Ajker Patrika

সন্তানকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলবেন যেসব কারণে

ফিচার ডেস্ক
সন্তানকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলবেন যেসব কারণে
ছবি: সংগৃহীত

একজন মেধাবী সন্তানের অভিভাবক হওয়া গর্বের বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে তা এক অলিখিত চাপের কারণও বটে। আমাদের সমাজ মনে করে, যে শিশু পড়াশোনায় ভালো, তার আর কোনো জীবনদক্ষতার প্রয়োজন নেই। ‘ও তো ক্লাসে ফার্স্ট হচ্ছে, ওর আবার রান্নাবান্না বা বাজার করার দরকার কী?’ এমন কথা আমাদের প্রায়ই শুনতে হয়। কিন্তু সত্যটা হলো, শুধু পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাওয়া জীবনের পরীক্ষায় সফল হওয়ার গ্যারান্টি দেয় না। আবার সব সময় ভালো করতে থাকা সন্তান কোনো কারণে একটু খারাপ রেজাল্ট করলে তাকে শুনতে হয় অনেক কথা। সেই চাপ সামলে উঠতে না পারলে ঘটতে পারে যেকোনো দুর্ঘটনা। তাই অভিভাবক হিসেবে সচেতন থাকতে হবে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য।

আপনার সন্তান ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করছে, এটি দারুণ বিষয়। কিন্তু সে কি নিজের আবেগ সামলাতে পারে? সে কি বন্ধুর সঙ্গে বিবাদ মেটাতে পারে? সে কি নিজের ঘর গুছিয়ে রাখতে পারে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে জানবেন, আপনি একজন সফল অভিভাবক। আপনার সন্তান এখন শুধু পড়াশোনায় সেরা নয়, সে জীবনের প্রতিটি ধাপে ডানা মেলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

রেজাল্টই সব নয়

সন্তান পড়াশোনায় তুখোড় হওয়া সত্ত্বেও ছোটখাটো সমস্যা সমাধানে বা আবেগ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে পারে অনেক সময়। এটি শুধু আপনার সন্তানের সমস্যা নয়, এটি বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় সংকট। অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে গিয়ে বা কর্মজীবনে প্রবেশ করে তীব্র হতাশায় ভোগে; যার ফল ভয়াবহ হতে পারে। এর জন্য অনেকে অনেক সময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তাদের মেধার অভাব নেই, কিন্তু অভাব আছে লাইফ স্কিল বা জীবন চালানো দক্ষতার। তারা একা থাকতে জানে না, নিজের যত্ন নিতে জানে না কিংবা অন্যের সঙ্গে মিশতে জানে না। লাইফ স্কিল শেখা না থাকলে সন্তানকে দূরে থেকে সহায়তা করা সম্ভব নয়। তাই কাছে থাকাকালীন জীবনমুখী কিছু শিক্ষা দিয়ে তাদের বড় করতে হবে; যাতে কঠিন সময়েও তারা দুমড়েমুচড়ে না যায়।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

পড়ার টেবিল থেকে বাস্তব পৃথিবীতে আনুন

এখন শিক্ষার্থীরা শুধু স্কুলেই তাদের লেখাপড়া শেষ করে না, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ফল ভালো করতে তারা আরও প্রাইভেট টিউটর বা কোচিংয়ের শরণাপন্ন হয়। সেই দিকগুলো নিয়েই অভিভাবকেরা বেশি ভাবেন। কিন্তু এরই ফাঁকে যদি আপনি তাকে একটু বাজারে পাঠান, রান্না শেখান কিংবা খেলাধুলা করতে উৎসাহ দেন, তাহলেই সে আরও অন্য কিছুর স্বাদ পায়। তখন তাদের জীবন আর একঘেয়েমি ঘিরে থাকে না।

পাটিগণিতের কঠিন অঙ্ক থেকে শুরু করে বাজারে পেঁয়াজের কেজি জানা শিশুরা বড় হয় বাস্তব জ্ঞান নিয়ে। কিংবা যে ছেলে বা মেয়েটি রসায়নের কঠিন যৌগের গঠন জানে এবং পাশাপাশি ফুটবলও খেলে, তাদের জীবন সম্পর্কে ধারণা আরও গভীর হয়। শুধু জীবনবোধের জন্য নয়, সন্তানকে আত্মনির্ভরশীলতা শেখানোর জন্য প্রথম শিক্ষক তার অভিভাবক। নিজের কাজ নিজে করতে শিখলে সন্তানের মধ্যে একধরনের আত্মতৃপ্তি ও স্বাধীনতা তৈরি হয়।

এর পাশাপাশি আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখাতে হবে। বাস্তব জীবনের ছোট ছোট হারজিত তাকে মানসিক চাপ সামলাতে শেখায়, যা কোনো পাঠ্যবই শেখাতে পারে না। এর জন্য তাকে হোম টিউটরের কাছে পড়া শেখার পাশাপাশি মাঠেও খেলতে যেতে হবে। অন্যের কথা শোনা এবং নিজের মতামত প্রকাশ করতে শিখলে সে ভবিষ্যতে একজন ভালো নেতা বা সহকর্মী হতে পারবে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

গবেষণার চোখে আদর্শ সন্তানের গুণাবলি

‘পিজিএল বিয়ন্ড’-এর একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ৬৬ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন, একটি সন্তানের সফলভাবে বেড়ে ওঠার প্রধান লক্ষণ হলো তার কর্মনিষ্ঠা। এ ছাড়া আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ গুণ আছে।

সম্মানবোধ: বড়দের শ্রদ্ধা করা এবং অন্যের মতামতের মূল্যায়ন করা।

ব্যবহারিক জ্ঞান: নিজের ঘর গোছানো, নিয়মিত বিছানার চাদর বদলানো এবং বুদ্ধিদীপ্তভাবে অর্থ ব্যয় করা।

মুক্তচিন্তা: নিজের বুদ্ধিতে সমস্যার সমাধান করা এবং স্মার্টফোন বা স্ক্রিনের বাইরেও জগৎকে চিনতে শেখা।

সেরা পদ্ধতি ‘ভুল করে শেখা’

সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৬ শতাংশ অভিভাবক এখন বিশ্বাস করেন, ভুল করতে করতে শেখা স্বাবলম্বী হওয়ার সেরা উপায়। ৮৫ শতাংশ অভিভাবক আফসোস করেছেন, তাঁরা যদি ছোটবেলায় সন্তানদের আরও বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতেন, তবে তারা আজ আরও শক্তভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারত। সন্তানকে স্বাবলম্বী করে তোলা মানে তাকে অবহেলা করা নয়। এটি তাকে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শক্তিশালী ভিত্তি দেয়। পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান তাকে ডিগ্রি দেবে। কিন্তু জীবনদক্ষতা তাকে একটি সুন্দর জীবন দেবে। সন্তানকে পাখির মতো খাঁচায় বন্দী করে মেধাবী বানানোর চেয়ে তাকে ডানা ঝাপটাতে শেখানো এবং খোলা আকাশে ওড়ার সাহস দেওয়াটাই অভিভাবকত্বের আসল সার্থকতা। আপনার এই সিদ্ধান্তই একদিন সন্তানকে এক পরিপূর্ণ ও সহনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।

সূত্র: ডেইলি মেইল

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত