Ajker Patrika

আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সময় এখনই

অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া
আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ২৩
আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সময় এখনই
ছবি: সংগৃহীত

জীবনের জটিল সমীকরণে যখন চারপাশের সবকিছু অন্ধকার মনে হয়, তখন আত্মহত্যার মতো একটি ক্ষণিকের সিদ্ধান্ত নিভে দেয় বহু সম্ভাবনাময় দীপ। এটি কেবল একজন ব্যক্তির জীবনাবসান নয়, বরং এক গভীর বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে পৃথিবী থেকে ঝরে যায় একটি মূল্যবান প্রাণ। আর প্রতিবছর বাংলাদেশেই অকালে ঝরে যাচ্ছেন হাজারো তরুণ-তরুণী ও শিক্ষার্থী। অথচ নিউরোসায়েন্স ও সাইকিয়াট্রি বলছে—আত্মহত্যার তীব্র তাড়না মূলত এক ক্ষণস্থায়ী আবেগীয় ঝড়, যার শারীরিক আয়ু মাত্র '৯০ সেকেন্ড'। সময়মতো বুঝতে পারা, প্রিয়জনের উপস্থিতি কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বাড়ানো হাত এই সংকটময় মুহূর্তগুলোকে জয় করতে পারে। আজ বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। 'আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন' ও 'আলোচনা শুরু করুন'—এই বৈশ্বিক আহ্বানকে সামনে রেখে আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক নীরবতা ভাঙার।

আত্মহত্যার তাড়না কেন '৯০ সেকেন্ড' থাকে

আত্মহত্যার অনেক ঘটনাই দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফল নয়; বরং এটি অত্যন্ত ক্ষণিকের ও আবেগতাড়িত একটি সিদ্ধান্ত। হঠাৎ করে তৈরি হওয়া এই তীব্র তাড়নার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করে–

  • বেশির ভাগ আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাত্র মিনিট বা ঘণ্টার মধ্যেই সংঘটিত হয়। হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথের এক গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যার প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ২৪ শতাংশ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাঁচ মিনিটের কম সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছেন। আরও বিস্তৃতভাবে, ২৪ শতাংশ ব্যক্তি ভেবেছেন ৫-১৯ মিনিট এবং ২৩ শতাংশ ভেবেছেন ২০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা। অন্য একটি গবেষণায়, আত্মহত্যার চেষ্টা করার আগে ৪৮ শতাংশ মানুষ মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট কারমেন তেজেডরের মতে, চিন্তা ও কাজের মধ্যে গড় সময় ৯০ মিনিট; এই সময় পার হলে দ্বিধা-সন্দেহ তৈরি হয় এবং অনেকেই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকেন।

  • অত্যন্ত তীব্র আবেগ, যেমন রাগ, হতাশা, অপমানবোধ বা তীব্র মানসিক যন্ত্রণা—যা প্রায়ই প্রিয়জনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, প্রেম-বিচ্ছেদ, অর্থনৈতিক সংকট বা একাডেমিক চাপের মতো ঘটনা দ্বারা ট্রিগার হয়—এই তাড়নাকে উসকে দেয়। নিউরোসায়েন্স বলে, একটি আবেগের শরীরবৃত্তীয় আয়ু প্রায় ৯০ সেকেন্ড। এর অর্থ, তীব্র আবেগের শীর্ষস্থানীয় রাসায়নিক প্রক্রিয়া প্রায় ৯০ সেকেন্ড স্থায়ী হয়। এরপরও যদি আবেগ চলতে থাকে, তা মূলত মানুষ নিজেই সেই আবেগপূর্ণ চক্রে থেকে নিজেকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই ৯০ সেকেন্ড হলো আবেগের তীব্রতা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
  • গবেষণায় দেখা গেছে, হতাশাগ্রস্ত ও আত্মহত্যাপ্রবণ রোগীরা সময়কে ধীরগতিতে অনুভব করেন। তীব্র মানসিক যন্ত্রণা সময়ের ধারণাকে ধীর করে দেয়, যা পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ নেই—এই প্রতীতি আরও গভীর করে। এর ফলে ব্যক্তির পক্ষে বিকল্প চিন্তা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে এবং আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

যেভাবে এই ভাবনা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে

আত্মহত্যার তাড়না সাধারণত কিছুক্ষণের জন্য খুব চরম আকার ধারণ করে। নিজেকে বলুন, ‘আমি আপাতত ১৫ মিনিট অপেক্ষা করছি, এরপর সিদ্ধান্ত নেব।’ এ সময়ে পরিবেশ বদলে ফেলুন—ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ুন, ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিন। '৫-৪-৩-২-১' পদ্ধতি ব্যবহার করুন। চোখের সামনে পাঁচটি জিনিস দেখুন, চারটি জিনিস স্পর্শ করুন, তিনটি শব্দ শুনুন, দুটি গন্ধ শুঁকুন ও একটি জিনিস স্বাদ নিন।

  • নিরাপদ দূরত্ব তৈরি করুন। নিজের কাছ থেকে ক্ষতিকর বস্তুগুলো—অতিরিক্ত ওষুধ, ধারালো জিনিস—সরিয়ে ফেলুন।
  • বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা সহকর্মীকে বলুন, ‘আমি খুব খারাপ অবস্থায় আছি, আমার শুধু আপনার পাশে থাকা দরকার।’ তাঁদের উপস্থিতি আপনার একাকিত্ব দূর করবে।
  • পেশাদার সাহায্য নিন। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং সাহসের কাজ। বাংলাদেশে ‘কান পেতে রই’ হেল্পলাইনে ২৪ ঘণ্টায় যেকোনো সময় কল করুন: ০৯৬১২-৭৮২৭৮২ অথবা ০১৭৭৯-৫৫৫১২২ নম্বরে।
  • নিজেকে প্রশ্ন করুন: "ঠিক এক বছর আগে যে সমস্যায় আমি মরতে চেয়েছিলাম, সেটা আজ কি ততটাই ভয়াবহ?" ডায়েরিতে লিখে ফেলুন, কেন এই ভাবনা আসছে—আবেগকে বাইরে বের করে আনলে এর তীব্রতা কমে যায়।
  • গভীর শ্বাস নিন (চার সেকেন্ড ইনহেল, সাত সেকেন্ড ধরে রাখুন, আট সেকেন্ড এক্সহেল)। আজকের জন্য শুধু একটি ছোট লক্ষ্য ঠিক করুন—বিছানা থেকে উঠে গোসল করা বা পাঁচ মিনিট হাঁটা।

মনে রাখবেন, আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। আপনার অস্তিত্ব অমূল্য। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন’ এবং এর মূল আহ্বান ‘আলোচনা শুরু করুন’—যা আমাদের প্রত্যেককে মনে করিয়ে দেয় যে, খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমেই আমরা এই সমস্যা মোকাবিলা করতে পারি।

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত