Ajker Patrika

টুথপেস্ট ছাড়াও যেসব উপকরণে রয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, জেনে নিন এগুলো শরীরের কী ক্ষতি করে

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
টুথপেস্ট ছাড়াও যেসব উপকরণে রয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, জেনে নিন এগুলো শরীরের কী ক্ষতি করে
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বহু পরিচিত উপকরণেই মাইক্রোপ্লাস্টিক লুকিয়ে রয়েছে। ছবি: পেক্সেলস

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার ঘটনায় বর্তমানে কমবেশি সবাই আমরা চিন্তিত। কিন্তু অনেকে হয়তো জানি না, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বহু পরিচিত উপকরণেই মাইক্রোপ্লাস্টিক লুকিয়ে রয়েছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু নিজেই ক্ষতিকর নয়, বরং এটি তার অতি ক্ষুদ্র আকারের কারণে সিসা, ক্যাডমিয়ামসহ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকেও নিজের শরীরে আটকে রাখে। ফলে যখন এটি আমাদের শরীরে প্রবেশ করে, তখন সেই বিষাক্ত উপাদানগুলোকেও বহন করে শরীরের ভেতরের কোষগুলোতে ছড়িয়ে দেয়।

প্রতিদিন ব্যবহৃত যেসব উপকরণে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে

ফেসওয়াশ ও রেডিমেড স্ক্র‍্যাবের মাইক্রোবিডসে প্লাস্টিক থাকে। রোজকার ব্যবহৃত টুথপেস্ট, লিপস্টিক, আইলাইনার, নেইলপলিশে এটি ব্যবহৃত হয়। শিশুদের পরিচ্ছন্নতায় ব্যবহৃত ওয়েট ওয়াইপসও প্লাস্টিক ফাইবারে তৈরি। এ ছাড়া পলিয়েস্টার ও নাইলনের পোশাক, ডিটারজেন্ট পাউডার, টি-ব্যাগ, নন-স্টিক প্যানের ওপরের স্তর, ওয়ানটাইম কাপ, সিগারেটের ফিল্টার, প্লাস্টিকের বোতলে রাখা পানি কিংবা লবণেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। এমনকি যে চপিংবোর্ডের ওপর কাটাকুটি করা হয়, সেখান থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক খাবারে মিশে যেতে পারে।

রোজকার ব্যবহৃত টুথপেস্ট, লিপস্টিক, আইলাইনার, নেইলপলিশে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস
রোজকার ব্যবহৃত টুথপেস্ট, লিপস্টিক, আইলাইনার, নেইলপলিশে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস

মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে শরীরের যেসব ক্ষতি হতে পারে

খাবার, পানি, বাতাস ও প্রসাধনীর মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে জমা হয়ে নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, অন্ত্র, মস্তিষ্ক এমনকি নবজাতকের প্লাসেন্টাতেও এই ক্ষতিকর কণার উপস্থিতি মিলেছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করে প্রধানত যে ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে—

হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি

রক্তনালিতে চর্বি জমার পাশাপাশি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা যুক্ত হলে রক্ত জমাট বাঁধার আশঙ্কা বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের রক্তনালিতে প্লাস্টিকের কণা থাকে, তাদের পরবর্তী সময়ে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

পরিপাকতন্ত্র ও অন্ত্রের ক্ষতি

অন্ত্রের দেয়ালে প্লাস্টিক কণা প্রতিনিয়ত ঘর্ষণ তৈরি করে, যা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সৃষ্টি করে। এটি আমাদের অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়ার বেড়ে ওঠার পরিবেশ নষ্ট করে দেয়। ফলে হজমপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

ফুসফুসের সমস্যা বাড়ায়

বাতাসের মাধ্যমে শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করা প্লাস্টিক কণা ফুসফুসের কোষের ক্ষতি করে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং অ্যাজমার মতো জটিল রোগের প্রকোপ বাড়ে।

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও প্রজনন সমস্যা

প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান; যেমন থ্যালেটস বা বিসফেনল শরীরে হরমোন উৎপাদন এবং এর কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করে। গবেষণায় পুরুষ ও নারীর প্রজননতন্ত্রে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি মিলেছে, যা শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মান কমিয়ে দেয় এবং প্রজননক্ষমতা কমাতে পারে।

স্মৃতিভ্রম ও স্নায়ুর ক্ষতি

অবাক লাগলেও এটাই সত্য়ি, অতি ক্ষুদ্র ন্যানো প্লাস্টিক কণা রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারে। এটি মস্তিষ্কের কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করে আলঝেইমার, ডিমেনশিয়া বা পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ডিএনএর ক্ষতি

প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা কোষে দীর্ঘস্থায়ী বিষাক্ততা তৈরি করে কোষের ডিএনএর ক্ষতি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন ক্যানসার গবেষণা সংস্থার মতে, প্লাস্টিকের ক্ষতিকর টক্সিন কোলন ক্যানসার এবং ফুসফুসের ক্যানসারের অন্যতম কারণ হতে পারে।

ঝুঁকি এড়াতে যেভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার কমাবেন

দৈনন্দিন জীবন থেকে প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি দূর করা কঠিন হলেও কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এর সংস্পর্শে আসার হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য যা করতে পারেন—

  • কাচ, সিরামিক বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করুন। প্লাস্টিকের পানির বোতল এবং খাবারের পাত্র বাদ দিয়ে কাচ, স্টেইনলেস স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করুন।
  • প্লাস্টিকের চপিং বা কাটিং বোর্ডের বদলে কাঠের তৈরি বোর্ড ব্যবহার করুন।
  • ‘মাইক্রোওয়েভ সেফ’ লেখা থাকলেও প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করবেন না। গরম করার সময় প্লাস্টিক থেকে প্রচুর মাইক্রোপ্লাস্টিক খাবারে মেশে।
  • টি-ব্যাগের চা খাওয়া বাদ দিয়ে কেটলি বা পাত্রে খোলা চা-পাতা দিয়ে চা তৈরি করুন।
  • পানি রাখার জন্য বা কোথাও বয়ে নেওয়ার জন্য প্লাস্টিকের বোতলের পরিবর্তে কাচের বিভিন্ন আকারের বোতল ব্যবহার করুন।
  • মাইক্রোবিডস যুক্ত ফেসওয়াশ বা স্ক্রাব বাদ দিয়ে চালের গুঁড়া, কফি, চিনি বা বেসনের মতো প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করুন।
  • ঘরের ধুলাবালিতে প্রচুর মাইক্রোপ্লাস্টিক ফাইবার থাকে। তাই ঘর নিয়মিত ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে পরিষ্কার করার অভ্যাস করুন।

সূত্র: সায়েন্স ডিরেক্ট, স্ট্যানফোর্ড মেডিসিন ও অন্যান্য

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত