Ajker Patrika

বিষণ্নতায় ভুগলে ওজন কমানো কঠিন হয় যেসব কারণে

ফিচার ডেস্ক
আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৩: ২০
বিষণ্নতায় ভুগলে ওজন কমানো কঠিন হয় যেসব কারণে
ছবি: সংগৃহীত

মানসিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক গঠন—একে অপরের পরিপূরক। বর্তমান সময়ে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তবে, অনেকেই হয়তো জানেন না যে বিষণ্নতার সঙ্গে শারীরিক ওজনের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিষণ্নতা যেমন ওজনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, ঠিক তেমনই অতিরিক্ত ওজনের কারণে বিষণ্নতা হতে পারে। চিকিৎসক, কাউন্সিলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘বিষণ্নতার সময় নিয়ন্ত্রণ কঠিন হওয়ার পেছনে আছে নানা স্তরের কারণ। স্নায়বিক কারণে মস্তিষ্কের “ওয়ার্ড সিস্টেম”কাজ করে না। কারও খাবারের প্রতি আনন্দ কমে যায়, আবার অনেকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খেতে ইচ্ছে করে—এ দুটোই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।’

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বিষণ্নতা ও ওজনের যোগসূত্র

গবেষণায় দেখা গেছে বিষণ্নতা মানুষের ক্ষুধা, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। মূলত দুই ধরনের বিষণ্নতা ওজনের ক্ষেত্রে ভিন্ন

ভিন্ন প্রভাব দেখায়—

প্রথম ধরন: এতে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষুধা কমে যায়, অনিদ্রা দেখা দেয় এবং দ্রুত ওজন কমতে থাকে। মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ বা আনন্দ পাওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়ায় খাওয়ার প্রতি কোনো আগ্রহ থাকে না।

দ্বিতীয় ধরন: এতে ক্ষুধা অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, যার ফলে ওজন দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে রোগী দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম অনুভব করেন এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ভারী বোধ করেন।

স্থূলতা কি বিষণ্নতার কারণ?

স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিষণ্নতার হার সাধারণ মানুষের তুলনায় দ্বিগুণ হয়। অতিরিক্ত ওজনের ফলে শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়া, হরমোনের পরিবর্তন, সামাজিক অবজ্ঞা বা একাকিত্বের অনুভূতি মানুষকে বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দেয়। আবার উল্টোভাবে, বিষণ্নতা থাকলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন বাড়ে এবং বিপাক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, যা স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়।

ওষুধের প্রভাব

বিষণ্নতা নিরসনে ব্যবহৃত কিছু অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট বা বিষণ্ণতাবিরোধী ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও ওজনের পরিবর্তন হতে পারে। কোনো কোনো ওষুধ সেবনের ফলে বমি বমি ভাব হয়, যা ক্ষুধা কমিয়ে ওজন কমিয়ে দেয়। আবার দীর্ঘমেয়াদি কিছু ওষুধের ফলে বিপাকীয় পরিবর্তন ঘটে ওজন বেড়ে যেতে পারে। সাধারণত ওষুধ সেবনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বছরে ওজন বাড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। তবে মনে রাখা জরুরি, ওষুধের প্রভাব ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

বিষণ্নতায় শরীর অলস হয়ে যায়, নড়তে চায় না। একটানা বসে থাকা, ব্যায়ামের অক্ষমতা—এগুলো ওজন কমার পথে বড় বাধা। তা ছাড়া ডায়েট মেনে চলা, রান্না করা—বিষণ্নতার সময় এসব কাজ করা যেন পাহাড়সম মনে হয়। সঙ্গে যোগ হয় ‘ইমোশনাল ইটিং’, যেখানে মন খারাপের আবেগ সামলাতে বেশি ক্যালরির খাবার খেয়ে ফেলা হয়। হরমোনের কারণেও ওজন স্থিতিশীল থাকে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে কর্টিসল বেড়ে যায়, পেটের চর্বি জমতে থাকে। থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যও নষ্ট হয়।
অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া, চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার

কেন ওজন কমানো কঠিন হতে পারে?

বিষণ্নতার একটি প্রধান লক্ষণ হলো ‘অ্যানহেডোনিয়া’ বা কোনো কিছুতেই আনন্দ না পাওয়া। যখন একজন মানুষ কোনো কাজেই আগ্রহ পান না, তখন তার পক্ষে নিয়মিত ব্যায়াম করা বা কোনো ডায়েট চার্ট মেনে চলা অসম্ভব হয়ে পরে। এ ছাড়া বিষণ্নতার কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ে এবং মানুষ নেতিবাচক আবেগ সামলাতে ‘ইমোশনাল ইটিং’ বা অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ব্যবস্থাপনা ও প্রতিকার

বিষণ্নতাজনিত ওজনের পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা কিছু কার্যকর পদক্ষেপের পরামর্শ দেন—

শারীরিক সক্রিয়তা

ব্যায়ামের মানসিক শক্তি না থাকলে ছোট ছোট লক্ষ্য স্থির করুন। দিনে অন্তত ১০-১৫ মিনিট হাঁটাহাঁটি দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

পর্যাপ্ত ঘুম

ঘুমের মান উন্নত করতে পারলে ওজন নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। যদি ওষুধের কারণে অনিদ্রা হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সুষম খাদ্য

অতিরিক্ত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে একটি ব্যক্তিগত ডায়েট চার্ট তৈরি করতে পারেন।

পেশাদার সাহায্য

ওজন ও বিষণ্নতা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের সহায়তা নিন। থেরাপি এবং সঠিক ওষুধের সমন্বয় এই চক্র থেকে বের হতে সাহায্য করে।

বিষণ্নতা কেবল মনের একটি সমস্যা নয়, এটি শরীরকেও নিভৃতে নিঃশেষ করে দেয়। জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে বিষণ্নতা ও ওজনের এই ভারসাম্যহীনতার কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমেই হতে পারে সুস্থ জীবনে ফেরার যাত্রার শুরু।

সূত্র: মেডিকেল নিউজ ডেইলি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত