড়ির অসঙ্গতি। বিষয়টি একটু সংবেদনশীল, কারণ আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য সব সময়ই অত্যন্ত গভীর ও জটিল একটি বিষয়।
সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন আসলে কী
আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে একটি ছোট্ট জৈবিক ঘড়ি রয়েছে, যা ঘুম, ক্ষুধা, শরীরের তাপমাত্রা এবং হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে। এই ঘড়িটি যখন বাইরের বাস্তব দুনিয়া বা রুটিনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, তখনই শুরু হয় বিপত্তি। বাস্তব জীবনের একটি পরিচিত উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, অফিসের চাপ বা ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজের সুবাদে কেউ নিয়মিত রাত জেগে ভোর ৩টায় ঘুমাতে যান এবং দুপুর ১২টায় ওঠেন। কিন্তু সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম বা অফিসের শিফট সকাল ৯টার হওয়ায় তাকে জোর করে ভোরে উঠতে হয়। এই যে শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি এবং সামাজিক রুটিনের অমিল, বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘সোশ্যাল জেটল্যাগ’। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে শুধু ঘুম নষ্ট হয় না, বরং মস্তিষ্কের মুড নিয়ন্ত্রণকারী রাসায়নিক ভারসাম্যও ভেঙে পড়ে।

লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য
গবেষণা বলছে, সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের শিকার হওয়া মানুষেরা কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ প্রকাশ করেন:
রাত জাগা স্বভাব: এরা সাধারণত রাত জাগতে পছন্দ করেন এবং সকালে চরম ক্লান্তিবোধ করেন।
অল্প বয়সে লক্ষণ প্রকাশ: সাধারণ ডিপ্রেশনের চেয়ে এই সমস্যাটি তুলনামূলক কম বয়সে শুরু হতে পারে এবং এর পুনরাবৃত্তি বেশি ঘটে।
শারীরিক পরিবর্তন: মন খারাপের পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি, কম শক্তি এবং কখনো কখনো বাইপোলার ফিচারের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ওষুধে কম কাজ করা: সাধারণ অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা এসএসআরআই (SSRIs) ওষুধগুলো এই ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে আশানুরূপ ফল দেয় না।
কেন প্রথাগত ওষুধে কাজ হয় না
ডা. থিয়া গ্যালাগার এবং ডা. ক্রিস্টোফার উইন্টার নামের দুই প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞের মতে, সমস্যাটি যখন মস্তিষ্কের জৈবিক সময়ের ভুল বিন্যাসের কারণে হয়, তখন শুধু মানসিক চিকিৎসার পাশাপাশি শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়িকে রি-সেট করা জরুরি। যেহেতু প্রথাগত ওষুধে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল মেলে না, তাই চিকিৎসকরা এখন ‘ক্রোনোথেরাপি’ বা শরীরকে সঠিক সময়ে আলো ও বিশ্রামের মধ্যে রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন। যেমন—সকালের মিষ্টি রোদে সময় কাটানো, ঘুমানোর আগে স্ক্রিন টাইম কমানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক সময়ে মেলাটোনিন ব্যবহার করা।
করণীয় ও সচেতনতা
আপনার বা আপনার পরিচিত কারও যদি দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের অনিয়ম, অতিরিক্ত ক্লান্তি আর গভীর মানসিক অবসাদ চলতে থাকে, তবে একে কেবল সাধারণ মন খারাপ ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং একটি শারীরিক ও জৈবিক জটিলতা হতে পারে। সময়মতো একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া এবং নিজের দৈনন্দিন রুটিন ও ঘুমের অভ্যাসে পজিটিভ পরিবর্তন আনা এই সংকট থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস










